ঢাকা     শুক্রবার   ১৯ জুলাই ২০২৪ ||  শ্রাবণ ৪ ১৪৩১

বঙ্গবন্ধু: আকাশের গায়ে কখনো লাগে না দাগ

অজয় দাশগুপ্ত || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৫:৫৬, ১৫ আগস্ট ২০২০   আপডেট: ০৭:০০, ২৯ আগস্ট ২০২০
বঙ্গবন্ধু: আকাশের গায়ে কখনো লাগে না দাগ

খুব মনে পড়ে সেই দিনগুলোর কথা। আজ যা ইতিহাস, সেদিন ছিল সত্য। আমাদের যৌবনে বঙ্গবন্ধুর নাম বলা যেতো না। ‘জয় বাংলা’ উচ্চারণে ছিল বাধা। দিনের পর দিন বিভিন্ন মঞ্চে আমরা কথাগুলো বলে বলে মানুষকে স্মরণ করিয়ে দিলেও রাষ্ট্রীয় টিভি, বেতার, মিডিয়ায় সেই নামটি ছিল নিষিদ্ধ। সেই নিষিদ্ধ যে কতটা জাগ্রত আর আবেগময় হয়ে উঠেছিল তার প্রমাণ দেখেছিলাম ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ জেতার পর।

প্রথম যেদিন ৭ মার্চের ভাষণ প্রচারিত হলো ঢাকাসহ দেশের বড় বড় শহরগুলোর রাজপথ সন্ধ্যায় ফাঁকা হয়ে গিয়েছিল; যেন কারফিউ! যে কোনো হলিউড, বলিউড মুভির চাইতেও আকর্ষণে অধিক সে ভাষণ আমাদের বাড়িতে টেনে নিয়ে গিয়েছিল। যেন এক জাদুকরের জাদুময় টান! আজ কি আসলে সে অবস্থা আছে? অতি প্রচার আর অকারণ প্রচারে আমরা কি তার ধার কমিয়ে ফেলিনি?

একটা সময় বঙ্গবন্ধু পরিষদের মিছিল ছিল চোখে পড়ার মতো। আশা জাগানিয়া সেই মিছিল ১৫ আগস্টে কখন রাস্তায় নামবে, দেখার জন্য কৌতূহলী মানুষ লাইন ধরে দাঁড়িয়ে থাকতো। বিচারপতি থেকে সাধারণ মানুষের সেই সব শোভাযাত্রা আজ কিংবদন্তি। মানুষ চোখের পানি লুকিয়ে সবুর করতো কখন আবার ‘জয় বাংলা’ স্লোগানে মুখরিত হবে দেশ। কখন তারা বঙ্গবন্ধুকে ফিরে পাবেন। আজ কি সেই জায়গাটা তেমন রেখেছে রাজনীতি? স্পষ্ট মনে আছে, জীবনের শেষ দিকে বঙ্গবন্ধু তাঁর ভাষণে বারবার বলতেন, মানুষ আমাকে কেন এতো ভালোবাসে? আমি তো তাদের তেমন কিছু দিতে পারি নাই।

যে মানুষদের তিনি সুখী, স্বচ্ছল আর আধুনিক করতে প্রাণ দিয়েছেন তারা কষ্ট, অভাব-অনটন এড়িয়ে তাঁর জন্য গাছের ফল, বাগানের ফুল, মাঠের ফসল নিয়ে আসতো। দু’হাত ভরে গ্রহণ করে চোখের পানিতে ভাসতেন বঙ্গবন্ধু। কি বেদনা আর কি অভিমান ছিল তাঁর গলায়! নিজের অপারগতার কথা বলতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করতেন না। আর আজ? নেতারা ফল, ফুল গ্রহণ করেন না। কোথাও তারা পান সোনার নৌকা, কোথাও সোনার মুকুট, টাকার মালা। এরাই আবার বঙ্গবন্ধুর আদর্শ তুলে ধরার গল্প শোনান আমাদের।

রাজনীতি সব কালে, সবসময় তার নিজের মতো করে চলে। সেখানে অবিমিশ্র ভালো-মন্দ বলতে কিছু নেই। স্বাধীনতা পরবর্তী কালে কিছু ভুল নিশ্চয়ই ছিল। যার বড় একটি তাজউদ্দীনকে মূল্যায়ন না-করা। আর একটি ভুল- মোশতাকের মতো সাপকে বিশ্বাস করা। তার পরিণতি দেখেছি আমরা। রক্তের বন্যায় ভেসে যাওয়া ইতিহাসে তার নমুনা আছে। কিন্তু এ থেকে কি পাঠ নিয়েছে রাজনীতি? আজো ঘরে ঘরে মীরজাফর আর দুশমনের দল। তারাই ঘিরে আছে ক্ষমতাসীনদের। দূরে হটে গেছে নিবেদিত সৈনিকেরা। দল থেকে, রাজনীতি থেকে নির্বাসিত সেইসব ত্যাগীদের দীর্ঘশ্বাস কি ছেড়ে কথা বলবে?

আজকের বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ ছাড়া আর কিছু নেই। এটা কোনো শুভ বিষয় হতে পারে না। সবাই জানে, দলের ভেতরে সব জায়গায় সুবিধাভোগীরা ঢুকে গেছে। একেকটা বৈরী পরিবেশ বা রাজপথে ঘটনা দুর্ঘটনাতেই দেখি দল বা রাজনীতি কতটা অসমর্থ। এটুকু কে না বোঝে? কিন্তু সিংহাসনে থাকলে হয়তো তা চোখে পড়ে না। রাজা যেমন প্রজা ব্যাতীত সেনা উজির নাজির নিয়ে দীর্ঘদিন চলতে পারে না, গণতন্ত্র ও জনগণ ছাড়া বাস্তবে সরকারও অকার্যকর। আওয়ামী লীগের ভাগ্য ইতিহাস তাদের সঙ্গে আছে। এদেশের অতীত ঘটনায় তাদের অবদান, প্রয়াত নেতাদের ভূমিকা এবং জীবিত কিংবদন্তি রাজনীতিকদের কারণে দল এখনো সচল। নতুন প্রজন্মের দিকে তাকালে সে ভরসা পাই না। বরং ভয় জাগে!

এই সেদিনও আমরা রাজপথে নেমে আসা তারুণের বুকে লাগানো পোস্টারের ভাষা দেখে চমকে উঠেছি। কোটা আন্দোলনের নামে উত্তপ্ত রাজপথে নেমে আসা যুবকের বুকে লেখা ছিল ‘আমি রাজাকার’। কৌশলে বা অপকৌশলে ‘রাজাকার’ শব্দটি জায়েজ করা হচ্ছে। এখন যুবসমাজে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে তেমন কোনো আবেগ নেই। এটা না মানলে আপনি সত্য অস্বীকার করছেন মাত্র। কিন্তু কেন নেই? একথা কি ভেবে দেখেছি আমরা? যে কোনো বিষয় খুব বেশি কচলাতে নেই। তাতে তেতো হয়ে যায় সবকিছু। মুক্তিযুদ্ধ একটি গৌরবময় অতীত। তার সঙ্গে জড়িয়ে আছে বঙ্গবন্ধু ও জাতির সম্মান। সে কথাটা ভুলে যত্রতত্র যেভাবে ইচ্ছে এর ব্যবহার আর ফল কি বয়ে আনতে পারে? যে কারণে কথাটা মনে করিয়ে দিতে চাই- এখনো সময় আছে, পাশের দেশগুলোর দিকে তাকান। সেসব দেশে সরকার বদলসহ অনেক কিছুই ঘটে, কিন্তু ইতিহাস বদলায় না। ইতিহাস নিয়ে মারামারি, তর্ক থাকলেও সেখানে সত্য এড়িয়ে যাওয়া বা অস্বীকারের চেষ্টা নেই। আওয়ামী লীগ যে অপশক্তির ভয়ে তা করে বা নিজেদের দুর্বলতা তৈরি করে তার উত্তরণে তারুণ্যের জড়িত হবার বিকল্প নেই। কিন্তু আজ বঙ্গবন্ধুর আমলে যে ছাত্রলীগ ছিল অগ্রগামী তারা কি সেই দায়িত্ব নিয়েছে? তাদের নামে বা তাদের কারণে যা হচ্ছে তাকে কি কেবল ষড়যন্ত্র বলে উড়িয়ে দেওয়া যায়? কারণে-অকারণে তাদের যে ভয়াবহ রূপ তা সামাল দেওয়ার কেউ নেই। অথচ বঙ্গবন্ধু একবার সামনে এসে দাঁড়ালে বীরের দল বাঘ থেকে ইঁদুর হয়ে গর্তে লুকাতো!

বলছিলাম আমাদের যৌবনের কথা। সেই সময় জাতি নিশ্চিতভাবে জানতো আমাদের মাথার ওপর অভিভাবক আছেন। শত বিপদেও যিনি দেশ ও জাতিকে ফেলে যাবেন না, বা বুক দিয়ে আগলে রাখবেন। তাঁর সেই বুক যারা ঝাঁঝরা করে দিয়েছিল সেই শয়তানদের বিচার ও শাস্তি হলেও দলের মীরজাফরদের ব্যাপারে নীরবতা আজও বোধগম্য নয়। কারণ এরা না থাকলে কেউ খুন করতে সাহস পেতো না। সমীকরণের নতুন অঙ্কে জায়েজ হয়ে যাওয়া এদের না ঠেকালে কীভাবে নিরাপদ হবে আওয়ামী লীগ? আর একটা বিষয় মনে করিয়ে দিতে চাই, সুষ্ঠু ও সমান্তরাল বিরোধিতা না থাকলে কোনো দেশের উন্নতি বা অগ্রগতি টেকসই হয় না। এটা নতুন কিছু না। নতুন শুধু আজকাল রাজনীতি সহ্যশক্তি হারিয়ে কেবলই একক আর সর্বগ্রাসী হয়ে উঠছে।

এই সর্বগ্রাসীতা বঙ্গবন্ধু বা তাঁর দোসর ও রাজনীতিকদের মানায় না। কারণ তিনি সবার। তিনি যদি সর্বজনীন হতে না পারেন, বা হতে দেওয়া না হয়, তাহলে এসব কাঙালি ভোজ আর শোকের মাতম একদিন পথ হারাবেই। পথ হারিয়ে ফেলেছে প্রায়। মানুষের মন ও বিবেকে বঙ্গবন্ধু যে কতটা শক্তিশালী তা আমরা জিয়া, এরশাদের আমলে দেখেছি। সে শক্তিটা যত্ন করে তুলে রাখাই ছিল বিবেচনার কাজ। সেটা কেউ করছে না। যা করছে তার নাম কোলাহল। একদিকে দলে, দলের বাইরে মোশতাক গং কিলবিল করছে। আরেকদিকে চলছে ষড়যন্ত্র। দেশে-বিদেশে বাংলাদেশের ইমেজ আর্থিকভাবে উন্নত হলেও নানা কারণে নিন্মমুখী। সেটা মনে না রাখলে সময় ছেড়ে কথা বলবে না।

সবচেয়ে জরুরি বাংলাদেশ এবং আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ভাবমূর্তি ও সন্মান বজায় রাখা। নানা ষড়যন্ত্রে ভগবান ভূত হবার সমাজ আমাদের। বদলে যাবার জন্য একপায়ে খাড়া দেশে কোনো কিছুই স্থায়ী নয়। এমনকি ইতিহাসও! তাই বড় ভয় লাগে। বঙ্গবন্ধু তাঁর আপন মহিমায় উদ্ভাসিত। তারপরও আমরা যেন এমন অস্ত্র, এমন ভালোবাসা, আর এমন আশ্রয়কে অপব্যবহারে মলিন না করি। যেদিকে তাকাই বন্দনা আর স্তাবকতায় অন্ধ রাজনীতি তাঁকেও রেহাই দিচ্ছে না। মনে হয় সে গানটিই যেন সত্য: ‘তোমার কথা হেথা কেহ তো বলে না করে শুধু মিছে কোলাহল।’

বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ একাকার, অভিন্ন বলেই তাঁকে পবিত্র রাখা জাতীয় দায়িত্ব। অবশ্য তিনি সেই কবিতার মতো: মেঘেরা যা খুশি লিখে রেখে যাক, আকাশের গায়ে কখনো লাগে না দাগ।

 

লেখক: প্রাবন্ধিক, সাংবাদিক

ঢাকা/তারা

আরো পড়ুন  



সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়