স্বচ্ছ প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ নির্ভর পুঁজিবাজার চাই: মাসুদ খান
জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক || রাইজিংবিডি.কম
বিএসইসির চেয়ারম্যান মাসুদ খান যোগদানের পর বিএসইসি ভবনে সংবাদ সম্মেলন করেন।
‘‘বাংলাদেশের পুঁজিবাজারকে খুচরা বিনিয়োগকারী নির্ভর একটি ফন্ট্রিয়ার মার্কেট থেকে ইমার্জিং মার্কেট এমন একটি বিশ্বাসযোগ্য, স্বচ্ছ এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ নির্ভর পুঁজিবাজারে রূপান্তর করতে চাই। যা দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য দীর্ঘমেয়াদি দেশীয় ও আন্তর্জাতিক মূলধন সংগ্রহ করতে সক্ষম হবে।’’
বৃহস্পতিবার (৪ জুন) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে যোগদানের পর বিএসইসি ভবনে সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) নবনিযুক্ত চেয়ারম্যান মাসুদ খান এ সব কথা বলেন। এ সময় প্রধানমন্ত্রীর বিনিয়োগ ও শেয়ারবাজার বিষয়ক বিশেষ সহকারী তানভীর গনি, অর্থমন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেক ও বিএসইসির নতুন কমিশনাররা উপস্থিত ছিলেন।
মাসুদ খান বলেন, ‘‘আধুনিক পুঁজিবাজার কাগজ নির্ভর প্রক্রিয়া এবং ম্যানুয়াল কার্যপ্রবাহের মাধ্যমে দক্ষতার সঙ্গে পরিচালিত হতে পারে না। তাই ডিজিটাইজেশন আমাদের সংস্কার কর্মসূচির অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হবে। আমরা ধাপে ধাপে পুরো পুঁজিবাজার ইকোসিস্টেমকে ডিজিটাল রূপান্তরের আওতায় আনতে চাই। এর মধ্যে থাকবে রিপোর্টিং, কোম্পানির তথ্য প্রকাশ, লাইসেন্সিং, অনুমোদন, বাজার তদারকি, আইন প্রয়োগ এবং বিনিয়োগকারী সেবা।’’
তিনি বলেন, ‘‘আইপিও আবেদন, রাইটস ইস্যু, বন্ড ও সুকুক আবেদন, লাইসেন্সিং কার্যক্রম এবং বিভিন্ন দাখিলপত্র ক্রমান্বয়ে সম্পূর্ণ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে স্থানান্তরিত হবে। আমরা চাই বিনিয়োগকারী এবং কোম্পানিগুলো যেন কমিশনের সঙ্গে ইলেকট্রনিক পদ্ধতিতে, দক্ষতার সঙ্গে এবং সম্পূর্ণ স্বচ্ছতার ভিত্তিতে যোগাযোগ করতে পারে। আমাদের লক্ষ্য হলো এমন একটি প্রযুক্তিনির্ভর প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা, যা হবে দ্রুততর, অধিক স্বচ্ছ, অধিক দক্ষ এবং অংশীজনদের জন্য অধিকতর সহজলভ্য।’’
মাসুদ খান বলেন, ‘‘বিগত বছরগুলোতে আমাদের পুঁজিবাজার প্রবৃদ্ধি ও আশাবাদের অনেক সময় অতিক্রম করেছে। তবে একই সঙ্গে এমন কিছু চ্যালেঞ্জেরও মুখোমুখি হয়েছে, যা বিনিয়োগকারীদের আস্থা দুর্বল করেছে, ভালো মানের কোম্পানিগুলোকে বাজারে আসতে নিরুৎসাহিত করেছে, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ কমিয়েছে এবং বৃহত্তর অর্থনীতিতে পুঁজিবাজারের অবদানকে সীমিত করেছে। অনেক বিনিয়োগকারী ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন। অনেক ভালো কোম্পানি পুঁজিবাজারের বাইরে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। একসময় বাংলাদেশকে সম্ভাবনাময় বিনিয়োগ গন্তব্য হিসেবে বিবেচনা করা বিদেশি বিনিয়োগকারীরা এখন আরও সতর্ক। মিউচুয়াল ফান্ড শিল্প, যা আমাদের পুঁজিবাজারের অন্যতম শক্তিশালী ভিত্তি হওয়ার কথা ছিল, সেটিও বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জন করতে পারেনি।’’
বিএসইসি চেয়ারম্যান স্পষ্ট করে জানান, কমিশনের উদ্দেশ্য কখনোই মূল্য নিয়ন্ত্রণ বা বাজারের স্বাভাবিক ওঠানামা ঠেকানো নয়; বরং ন্যায্য মূল্য এবং তথ্যের সমান প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা। ইনসাইডার ট্রেডিং, সার্কুলার ট্রেডিং, ওয়াশ ট্রেড, পাম্প-অ্যান্ড-ডাম্প, ফ্রন্ট রানিংসহ সব ধরনের অনিয়ম দ্রুত শনাক্ত করে কঠোর আইন প্রয়োগ করা হবে। প্রয়োজনে বিনিয়োগকারী সুরক্ষা ও বাজারের সততা রক্ষায় তাৎক্ষণিকভাবে লেনদেন স্থগিত সহ কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
নীতিমালার ক্ষেত্রে চেয়ারম্যান আরও স্মার্ট, নীতিনির্ভর ও ঝুঁকিভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ কাঠামোর কথা জানান। বিনিয়োগকারী সুরক্ষা অক্ষুন্ন রেখে অপ্রয়োজনীয় রিপোর্টিং, অনুমোদন ও কমপ্লায়েন্সের বোঝা কমাতে বিদ্যমান বিধিমালা পুনর্মূল্যায়ন করা হবে। আন্তর্জাতিক উত্তম চর্চার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ত্রৈমাসিক ও অন্তর্বর্তীকালীন আর্থিক প্রতিবেদন কাঠামো সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়ার কথাও জানান তিনি।
একই সঙ্গে ভালো মানের তালিকাভুক্ত কোম্পানির সংখ্যা বাড়াতে বহুজাতিক, রাষ্ট্রায়ত্ত ও বড় স্থানীয় কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোকে শেয়ারবাজারে আনতে সক্রিয় উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে জানান বিএসইসির চেয়ারম্যান। তালিকাভুক্ত কোম্পানির জন্য কর ও নীতিগত সুবিধা বৃদ্ধি, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী ও মিউচুয়াল ফান্ড শিল্পে সুশাসন জোরদার এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণও সংস্কার এজেন্ডার গুরুত্বপূর্ণ অংশ বলে জানান তিনি।
তিনি বলেন, আস্থা বক্তৃতার মাধ্যমে তৈরি হয় না; আস্থা আসে ন্যায়পরায়ণতা, স্বচ্ছতা, ধারাবাহিক নীতিমালা ও জবাবদিহিতার মাধ্যমে। সেই বিশ্বাস পুনর্গঠনের লক্ষ্যে নতুন কমিশনের এই সংস্কার যাত্রা শুরু।
প্রধানমন্ত্রীর বিনিয়োগ ও শেয়ারবাজার বিষয়ক বিশেষ সহকারী তানভীর গনি বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতিকে বড় করতে ব্যাংকিং খাতের একক নির্ভরতা কমিয়ে পুঁজিবাজারকে একটি আঞ্চলিক পাওয়ার হাউসে রূপান্তর করা অপরিহার্য। বড় প্রকল্পের অর্থায়নে ব্যাংকের সীমাবদ্ধতা থাকায় ক্যাপিটাল মার্কেটই একমাত্র ভরসা।
কমিশনার নাফিজ আল তারিক বলেন, ‘‘ক্যাপিটাল মার্কেট একটি ক্রান্তিলগ্নে আছে। আমরা আশা করি যে একটি টিম হিসেবে আমরা কাজ করব, যাতে আমরা আমাদের ক্যাপিটাল মার্কেটের আস্থা ফিরিয়ে আনতে পারি।’’
কমিশনার তানভীর হাবিব রহমান বলেন, ‘‘আমার আশা হচ্ছে লন্ডনের সেরা চর্চাগুলো (বা সব ভালো কাজের নিয়মগুলো) আমি এখানে নিয়ে আসব। আর আমি এখানে আসতে পেরে অত্যন্ত আনন্দিত।’’
কমিশনার নাহিদ মাহতাব বলেন, ‘‘সবার যদি সদিচ্ছা থাকে বা আমরা একসঙ্গে যদি সবাই মিলে কাজ করতে পারি, তাহলে শেয়ার বাজারের উন্নয়ন করতে সক্ষম হবো।’’
ঢাকা/নাজমুল/বকুল
চাঁপাইনবাবগঞ্জে বজ্রপাতে ৬ জনের মৃত্যু