ঢাকা, শুক্রবার, ২৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৬, ১৩ ডিসেম্বর ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

দৈত্যর গর্জন রেখে আত্মা শুদ্ধ করুন

আমিনুল ইসলাম শান্ত : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৯-১১-২২ ১:০৭:৫৭ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৯-১১-২২ ২:৪৯:৫১ পিএম

পাঠশালা থেকে ফেরার পথে বাচ্চারা খেলতে যেত দৈত্যপুরীর বাগানে। ঘাসের উপর চমৎকার সব ফুল ফুটে থাকত, ঠিক যেন আকাশের তারা! বসন্তকালে বাগানে বারোটা ফলের গাছ ভরে গোলাপী আর মুক্তো-রঙের কুঁড়ি ফুটত, শরৎকালে তারা নুইয়ে পড়ত ফল-ভারে। তখন গাছের ডালে ডালে পাখির গান শুনতে শুনতে খেলা থামিয়ে বাচ্চারা ভাবত— ইশ, আমরা কতই না সুখে আছি!

একদিন দৈত্য তার বাগানে ফিরে এল। ফিরে এসে দেখতে পেল পুরীর বাগানে বাচ্চার দল খেলা করছে। ‘এখানে কী করা হচ্ছে’ বলে হাঁক দিতেই বাচ্চারা ছুটে পালাল। ‘আমার পুরীর বাগান! আর সেখানে কিনা অন্যরা এসে খেলা করবে? একি অন্যায় কথা? আমার বাগানে আমি খেলা করব’ বলে গজগজ করতে করতে দৈত্যমশায় বাগানের চারপাশে উঁচু দেয়াল তুলে মস্ত বড় সাইনবোর্ড সাঁটাল। তাতে লিখল— ‘বিনা অনুমতিতে প্রবেশ করলে কঠোর শাস্তি হবে।’

এখন পাঠশালা ছুটি হয়ে গেলে বাচ্চারা দৈত্যপুরীর বাগানের উঁচু দেয়ালের বাইরে ঘুরে বেড়ায়, আর পরস্পর বলাবলি করে, ‘আহা রে, আগে আমরা কত ভালো ছিলাম!’ তারপর বসন্ত আসে। রাজ্য ফুলের শোভা আর পাখির গানে মেতে উঠল। কিন্তু হিংসুটে দৈত্যের বাগানে কেবল কনকনে উত্তরের হাওয়া। পাখিরা বলল, দৈত্যপুরীর বাগানে বাচ্চারা ঢুকতে পারে না, সেখানে আমাদের গাইতে বয়েই গেছে। তাই সেখানে আর পাখিও ডাকে না, ফুলও ফোটে না। একবার একটি ছোট্ট ফুল ঘাসের ভিতর থেকে মাথা তুলে চেয়েছিল, কিন্তু সেই মস্ত সাইনবোর্ড দেখে মনে ভারী দুঃখ পেয়ে আবার মাটির তলায় ঘুমিয়ে পড়ল। এ গল্পের শেষে দৈত্য তার ভুল বুঝতে পারে এবং বাচ্চাদের খেলার জন্য অনুমতি দেয়। দৈত্যপুরী আবার সুখের স্বর্গে রূপ নেয়।

নতুন সড়ক পরিবহন আইন সংশোধনের দাবিতে গত কয়েকদিন সারা দেশের বাস-ট্রাক শ্রমিকরা কর্মবিরতি পালন করেছেন। সেখানে চিত্রনায়ক ইলিয়াস কাঞ্চনকেও হেয় প্রতিপন্ন করা হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে একাধিক স্থিরচিত্র। সেখানে দেখা যায়, ইলিয়াস কাঞ্চনের ছবি সম্বলিত ব্যানার টাঙিয়ে কিংবা কুশপুত্তলিকা তৈরি করে তাতে জুতার মালা পরানো হয়েছে। কিছু ব্যানারের ছবিও ফেসবুকে দেখা যাচ্ছে। তাতে ইলিয়াস কাঞ্চনকে উদ্দেশ্য করে বিভিন্ন কটূক্তি লেখা। এসব লেখা ফেসবুকে পড়ে হুমায়ূন আজাদের একটি উক্তি মনে পড়ে গেল। উক্তিটি হলো— ‘আমাদের অধিকাংশের চরিত্র এত নির্মল যে, তার নিরপেক্ষ বর্ণনা দিলেও মনে হয় অশ্লীল গালাগাল করা হচ্ছে’। ইলিয়াস কাঞ্চনকে নিয়ে যারা এ ধরনের বক্তব্যসমেত ব্যানার প্রকাশ করেছেন তাদের চরিত্র বিশ্লেষণ করলে হুমায়ূন আজাদের এই উক্তির মতোই হবে।

১৯৯৩ সালের ২২ অক্টোবর শুটিং দেখতে যাওয়ার পথে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান ইলিয়াস কাঞ্চনের স্ত্রী জাহানারা কাঞ্চন। স্ত্রী মারা যাওয়ার পর ১৯৯৩ সালের ১ ডিসেম্বর ‘নিরাপদ সড়ক, নিরাপদ জীবন’ শ্লোগানে কাজ শুরু করেন। তারপর থেকে এখনো কাজ করে যাচ্ছেন ইলিয়াস কাঞ্চন। নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) আন্দোলন বাংলাদেশে ব্যাপকভাবে পরিচিতি লাভ করেছে। এর সঙ্গে বিভিন্ন মহল একাত্মতা ঘোষণা করেছে। বর্তমানে নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলনের তিনি প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ও প্রধান কাণ্ডারি। আন্তর্জাতিক সংগঠনগুলোর সঙ্গে কাজ করছেন তিনি। এই আন্দোলন যখন ইলিয়াস কাঞ্চন শুরু করেন তখন তিনি অভিনয় ক্যারিয়ারে শীর্ষে অবস্থান করছিলেন। অকালে স্ত্রীকে হারিয়ে সড়ক নিরাপদের দাবি পূরণের লক্ষ্যে সবকিছু ত্যাগ করেন তিনি। ঝলমলে জগতের একজন মানুষের কাছে এই ত্যাগ অনেক কঠিন। কিন্তু তার বিনিময়ে এই মানুষটিকে কী উপহার দিচ্ছেন?

বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনা রোধের জন্য যে আন্দোলন তা ইলিয়াস কাঞ্চনের হাত ধরে শুরু হয়েছিল। আর এটাই তার অপরাধ। এজন্য শ্রমিকরা ইলিয়াস কাঞ্চনকে এভাবে হেয় প্রতিপন্ন করছেন! কিন্তু এই যে নিরাপদ সড়কের দাবি, তাতে ইলিয়াস কাঞ্চনের স্বার্থ কতটা? সড়ক নিরাপদ হলে তো সবার পরিবারের সদস্য নিরাপদ থাকবে। নাকি ইলিয়াস কাঞ্চন দেশের সব সড়কে একাই চলাচল করেন? এই সড়কে তো বাস-ট্রাক শ্রমিকের সন্তানও চলাফেরা করেন। গত বছরের মাঝামাঝি সময় নগরীর বিমানবন্দর সড়কে অপেক্ষারত একদল কলেজশিক্ষার্থীর ওপর যাত্রীবাহী বাস উঠিয়ে দেয়ার ঘটনা ঘটেছিল। এতে একজন ড্রাইভারের সন্তানও মারা যান। এতেও কি শ্রমিকদের বোধ জাগ্রত হবে না? সড়ক নিরাপদ হলে তো তাদের সন্তানও নিরাপদ। এটা সাধারণ সমীকরণ। নাবালকও এ তত্ত্বকথা বুঝবে। তবে কাদের উৎসাহে এসব কুরুচিপূর্ণ কাজ করছেন শ্রমিকেরা? যদিও শ্রমিকদের কাণ্ডারিরা গণমাধ্যমে বলেছেন— ‘সড়ক পরিবহন আইন নিয়ে ইলিয়াস কাঞ্চন বিভিন্ন সময় টেলিভিশনে নানা মন্তব্য এবং দাবি তোলার কারণে শ্রমিকদের কেউ-কেউ তার উপর ক্ষুব্ধ হতে পারে।’ তার মানে দাঁড়াচ্ছে শ্রমিকদের উস্কানি বা পরিচালিত তারা করেননি। কিন্তু ষাঁড়ের জোর যে খুঁটি তা তো বেমালুম ভুলে গেলেন এই দৈত্য শ্রেণির মানুষেরা। দেশের ১৮ কোটি মানুষ এতই বোকা যে, খুঁটির জোর কোথায় তারা উপলদ্ধি করতে পারেন না! ‘পয়সার সঙ্গে সঙ্গে রুচি বলে একটা বস্তু নাকি চলে আসে। ডাহা মিথ্যা কথা; এই জিনিসটা সঙ্গে নিয়ে জন্মাতে হয়।’— নেতাদের কর্মকাণ্ড ও রুচিবোধ দেখে হুমায়ূন আহমেদের উক্তিটি মনে পড়ল।

গল্পের দৈত্য ক্ষমতা দেখিয়ে তার বাগানের ফুলের শোভা হারিয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে ভুল বুঝতে পেরে বাচ্চাদের বাগানে ফিরিয়ে এনেছিল। এতে তার মৃতপ্রায় বাগানটা আবার প্রাণ ফিরে পায়। সেই সঙ্গে বাচ্চারাও আবার আনন্দ-উল্লাসে মেতে ওঠে। দৈত্যর মতো এহেন নেক্কারজনক কাজের সঙ্গে যারা জড়িত তাদেরও আত্মার শুদ্ধি প্রয়োজন। না হলে এই দেশ থেকে প্রতিবাদী ও ভালো কাজে এগিয়ে আসা মানুষগুলো হারিয়ে যাবে। তাতে এই সোনার বাংলা স্বর্গ হবে না। বরং দৈত্যর মৃত বাগানে রূপ নেবে।

 

ঢাকা/তারা

ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন