ঢাকা     বুধবার   ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২০ ||  আশ্বিন ৮ ১৪২৭ ||  ০৫ সফর ১৪৪২

সাপে কাটলে কী করবেন, কী করবেন না

জাহিদ সাদেক || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ০৯:১৯, ৯ আগস্ট ২০২০   আপডেট: ১২:২৮, ২৯ আগস্ট ২০২০
সাপে কাটলে কী করবেন, কী করবেন না

বর্ষা মৌসুমে এবং বন্যাদুর্গত এলাকায় মানুষের মতো সাপও বাস্তুহীন হয়ে পড়ে। যার কারণে বাংলাদেশে মে, জুন জুলাই মাসে বেশি সাপে কাটার ঘটনা ঘটে। তবে সাধারণত অক্টোবর পর্যন্ত সাপ কাটার প্রকোপ অব্যহত থাকে। এই সময়ে যেখানেই সাপ শুকনো জায়গা যেখানে পায়, সেখানেই আশ্রয় নেয়। ফলে এই সময়গুলোতে সাপে কাটার রোগীর সংখ্যা অনেক বেড়ে যায়। তাই সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।

টক্সিকোলজি সোসাইটি অব বাংলাদেশের তথ্যমতে, বাংলাদেশে প্রায় ১০০ প্রজাতির সাপ রয়েছে। এর মধ্যে ২৭ ধরনের সাপ বিষাক্ত। আবার এদের মধ্যে ১৬ ধরনের সাপই সামুদ্রিক। বাংলাদেশে ৪ প্রজাতির সাপের কামড়ে মানুষ বেশি মারা যায়। এরা হলো গোখরো, কেউটে, চন্দ্রবোড়া এবং কালাচ। এছাড়া মারাত্মক বিষধর শাঁখামুটি সাপ আছে, কিন্তু শাঁখামুটি এতোই শান্ত যে, কামড়ের ঘটনা বিরল। সাপে কাটলে এর প্রাথমিক করণীয়-বর্জনীয় নিয়ে কথা হয় ডা. তরিকুল হাসানের সঙ্গে। তিনি বলেন, সাপে কাটলে যথাসাধ্য শান্ত থাকতে হবে। আতঙ্ক বা ভয় হৃদকম্পন বাড়িয়ে দেবে। যদি সাপটি বিষধর হয় তাহলে হৃদকম্পনের কারণে শরীরে দ্রুত বিষ ছড়িয়ে পড়বে। তাই সর্বোচ্চ পর্যায়ের শান্ত থাকতে হবে। এমনকি নির্বিষ সাপের কামড়েও শুধুমাত্র হার্ট অ্যাটাকে মৃত্যু হওয়ার ঘটনা অনেক বেশি ঘটে। অযথা কোনো সময় ক্ষেপণ করা যাবে না। কোনো ওঝার কাছে না গিয়ে সরাসরি হাসপাতালে যেতে হবে।

কোনো ধরনের কুসংস্কারমূলক পদক্ষেপ যেমন-হারবাল পেস্ট কিংবা গোবর সাপে কাটা স্থানে লাগানো যাবে না। এতে সেখানে ইনফেকশন বৃদ্ধি পেতে পারে। সাপে কাটার স্থানটি ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বিষাক্ত সাপের ক্ষেত্রে দুইটি কাটা দাগ পাওয়া যাবে। এর বেশি দেখা গেলে সেটি বিষাক্ত সাপ নয়। কিন্তু কাটার দাগ না পেলে যে সেটি বিষাক্ত নয়, এমন মনে করা যাবে না।

ক্ষতস্থানের যত্নে কিছু অবৈজ্ঞানিক পদ্ধতি চালু আছে, যা আপনার শারীরিক অবস্থা আরো খারাপ করে দেবে। ক্ষতস্থান কেটে শুষে বিষ বের করার চেষ্টা করবেন না। ক্ষতস্থান কাটলে ইনফেকশন হতে পারে। কেউ শুষে বিষ বের করতে গিয়ে বিষ গিলে ফেলতে পারে। এতে তারা বিষাক্রান্ত হয়ে যাবেন। ক্ষতস্থানে টার্নিকেট বা বরফ ব্যবহার করবেন না।

পরিষ্কার কাপড় পানিতে ভিজিয়ে আহত স্থান ধীরে ধীরে পরিষ্কার করতে হবে। সাপে কাটার স্থানের উপরে বাঁধন দেয়ার ব্যাপারটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এমনভাবে বাধন দিতে হবে যেন শিরার রক্তহপ্র্রবাহ বন্ধ হলেও ধমনির রক্তপ্রবাহ বন্ধ না হয়। ধমনির রক্ত প্রবাহ বন্ধ হলে আক্রান্ত অঙ্গটি একেবারে নষ্ট হয়ে যেতে পারে। খুব শক্ত করে বাধলে ধমনিতে রক্ত প্রবাহ চলতে পারে না। শিরা উপরে থাকায় হালকা করে বাধলেও শিরার রক্ত প্রবাহ বন্ধ করা সম্ভব। এজন্য বাঁধন দিতে হবে গামছা, ওড়না বা মাফলার দিয়ে অর্থাৎ নরম কাপড় দিয়ে বাধন দিতে হবে। বাধন দিতে হবে তিনটি। আবার ২০ মিনিট পরপর খুলে আবার লাগাতে পারেন। ভুলেও লোহার তার, সুতলি, কারেন্টের তার বা অন্য সরু জিনিস দিয়ে বাঁধা যাবে না।

সাপে কাটার পর দৌড়ালে বা খুব দ্রুত হাঁটলে, হার্ট দ্রুতগতিতে পাম্পিং করে যার ফলে বিষ দ্রুত সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়তে পারে। যত কম নড়াচড়া হবে তত কম হারে বিষ সারা শরীরে ছড়াবে। স্কেল বা বাঁশের টুকরোসহ হাতে/পায়ে (কামড়ের স্থানে) কাপড় দিয়ে হাল্কা করে বেঁধে দিতে হবে। হাত বা পা (কামড়ের নিকটতম স্থান) যেন ভাঁজ না হয়ে থাকে, তাই এই ব্যবস্থা করতে হবে।

শরীর থেকে আংটি, চুড়ি, ব্রেসলেট খুলে ফেলতে হবে। কিছু সাপের বিষে আঙুল, হাত বা পা ফুলে যেতে পারে। আংটি বা চুড়ি থাকলে রক্তপ্রবাহ বন্ধ হয়ে পঁচন ঘটতে পারে। রোগীকে খাওয়ানোর ক্ষেত্রেও সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। রোগীর যদি অনেক বেশি বমি হয় অথবা রোগী যদি নাঁকি সুরে কথা বলে কিংবা রোগীর ঢোক গিলতে সমস্যা হলে রোগীকে কোনো কিছু না খাওয়ানোই উত্তম। রোগীকে খাওয়াতে হলে বসিয়ে খাওয়াতে হবে। কাঁশি দিলে বন্ধ করতে হবে।

সাপের বিষ কয়েক ধরনের হতে পারে। সবচেয়ে বেশি মৃত্যু ঘটে নিউরোটক্সিন রিলিজ করা সাপের কামড়ে। এক্ষেত্রে ঝিমঝিম লাগবে। চোখে ঝাঁপসা দেখবে। চোখের উপরের পাতা নেমে চোখ অংশিক বন্ধ হয়ে যাবে। মাথা ঝুলে যাবে। জিহ্বা ও শ্বাসনালী ফুলে যাবে। শ্বাস নিতে পারবে না। মুখে লালা ঝরবে। দাঁড়িয়ে থাকতে পারবে না। বমি করতে পারে। চন্দ্রবোড়া কামড় দিলে লোহিত রক্তকণিকা ভেঙে যায়। ফলে রক্তবমি, রক্তপায়খানা হতে পারে। কামড়ের জায়গায় রক্ত ঝরতে পারে। ফুলে যেতে পারে, লাল হতে পারে। ফোস্কা পড়তে পারে। কালোও হতে পারে।

এশিয়ার বিষাক্ততম সাপ কালাজ এর কামড়ে কোনো জ্বালাযন্ত্রণা থাকে না, দংশন স্থানে কোনো চিহ্ন পাওয়া প্রায় যায়ই না। পেটে ব্যাথা, গাঁটে গাঁটে ব্যাথা, খিঁচুনি কিংবা শুধুমাত্র দুর্বলতা অনুভব করার লক্ষণের সঙ্গে দুচোখের পাতা পড়ে আসা নিশ্চিত কালাজের কামড়ের লক্ষণ।

ক্ষতস্থান শুষে বিষ বের করার চেষ্টা করবেন না। কেউ শুষে বিষ বের করতে গিয়ে বিষ গিলে ফেলতে পারেন। তাই এমন কাজ করতে যাবেন না। এছাড়া সাপে কাটা স্থানে ভুলেও অ্যাসিড ঢালা যাবে না। কারণ কার্বলিক অ্যাসিডে ক্ষতস্থান ঝলসে যাবে। সম্ভব হলে সাপটিকে চিনে রাখুন। এতে চিকিৎসা পেতে সুবিধা হবে। প্রাথমিক চিকিৎসার পর রোগীকে দ্রুত নিকটস্থ হাসপাতালে কিংবা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে পাঠানোর ব্যবস্থা করতে হবে, যেখানে অ্যান্টিভেনম সিরাম বা সর্পবিষনাশী সিরাম (যেমন হফকিনস পলিভ্যালেন্ট অ্যান্টিভেনম) দিতে হবে। রাসেল ভাইপারভ বাদে সব সাপেরই বিষের অ্যান্টিভেনম আছে। তবে কোনো অবস্থাতেই বাজার থেকে অ্যান্টিভেমন কিনে এনে দেয়া যাবে না। কারণ সাপের ভ্যাকসিনের মারাত্মক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হতে পারে। সেজন্য আইসিইউ প্রস্তত রাখা দরকার।

সাপের কামড় এড়াতে বাড়ির চারপাশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখুন। রাতে অবশ্যই বিছানা ঝেড়ে মশারি টাঙ্গিয়ে শোবেন। অন্ধকারে হাঁটাচলা করবেন না, একান্তই বাধ্য হলে হাতে লাঠি নিয়ে রাস্তা ঠুকে চলুন, হাততালি দিয়ে লাভ নেই, কারণ সাপের কান নেই। জুতো পরার আগে তা ঝেড়ে নিন। বাড়িতে  ইঁদুরের কোনো গর্ত থাকলে তা আজই বুজিয়ে ফেলুন। পাথরের ফাঁক, যেকোনো গর্ত, ঘন ঝোঁপ বা সাপ থাকতে পারে এমন জায়গায় হাত দিবেন না। ঝোঁপ বা লম্বা ঘাসের ওপর হাঁটার সময় নজর নিচের দিকে রাখুন। একমাত্র সাবধানতাই সাপের কামড় থেকে আমাদের বাঁচাতে পারে।

ঢাকা/ফিরোজ

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়