লালবাগ কেল্লায় দর্শনার্থীদের ভিড়
লালবাগ কেল্লায় দর্শনার্থীদের ভিড়। ছবি: রাইজিংবিডি
রাজধানীর ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোতে ছড়িয়ে পড়েছে ঈদের আনন্দ। পবিত্র ঈদুল ফিতরের তৃতীয় দিনে পরিবার-পরিজন ও বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটাতে দর্শনার্থীদের ঢল নেমেছে লালবাগ কেল্লা প্রাঙ্গণে।
সোমবার (২৩ মার্চ) সকাল থেকে বাড়তে থাকা ভিড় দুপুরের দিকে জনসমাগমে রূপ নেয়।
ঐতিহ্য, ইতিহাস এবং উৎসবের আবহ মিলিয়ে পুরো এলাকা হয়ে ওঠে প্রাণবন্ত।
দর্শনার্থীদের অনেকেই পরিবার নিয়ে ঘুরতে এসেছেন। রুমা খাতুন দুই বছরের শিশুকে সঙ্গে নিয়ে কেল্লা দেখতে এসে জানান, ঈদের ছুটিতে সময় পাওয়ায় কাছাকাছি একটি ঐতিহাসিক স্থানে ঘুরতে এসেছেন।
তিনি বলেন, “ইতিহাস ও ঐতিহ্যের বিষয়গুলো দেখে ভালো লেগেছে এবং ভবিষ্যতেও এখানে আসার ইচ্ছা রয়েছে।” কেল্লা প্রাঙ্গণে ফুলের সৌন্দর্য তাকে বিশেষভাবে মুগ্ধ করেছে।
উত্তরা থেকে আসা মোহাম্মদ মমিনুল হক বলেন, “জায়গাটি তুলনামূলক ছোট হলেও এর পরিবেশ অত্যন্ত মনোরম। কেল্লা ঘুরে দেখার পর পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী খাবারের স্বাদ নেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে।”
মিরপুর-১ থেকে আসা মুসলিমা বেগম জানান, “কাছেই চিড়িয়াখানা থাকলেও ভিড় এড়াতে তিনি লালবাগ কেল্লা বেছে নিয়েছেন।” পরিচ্ছন্ন পরিবেশ এবং বসে সময় কাটানোর সুবিধা থাকায় এখানে আসতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন বলে জানান তিনি।
রামপুরা থেকে আসা মর্জিনা বেগম জানান, বইয়ে লালবাগ কেল্লার ইতিহাস পড়লেও সরাসরি দেখা হয়নি আগে। ঈদের ছুটিতে পরিবারের সবাইকে নিয়ে এসে সারাদিন কাটানোর পরিকল্পনা করেছেন। সঙ্গে খাবার নিয়ে এসে কেল্লা প্রাঙ্গণেই সময় উপভোগ করছেন।
যাত্রাবাড়ী থেকে আসা মাদ্রাসা ছাত্র মুস্তাকিন জানায়, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কেল্লার মসজিদের ছবি ও ভিডিও দেখে তার আগ্রহ তৈরি হয়। বিশেষ করে মসজিদের স্থাপত্যশৈলী তাকে আকৃষ্ট করেছে। বাস্তবে দেখে সেই আগ্রহ আরো বেড়েছে বলে জানান তিনি।
ঐতিহাসিকভাবে লালবাগ কেল্লা মুঘল আমলের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। ১৬৭৮ সালে মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেবের পুত্র শাহজাদা মুহাম্মদ আজম শাহ ঢাকায় এসে দুর্গ নির্মাণের কাজ শুরু করেন। তিনি এর নাম দেন ‘কিল্লা আওরঙ্গবাদ’। তবে অল্প সময়ের মধ্যেই দিল্লিতে ফিরে যেতে হওয়ায় নির্মাণকাজ অসমাপ্ত থেকে যায়।
পরবর্তীতে সুবেদার শায়েস্তা খাঁ ঢাকায় এসে দুর্গটির নাম পরিবর্তন করে লালবাগ কেল্লা রাখেন এবং নির্মাণকাজ এগিয়ে নেন। তবে তার কন্যা পরিবিবির অকালমৃত্যুর পর তিনি নির্মাণকাজ বন্ধ করে দেন। পরিবিবির স্মৃতিতে নির্মিত সমাধিসৌধটি বর্তমানে কেল্লার অন্যতম প্রধান আকর্ষণ।
প্রায় ১৯ একর জায়গাজুড়ে বিস্তৃত এই দুর্গে রয়েছে মসজিদ, দেওয়ান-ই-আম (দরবার হল), পরিবিবির সমাধি, বুরুজ, জলাধার ও ছাদবাগানসহ নানা স্থাপনা। তিন গম্বুজবিশিষ্ট শাহী মসজিদটি মুঘল স্থাপত্যশৈলীর একটি অনন্য নিদর্শন, যা দর্শনার্থীদের বিশেষভাবে আকর্ষণ করে।
দেওয়ান-ই-আম ভবনটি একসময় বিচারালয় ও বাসভবন হিসেবে ব্যবহৃত হতো। বর্তমানে এটি জাদুঘরে রূপান্তরিত হয়েছে, যেখানে মুঘল আমলের বিভিন্ন নিদর্শন সংরক্ষিত রয়েছে। শায়েস্তা খাঁর ব্যবহৃত সামগ্রী এবং হাতে লেখা কোরআন শরিফও এখানে প্রদর্শিত হয়।
ঐতিহাসিকদের মতে, ১৭০৪ সালে রাজধানী ঢাকা থেকে মুর্শিদাবাদে স্থানান্তরের পর থেকেই কেল্লাটি তার জৌলুস হারাতে শুরু করে। এছাড়া, ১৮৯৭ সালের ভূমিকম্পে বুড়িগঙ্গা নদীর গতিপথ পরিবর্তিত হওয়ায় কেল্লার পরিবেশেও পরিবর্তন আসে।
বর্তমানে লালবাগ কেল্লা শুধু একটি ঐতিহাসিক নিদর্শন নয়, বরং রাজধানীবাসীর বিনোদন ও অবসর কাটানোর অন্যতম জনপ্রিয় স্থান। বিশেষ করে ঈদের মতো উৎসবের সময় এখানে দর্শনার্থীদের ভিড় বেড়ে যায় কয়েকগুণ। ইতিহাসের আবহে উৎসবের আনন্দ উপভোগ করতে প্রতিদিনই এখানে ভিড় জমাচ্ছেন নানা বয়সী মানুষ।
ঢাকা/আলী/ইভা