ঢাকা     বৃহস্পতিবার   ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ||  ফাল্গুন ১৪ ১৪৩২ || ৯ রমজান ১৪৪৭ হিজরি

Risingbd Online Bangla News Portal

সাক্ষাৎকার

‘বড়দের কবিতা লেখার চেয়ে ছোটদের জন্য লেখা বেশি কঠিন’

তাপস রায় || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৯:০১, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬   আপডেট: ১৯:০৯, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
‘বড়দের কবিতা লেখার চেয়ে ছোটদের জন্য লেখা বেশি কঠিন’

হাসান হাফিজ দেশের অন্যতম কবি, শিশুসাহিত্যিক ও প্রবীণ সাংবাদিক। সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি তিনি সাংবাদিকতাকে প্রধান পেশা হিসেবে গ্রহণ করেছেন। প্রায় চার দশক বিভিন্ন পত্রিকায় সাংবাদিক ও সম্পাদক হিসেবে কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁর। পাশাপাশি বিভিন্ন বিষয়ে রচনা করেছেন প্রায় দুইশত গ্রন্থ। সাহিত্য ও সাংবাদিকতায় অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে পেয়েছেন অসংখ্য সম্মাননা ও পুরস্কার। সম্প্রতি তাঁর সাফল্যগাঁথায় যুক্ত হয়েছে শিশুসাহিত্যে বাংলা একাডেমি পুরস্কার। তাঁকে অভিনন্দন জানিয়ে সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন তাপস রায়।  

রাইজিংবিডি: শিশুসাহিত্যে বাংলা একাডেমি পুরস্কারে ভূষিত হওয়ায় আপনাকে অভিনন্দন।

হাসান হাফিজ: ধন্যবাদ। 

রাইজিংবিডি: আপনি একাধারে কবি, অনুবাদক, গদ্যকার, সাংবাদিক এবং সম্পাদক। একইসঙ্গে আপনি শিশু-কিশোরদের জন্য লিখেছেন। আপনার রম্যসাহিত্যও আমরা পড়েছি। আপনি ঠিক কোন পরিচয়ে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন?

হাসান হাফিজ: আমি মানুষ। মানুষ হিসেবে আমার যে বোধ, অনুভূতি, উপলব্ধি, অর্জন—সেগুলোর মধ্যে ভালো দিকটি যদি অন্যের মধ্যে একটু হলেও সঞ্চালিত করতে পারি, একজনকেও যদি অন্তত একটু ভালোলাগা উপহার দিতে পারি, সেটাই আমার স্বার্থকতা। শিশুসাহিত্যে কাজ করতে আমার খুবই ভালো লাগে; ছোটবেলা থেকেই। এদিকে আমার ঝোঁক যখন স্কুলের ছাত্র ছিলাম, তখন থেকেই। ক্লাস এইটে পড়ার সময় আমার লেখা প্রথম ছাপা হয় দৈনিক ‘ইত্তেফাক’ পত্রিকায়। মরহুম রোকনুজ্জামান খান দাদাভাই লেখাটি ছেপেছিলেন। তখন ডাকযোগে লেখা পাঠিয়েছিলাম। সে ছিল এক রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা!

তারপর ঢাকা কলেজে এসে ভর্তি হলাম। গ্রাম থেকে ঢাকা এসে অনেক কিছুর সঙ্গে পরিচিত হলাম, অনেক দিগন্ত উন্মোচিত হলো। আমার হওয়ার কথা ছিল ডাক্তার, শেষ পর্যন্ত আমি সাংবাদিক হলাম। আমার ছেলেটি অবশ্য ডাক্তার হয়েছে, স্পেশালিস্ট ডাক্তার। সুতরাং সে দিক দিয়ে আমার কোনো অপূর্ণতা নেই। আল্লাহ আমার সেই ইচ্ছা পূরণ করেছেন। আল্লাহর দরবারে অনেক শুকরিয়া।

রাইজিংবিডি: কবিতার পাঠক হিসেবে আমাদের একটা আগ্রহের জায়গা ছিল যে, আপনি কবিতায় বাংলা একাডেমি পুরস্কার পাবেন। কিন্তু আপনি পেলেন শিশুসাহিত্যে। বিষয়টি কীভাবে দেখছেন?

হাসান হাফিজ: কোন বিষয়ে পুরস্কার পাব, সেটা তো আমি নির্ধারণ করি না। নির্ধারণ করে বাংলা একাডেমি। কারণ শিশুসাহিত্যের জন্য যেমন আমার উপযুক্ততা আছে, পাওয়ার দাবি আছে, তেমন কাজও আমি করেছি। কবিতার জন্যও করেছি। আপনি শুনে অবাক হবেন, বিজ্ঞান ও পরিবেশ নিয়েও আমি কাজ করেছি। এ ব্যাপারে আমার সাত-আটটি গ্রন্থ আছে। সমুদ্র নিয়ে, বিশ্বসেরা বিজ্ঞানীদের জীবনী নিয়ে, নানান বিষয় নিয়ে। মজার যত প্রাণী—পিঁপড়া থেকে হাতি পর্যন্ত—এসব নিয়ে বই লিখেছি। এ ধরনের বিচিত্র কাজ আমি করেছি।

রাইজিংবিডি: শিশুকিশোরদের জন্য লিখতে হলে কোন বিষয়গুলো ভাবনায় রাখা উচিত বলে আপনি মনে করেন?

হাসান হাফিজ: শিশুদের জগৎ অনেক আনন্দের জগৎ—নির্মল আনন্দের জগৎ, পবিত্র জগৎ। শিশুদের মধ্যে কোনো ভণ্ডামি নেই। সেখানে অসততা নেই, হিংসা-বিদ্বেষ নেই, ক্ষুদ্র স্বার্থে প্রণোদিত হানাহানি নেই—যে বিভৎস পরিবেশের মধ্যে আমরা বসবাস করি, সেই জিনিসটা ওদের মধ্যে নেই।

শিশুদের জন্য কাজ করা খুব কঠিন। সেখানে কোনো ফাঁকি-ঝুঁকি চলে না। তাদের মতো করে লিখতে হলে আপনার ভেতরে একজন শিশু থাকতে হবে। নইলে তাদের কাছে পৌঁছানো যাবে না। তাদের মনস্তত্ত্ব বুঝতে হবে, সেই অনুযায়ী লেখায় প্রতিফলন আনতে হবে। কাজটা সহজ নয়। আমার মনে হয়, বড়দের জন্য কবিতা লেখার চেয়ে ছোটদের জন্য লেখা বেশি কঠিন। সেখানে কোনো শর্টকাট নেই, কোনো ‘দুই নম্বর’ ব্যাপার নেই। সত্যিকার অর্থে কঠিন কাজ। আর কঠিন কাজের আনন্দও বেশি। 

রাইজিংবিডি: যেহেতু আপনি কবি, কবিতা কখন কবিতা হয়ে ওঠে বলে আপনি মনে করেন?

হাসান হাফিজ: কবিতার কোনো সর্বজনীন সংজ্ঞা এখনো তৈরি হয়নি। কবিতা হলো সূক্ষ্ম অনুভূতির বিষয়। একটা কবিতা যদি আপনি সকালবেলা পড়েন, একরকম মনে হবে; গভীর রাতে পড়লে অন্যরকম মনে হবে। এর মধ্যে সাংকেতিক ইঙ্গিতময়তা থাকে, একটা লাবণ্য থাকে—যা আপনাকে ছুঁয়ে যায়। আপনি নিজের মতো করে তাকে ধারণ করবেন, আত্মস্থ করবেন, উপভোগ করবেন।
কবিতা উচ্চাঙ্গ সংগীতের মতো। এর মধ্যে প্রবেশ করতে হলে প্রস্তুতি লাগে। নিজেকে রসাস্বাদনের জন্য তৈরি করতে হয়। তখন বোঝা যায়—কবিতা সবচেয়ে সূক্ষ্ম শিল্প। কথাসাহিত্যে অনেক কিছু বিস্তৃতভাবে বলা যায়; কিন্তু কবিতায় একটি শিশিরবিন্দুর মধ্যে যেমন সূর্যের প্রতিফলন দেখা যায়, তেমনি অল্প কথায় গভীর অর্থ ফুটে ওঠে।

সবাই কবিতা বুঝতে পারেন না। তার জন্য মন প্রস্তুত হতে হয়। পাঠকভেদে অর্থ ভিন্ন হতে পারে। রবীন্দ্রনাথ যদি ‘সোনার তরী’র একরকম ব্যাখ্যা দেন, পাঠক হিসেবে আপনার কাছে তা ভিন্ন হতে পারে। কবিতাকে ব্যবচ্ছেদ করতে গেলে তার সৌন্দর্য নষ্ট হয়ে যায়—যেমন সুন্দরী নারীর শরীরকে যদি ডিসেকশন টেবিলে নেওয়া হয়, তার সৌন্দর্য ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। তাই কবিতাকে অক্ষত রেখে, তার লাবণ্য, শব্দের অতিরিক্ত অর্থ, অন্তর্নিহিত দর্শন উপলব্ধি করতে হয়। কবিতা যখন শিল্প হয়ে ওঠে, তখন সেখানে ইঙ্গিতময়তা থাকে, রূপক থাকে। প্রত্যেকে নিজের মতো করে ব্যাখ্যা করতে পারে।

রাইজিংবিডি: আপনি বলছেন শিশুসাহিত্য কঠিন মাধ্যম, কবিতা ইঙ্গিতময় শিল্প। যখন আপনি কবিতা লিখছেন, শিশুসাহিত্য করছেন, কথাসাহিত্য, রম্যগদ্য বা অনুবাদ করছেন— ভিন্ন ভিন্ন লেখার জন্য কীভাবে প্রস্তুতি নেন?

হাসান হাফিজ: এটা আমার কাছে শ্বাস-প্রশ্বাসের মতো। আমি প্রতিদিন পড়ি, প্রতিদিন লিখি। সারা বছরই কাজ করি। এখন আমার বয়স ৭১ বছর। আমার দুই শতাধিক গ্রন্থ বিভিন্ন বিষয়ে প্রকাশিত হয়েছে। এটা সম্ভব হয়েছে নিরন্তর চর্চা, সাধনা, অধ্যবসায় ও ধৈর্যের কারণে। চর্চা বন্ধ হয়ে গেলে স্থিতিজড়তা আসে। যেমন সাঁতার জানলেও দীর্ঘদিন না করলে ভুলে যাওয়ার মতো অবস্থা হয়, তেমনি লেখালেখিতেও। তাই প্রবহমানতার মধ্যে থাকতে হয়। কবিতা কতটা ধরা দেয়, সেটাও প্রশ্ন। আধেক ধরা দেয়, আধেক অধরা থেকে যায়।

কবিতা রহস্যময় শিল্প—পেইন্টিং বা উচ্চাঙ্গ সংগীতের মতো; কথাটি আগেই বলেছি। উচ্চাঙ্গ সংগীত বুঝতে হলে নিজেকে উপযোগী শ্রোতা হিসেবে তৈরি করতে হয়। আমার সৌভাগ্য হয়েছিল ওস্তাদ আলী আকবর খানের সাক্ষাৎকার নেওয়ার। তখন আমি ‘দৈনিক বাংলা’য় কাজ করতাম, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি। তাঁকে সাধনার বিষয়ে প্রশ্ন করেছিলাম। তিনি বলেছিলেন, সাধনা করতে করতে একসময় মনে হয় তিনি ঈশ্বরের কাছে পৌঁছে গেছেন—একটা অতীন্দ্রিয় অনুভূতি।

এই উচ্চতায় পৌঁছানো সহজ নয়। সেই স্তরে গিয়ে তবেই এমন উপলব্ধি সম্ভব। শিল্পের সাধনা শেষ পর্যন্ত মানুষকে এক স্বর্গীয় আনন্দের দিকে নিয়ে যায়।

রাইজিংবিডি: আপনাকে আমরা সাংগঠনিক ব্যক্তিত্ব হিসেবেও জানি। সংগঠন পরিচালনায় আপনার স্বতঃস্ফূর্ত দক্ষতা আমরা লক্ষ্য করেছি। যতটুকু জানি, আপনি ‘চাঁদের হাট’-এর প্রতিষ্ঠাতা সাহিত্য সম্পাদক ছিলেন। তখন আপনি ঢাকা কলেজের ছাত্র। আমার এখানে দুটি প্রশ্ন—আপনি কীভাবে চাঁদের হাটের সঙ্গে যুক্ত হলেন? দ্বিতীয়—ওই সময়ের শিশুসাহিত্য এবং এই সময়ের শিশুসাহিত্যের মধ্যে আপনি কতটুকু পার্থক্য দেখেন?

হাসান হাফিজ: সেই সময়ের সঙ্গে এই সময় কোনোভাবেই তুলনা করা যায় না। তখন শিশু সংগঠনের উপযোগিতা ছিল, একটা ক্ষেত্র ছিল। সবার আগ্রহ ছিল। এখন আমরা ডিজিটাল যুগে প্রবেশ করেছি। হাতে হাতে মোবাইল ডিভাইস। আমরা যেন বইবিমুখ, পাঠবিমুখ জাতিতে পরিণত হচ্ছি।

আমরা সেই সময় ওয়ার্ল্ড ক্ল্যাসিক পড়েছি। আমাদের বোধ সেভাবে সঞ্জীবিত হয়েছে, বিকশিত হয়েছে, পল্লবিত হয়েছে। আমাদের চিন্তা-চেতনা, কল্পনাশক্তি ঊর্বর হয়েছে। আপনি দেখুন, মহাবিজ্ঞানী আইনস্টাইনের একটি বিখ্যাত উক্তি আছে—আপনি যদি আপনার সন্তানকে বুদ্ধিমান করতে চান, তাকে রূপকথা পড়তে দিন; আর যদি আরও বুদ্ধিমান করতে চান, তবে বেশি বেশি রূপকথা পড়তে দিন।
রূপকথার মধ্যে নৈতিক শিক্ষা থাকে, গল্প থাকে, নাটকীয়তা থাকে, রহস্যময়তা ও মোচড় থাকে। এটি শিশুদের কল্পনার রাজ্যে নিয়ে যায় এবং তাদের সৃষ্টিশীলতাকে বিকশিত হতে সহায়তা করে। ছোটবেলায় যে মানসিক গঠন তৈরি হয়, বড় বয়সে পড়ে সেই ছাপ ততটা পড়ে না। এ কারণে শিশুদের নৈতিক শিক্ষা দেওয়ার জন্য আমি ঈশপের গল্প নিয়ে কাজ করেছি। আমার পাঁচটি বই আছে, যেখানে আমি ঈশপরের গল্পগুলো ছড়ায় রূপান্তর করেছি। অনেকে কাজ করেছেন, কিন্তু এত ব্যাপকভাবে খুব কমই হয়েছে।

আমার একটি বই আছে—পাখির ছবি, পাখির ছড়া। বিখ্যাত পাখি বিশারদ, আলোকচিত্রী ইনাম আল হকের তোলা ছবি ব্যবহার করা হয়েছে সেখানে। বাংলাদেশের ২৪টি পাখির গুণাগুণ, বৈশিষ্ট্য, আচরণ, স্বভাব—সব তথ্য আমি ছড়ার ভেতরে এনেছি। বইটি শিগগিরই প্রকাশিত হবে।

আরেকটি বই ‘খেলায় সেরা তাদের ছড়া’  বিশ্ববিখ্যাত ক্রীড়াবিদদের নিয়ে—যেমন: ম্যারাডোনা, পেলে, ডন ব্র্যাডম্যান, সাকিব আল হাসান, মাশরাফি বিন মুর্তজা প্রমুখ। তাদের অর্জন, কৃতিত্ব—সব ছড়ায় রূপান্তর করেছি। এতে ছড়া আছে, গল্প আছে, ইতিহাস আছে। কাজটি সহজ নয়; প্রচুর পরিশ্রম ও সম্পাদনার প্রয়োজন হয়।

চ্যালেঞ্জিং কাজ করতে আমার ভালো লাগে। আল্লাহর রহমতে একটা সাহস পেয়েছি। তবে ‘গড-গিফটেড’ বিষয় থাকলেও সাধনার বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আপনি যদি সততা ও সদিচ্ছা নিয়ে ধারাবাহিকভাবে লেগে থাকতে না পারেন, কোনো ক্ষেত্রেই বড় অর্জন সম্ভব নয়। পৃথিবীর সব সফল মানুষের মধ্যেই একাগ্রতা, দৃঢ়তা ও অধ্যবসায় ছিল।

রাইজিংবিডি: রূপকথার কথা বলছিলেন, রূপকথা অনুবাদে আগ্রহী হলেন কেন?

হাসান হাফিজ: রূপকথা অনুবাদে আমি অনেক কাজ করেছি। বিশ্বের প্রায় সব দেশের রূপকথা নিয়ে কাজ করেছি—তিন শতাধিক রূপকথা রূপান্তর করেছি। এখন ইন্টারনেটের সুবাদে আমরা সহজেই বিভিন্ন দেশের সাহিত্যে পৌঁছে যেতে পারি। তবে এখন শিশুসাহিত্যের ধারায় পরিবর্তন এসেছে। আমরা বেশি সায়েন্স ফিকশন দেখছি। রূপকথা আগের মতো দেখা যাচ্ছে না। আরেকটি বড় ঘাটতি হলো—শিশুদের জন্য মঞ্চনাটক প্রায় নেই বললেই চলে। ছড়া আছে, গল্প আছে, উপন্যাস আছে—কিন্তু ছোটদের মঞ্চনাটকের ক্ষেত্রে ঘাটতি রয়েছে। আমাদের দায়িত্ব শিশুদের বইয়ের প্রতি আকৃষ্ট করা। বইয়ের মধ্যে ইতিহাস লিপিবদ্ধ আছে—মানবসভ্যতার বিবর্তন, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উৎকর্ষ—সব কিছু। শিশুদের গোড়ামিমুক্ত, কুসংস্কারমুক্ত, মুক্তচিন্তার পরিবেশে গড়ে তুলতে হবে। অসাম্প্রদায়িকতা, প্রগতিশীলতা ও গণতান্ত্রিক সহিষ্ণুতার চর্চা করতে হবে। তাহলেই স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব।

রাইজিংবিডি: ‘কচিকাঁচার আসর’ বা ‘চাঁদের হাট’ একসময় আমাদের সাহিত্যমুখী করতে ভূমিকা রেখেছে। কিন্তু এখন বইয়ের বিক্রি কমে গেছে। শিশুসাহিত্যও খুব বেশি বিক্রি হচ্ছে না। শিশুরা বই থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। করণীয় কী হতে পারে?

হাসান হাফিজ: এ ক্ষেত্রে সরকারের বড় ভূমিকা রয়েছে। সৃষ্টিশীল জগত অনেক সময় উপেক্ষিত থাকে। জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গড়তে হলে মননের শক্তি বাড়াতে হবে। প্রকাশনা শিল্পকে সহায়তা করতে হবে। শিশুদের বইমুখী করতে বইমেলার আয়োজন বাড়াতে হবে, পাঠাগারে আকৃষ্ট করতে হবে। বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্র অনেক কাজ করছে, কিন্তু ১৮ কোটি মানুষের দেশে তা যথেষ্ট নয়। আরও উদ্যোগ দরকার। পড়ার কোনো বিকল্প নেই, বইয়ের কোনো বিকল্প নেই। যত আধুনিক ডিভাইসই আসুক, জ্ঞানের মূল উৎস বই। মানবসভ্যতার ইতিহাস জানতে হবে, অতীতকে বুঝে বর্তমানকে সংগঠিত করতে হবে—তবেই সুন্দর ভবিষ্যৎ নির্মাণ সম্ভব।

রাইজিংবিডি: আপনার সঙ্গে কবি হেলাল হাফিজের চমৎকার সম্পর্কের কথা আমরা জানি এবং দেখেছি। আপনার প্রথম কবিতার বই ‘এখন যৌবন যার’। হেলাল হাফিজের একটি অত্যন্ত পাঠকপ্রিয় কবিতার পঙ্‌ক্তি ‘এখন যৌবন যার যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়’। বিষয়টি সম্পর্কে জানতে চাই। 

হাসান হাফিজ: উনার কবিতাটা বেরিয়েছে ঊনসত্তুর সালে। কবিতার নাম ‘নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়’। সেখান থেকেই আমি নামটি নিয়েছি। আমার ‘হাসান হাফিজ’ নামটি কিন্তু পিতৃপ্রদত্ত নয়। কবি হেলাল হাফিজ আমাকে এই নাম দেন। আমার নামের ‘হাসান’ অংশটি এসেছে তাঁর বন্ধু আবুল হাসান থেকে, আর ‘হাফিজ’ এসেছে তাঁর নিজের নাম থেকে। তাঁর সঙ্গে আমার খুবই স্নেহপূর্ণ সম্পর্ক ছিল। তিনি আমার সহোদর না হলেও অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ছিলেন। তাঁর মৃত্যুর এক বছরের মধ্যেই আমি ‘হেলাল হাফিজ: অভিমানে সন্ন্যাসে’ নামে একটি গ্রন্থ সম্পাদনা করি, যা ‘পাঞ্জেরী’ থেকে প্রকাশিত হয়। সেখানে অনেকের স্মৃতিচারণ লিপিবদ্ধ আছে। আমি ‘কালের কণ্ঠ’র সম্পাদক হিসেবে তাঁর মৃত্যুদিনে প্রথম পাতায় একটি লেখা লিখেছিলাম—‘অল্প লিখে গল্প হওয়া কবি’। সেটি খুব প্রশংসিত হয়েছিল।

হেলাল হাফিজ অবশ্যই তরুণদের নাড়া দিয়েছেন। বিশেষ করে তাঁর রোমান্টিক কবিতার জন্য তিনি ব্যাপক জনপ্রিয় ছিলেন। তবে জনপ্রিয়তা নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় তিনি হয়তো বেশি লেখেননি। তাঁর বইয়ের সংখ্যা দুই-তিনটির বেশি নয়। অনেক লেখা তিনি নিজেই নষ্ট করে ফেলেছেন—ছাপার উপযোগী মনে করেননি বলে।

রাইজিংবিডি: সাংবাদিকতা চব্বিশ ঘণ্টার কাজ। সাহিত্যও তাই। এই ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আপনি সাংবাদিকতা ও সাহিত্য—দুটোর সমন্বয় কীভাবে করেন?

হাসান হাফিজ: ছোটবেলা থেকেই আমি লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত। সাংবাদিকতাকেও এক ধরনের সাহিত্য বলা হয়—“literature in hurry”। অর্থাৎ, তাড়াহুড়োর মধ্যে সাহিত্য। তবে সাংবাদিকতার আবেদন ক্ষণস্থায়ী; প্রকৃত সাহিত্য শিল্পমূল্যে গভীর এবং স্থায়ী। এটি কাল থেকে কালে রূপান্তরিত হয়, কালজয়ী হয়। পার্থক্য আছে, আবার সাদৃশ্যও আছে। সাংবাদিকতার তাৎক্ষণিকতা যেন সাহিত্যকে গ্রাস না করে—সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে হয়। 

রাইজিংবিডি: এই সময়ে সাংবাদিকতার প্রধান চ্যালেঞ্জ কোথায়?

হাসান হাফিজ: বড় চ্যালেঞ্জ হলো ‘কাট অ্যান্ড পেস্ট’ সাংবাদিকতা। আমি যখন রিপোর্টার ছিলাম, আমাদের ঘটনাস্থলে যেতে হতো। স্পটে না গেলে ঘটনার স্বাদ পাওয়া যায় না। শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন নৌকার ছবি আঁকার আগে নৌকায় উঠেছেন, দুলুনিটা অনুভব করেছেন। না হলে শিল্প সত্য হতো না। এখন মোবাইলেই কপি-পেস্ট করে খবর তৈরি হচ্ছে। অনুসন্ধিৎসা কমে গেছে, প্রশ্ন করার প্রবণতা কমেছে। ফলে বস্তুনিষ্ঠতা ও সত্যনিষ্ঠতা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। মানুষ অপতথ্যের দিকে ঝুঁকছে।

মূলধারার সাংবাদিকতার বড় চ্যালেঞ্জ হলো জনআস্থা ফিরিয়ে আনা। দীর্ঘ স্বৈরশাসন, নিপীড়ন ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রুদ্ধ থাকার ইতিহাসও এখানে দায়ী। তবে আমাদেরও দায় আছে। সত্যনিষ্ঠতা, দেশপ্রেম, সংযম ও সিরিয়াসনেস এসব ফিরিয়ে আনতে হবে। সাংবাদিকতা ঝুঁকিপূর্ণ পেশা; এখানে কমিটমেন্ট জরুরি। তরুণদের বলব—শর্টকাটে নয়, সাধনার পথে চলতে হবে। ধৈর্য ধরতে হবে, চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে।
 

ঢাকা/তারা//

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়