কলকাতায় পচা ডিমের দাম ভালো ডিমের চেয়ে তিন গুণ বেশি
কলকাতা ব্যুরো || রাইজিংবিডি.কম
পশ্চিমবঙ্গে এখন ভালো ডিমের থেকে পচা/নষ্ট ডিমের দাম বেশি। একটি ভালো ডিমের দাম যেখানে ৬ রুপি, সেখানে এক পিস পচা বা নষ্ট ডিমের দাম ২০রুপি! অবাক করা বিষয় এই পচা/নষ্ট ডিমের চাহিদা তুঙ্গে থাকায় পচা ডিম বাজার থেকে কার্যত উধাও। আর এমন চাহিদার মূলে রয়েছে ডিম থেরাপি।
পশ্চিমবঙ্গে গত এক মাস আগেই হয়েছে বড় রাজনৈতিক পট পরিবর্তন। বিধানসভা নির্বাচনে বিপুল জয় পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতায় এসেছে বিজেপি। শুধু বিজেপির জয় নয়, একইসঙ্গে সমানতালে চলছে মমতার দলে ভাঙ্গন। মাত্র এক মাসের মধ্যেই মমতার হাত থেকে তার প্রতিষ্ঠিত দলের নিয়ন্ত্রণ সম্পূর্ণভাবে চলে গেছে। লোকসভা ও বিধানসভার থেকে একেবারে তৃণমূল স্তরে, মমতার হাত ছেড়েছেন একের পর এক ছোট বড় তৃণমূল কংগ্রেস নেতারা। একদিকে তৃণমূল কংগ্রেসের দুর্বল রাজনৈতিক অবস্থান, অন্যদিকে ক্ষমতায় এসেই রাজনৈতিক অবস্থান পোক্ত করার জন্য বিজেপির দুর্নীতি, তোলাবাজি, ভীতি প্রদর্শন, চাঁদাবাজি, হুমকির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি। সব মিলিয়ে প্রায় নিত্যদিন পশ্চিমবঙ্গের গ্রেপ্তার হচ্ছেন দুর্নীতি তোলাবাজিসহ বিভিন্ন অভিযোগে অভিযুক্ত তৃণমূল কংগ্রেস নেতারা।
সরকারের পক্ষ থেকে গ্রেপ্তারকৃত নেতা, নেত্রী, কর্মীদের হিসাব না দিলেও সংখ্যাটা প্রায় অর্ধশতাধিক। একসময় যে নেতা-নেত্রীদের ডাকে বাঘে গরুতে এক ঘাটে পানি খেত, এখন তারাই জনরোষের মুখে পড়েছেন। আর প্রত্যেকটি ক্ষেত্রেই তাদের দেখামাত্রই ডিম ছুড়ে মারছেন বিক্ষোভকারীরা। কখনো তা পচা, আবার কখনো তা ভালো। আর এই বিক্ষোভকারীদের সাথে যোগ দিয়েছে বিজেপির কিছু কর্মী, সমর্থকরাও। তৃণমূলের নেতা-নেত্রীরা আটক বা গ্রেপ্তারের খবর পেলেই সেখানে ছুটে যাচ্ছেন বিক্ষুব্ধ জনতারা, সাথে নিয়ে যাচ্ছে ডিম। আর অভিযুক্ত ব্যক্তিকে কাছে পেয়ে একবারে তাক করে ডিম ছুঁড়ছেন তারা। আর ঝাঁকে ঝাঁকে সেই ডিম সোজা উড়ে এসে লাগছে হয় মাথায়, না হয় বুকে, পেটে বা পিঠে। ডিমের হাত থেকে বাঁচতে হেলমেটও পড়তে হয়েছে কাউকে কাউকে।
২০২৬ সালের নির্বাচনে প্রচারণায় এসে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ সাফ বার্তা দিয়েছিলেন, অপরাধীদের রেয়াত করা হবে না। তাদের স্থান হবে কারাগারে। এরপর রাজ্যে ক্ষমতার পালাবদল। সরকারে বিজেপি। আর প্রথম ক্যাবিনেট বৈঠকেই মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ঘোষণা দেন একজন দুর্নীতিবাজ, অপরাধীদেরও ছাড়া হবে না। এরপর অপরাধীদের গ্রেফতার এর সঙ্গে সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে পচা ডিমের কদর। কিছু ক্ষেত্রে পচা ডিমের সঙ্গে উড়ে আসছে পচা টমেটো, গোবর।
পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে সপ্তখানেক আগে তৃণমূল ভবনে ডিম হামলার আশঙ্কায় কাউন্সিলরদের নিয়ে ডাকা বৈঠক বাতিল করতে হয় তৃণমূল নেত্রী মমতা ব্যানার্জীকে। যদিও এই বিষয়ে কেউই আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেননি। তবে, সূত্রের খবর কাঁচা ডিম খেতে বাড়ির বাইরে পা রাখতে চাইছেন না কাউন্সিলরদের অনেকেই।
সব মিলিয়ে ডিম ফোবিয়া শুরু হয়েছে তৃণমূল নেতাদের। এই ডিমের হাত থেকে বাঁচতে কখনো কখনো নিরাপত্তা রক্ষীদেরকেই সামনে এগিয়ে দিচ্ছেন তৃণমূলের সে সেব কথিত অভিযুক্তরা।
সপ্তাহ খানেক আগেই তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক ব্যানার্জীকে লক্ষ্য করে সোনারপুরে ডিম ছোড়া হয়। সেই সঙ্গে তাকে লক্ষ্য করে উড়ে আসে চড়-ঘুষি, জুতা-পাথর।
তৃণমূল কংগ্রেস নেতারা গ্রেপ্তার হলে কিছু ডিম বিক্রেতা পৌঁছে যাচ্ছে থানা থেকে আদালত চত্বরে। হকারি করে রীতিমতো বিক্রি করছেন পচা ডিম।
নিমতায় তৃণমূলের জ্যেষ্ঠ সংসদ সদস্য সৌগত রায়কে লক্ষ্য করে ডিম ছোড়ে বিক্ষুব্ধ জনতা। থানায় ডেপুটেশন জমা দিতে গেলে জনতার ক্ষোভের মুখে পড়েন তিনি। বিক্ষোভকারীদের ছোঁড়া সেই ডিমের কিছু গিয়ে পড়ে রাস্তায়, আর কিছু গিয়ে পড়ে তার গাড়িতে।
শ্লীলতাহানি, বাড়ি দখলের অভিযোগে গ্রেপ্তারকৃত তৃণমূল মুখপাত্র জয়প্রকাশ মজুমদারকেও আদালতে তোলার সময়ও একই দৃশ্য। তাকে স্বাগত জানাতে ডিম নিয়ে উপস্থিত ছিলেন উত্তেজিত জনতা। ফলে ডিম হামলার ভয়ে প্রথমে গাড়ি থেকেই নামতে চাইছিলেন না জয়প্রকাশ। পরে পুলিশ তাকে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে গাড়ি থেকে বের করেন। কিন্তু শেষমেশ জয়প্রকাশের সঙ্গে কাঁচা ডিম খেতে হয় পুলিশকেও।
রাজ্যের সাবেক মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাসের ভাই টলিউডের ত্রাস স্বরূপ বিশ্বাসের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের জমে থাকা ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটে ডিম দিয়ে। স্বরূপের গ্ৰেপ্তারির খবর পেয়েই নিউ আলিপুর থানার বাইরে ডিম হাতে জমায়েত হয় বিক্ষুব্ধরা। সঙ্গে চোর চোর স্লোগান।
এনআইএ-এর হাতে গ্ৰেপ্তার তৃণমূলের সাবেক বিধায়ক শওকত মোল্লা। তাকে আদালতে তোলার আগে এনআইএ দপ্তরের বাইরে ডিম হাতে অপেক্ষা করতে দেখা যায় জনতাকে। এমনকি বিক্ষুব্ধ জনতার হাতে ডিম পৌঁছে দিতে স্থানীয় এক ব্যক্তিকে পচা ও ভালো উভয় ধরনের ডিম বিক্রি করতে দেখা যায়।
তৃণমূলের কামারহাটির বিধায়ক মদন মিত্রর গাড়িতেও শনিবার ডিম ছোড়ে একদল উত্তেজিত জনতা। সেসময় তৃণমূল বিধায়ক বলেছিলেন, ‘মৃত্যুকে অনেক কাছ থেকে দেখলাম।’
মঙ্গলবার ডিম বিক্ষোভের মধ্যে পড়তে হয়েছে তৃণমূলের সাবেক বিধায়ক বিধাননগরের পৌরসভার সাবেক মেয়র ও বর্তমান কাউন্সিলর সব্যসাচী দত্তকেও। তোলাবাজির অভিযোগে গ্রেপ্তার সব্যসাচী দত্তকে এদিন যখন থানা থেকে বের করে বিধান নগর মহকুমা আদালতে নিয়ে আসা হয় এবং শুনানি শেষে ফের যখন আদালতে বের করা হচ্ছিলেন তখন বিক্ষোভের মুখে পড়েন সব্যসাচী। তাকে ঘিরে ধরে একদিকে যেরকম মহিলারা মুহুর্মুহু ডিম ছুঁড়তে থাকেন, তেমনি চোর চোর স্লোগানও দিতে থাকেন কেউ কেউ। আর এসময় ডিমের হাত থেকে বাঁচতে আদালতের বাইরে এসে পুলিশের গাড়িতে উঠার পরিবর্তে ফের আদালতের ভিতরে ঢোকার চেষ্টা করেন তিনি। একসময় পুলিশের পিছনে মুখ লোকাতে হয় তাকে। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। মুহূর্তের মধ্যেই সাদা জামায় লাগে হলুদ রঙের ছোঁয়া।
এক কথায় ডিম হামলা সামলাতে নাস্তানাবুদ পুলিশও। অভিযুক্তকে উদ্দেশ্য করে ছোঁড়া ডিম কখনো কখনো তাদের গায়ে এসেও পড়ছে। এতে একদিকে যেমন শারীরিকভাবে আঘাত পাচ্ছেন তারা, তেমনি নষ্ট হচ্ছে পরণের ইউনিফর্ম। স্বভাবতই একসময় যে পুলিশ লাঠি দিয়েই কাজ চালিয়ে দিতেন, এখন তাদের ফেস গার্ড রাখতে হচ্ছে।
এই নিয়ে গত ১৫ বছর তৃণমূলের শাসনামলে তিতিবিরক্ত সাধারণ মানুষ বলছেন, “ডিম নয়, এদের পচা টমেটো ছুড়ে মারা উচিত। ডিমের দাম বেশি হওয়ায় অনেকের পক্ষে কেনা সম্ভব হয় না। একই সাথে গোবরও রাখা উচিত।”
আর বিজেপি বলছে, “এটা জনরোষ; তাদের কিছু করার নেই।”
ঢাকা/সুচরিতা/শাহেদ
হাম উপসর্গে আরো ৮ শিশুর মৃত্যু