RisingBD Online Bangla News Portal

ঢাকা     শুক্রবার   ২৭ নভেম্বর ২০২০ ||  অগ্রাহায়ণ ১৩ ১৪২৭ ||  ১০ রবিউস সানি ১৪৪২

করোনাকালে বেসরকারি স্বাস্থ্যখাতের সার্বিক চিত্র

মেসবাহ য়াযাদ || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৮:৫৪, ২১ নভেম্বর ২০২০  
করোনাকালে বেসরকারি স্বাস্থ্যখাতের সার্বিক চিত্র

বিশ্বব্যাপী করোনার প্রথম ধাপ শেষ হয়েছে। এখন চলছে দ্বিতীয় ধাপ। ইতোমধ্যে সরকারি হিসাব মতে বাংলাদেশে এ পর্যন্ত করোনা টেস্ট করে রোগী হিসেবে শনাক্ত হয়েছেন (১৫ নভেম্বর পর্যন্ত)- ৪,৩০,৪৯৬ জন। চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়েছেন ৩,৪৭,৮৪৯ জন। আর করোনায় আক্রান্ত হয়ে এ পর্যন্ত মারা গেছেন ৬,১৭৩ জন। বিশ্বময় আজ পর্যন্ত করোনায় আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা ৫,০৩,৫৩,৬১৫ জন। সুস্থ হয়েছেন ৩,৫৬,০৬,০৬৫ জন এবং মারা গেছেন ১২,৫৭,৪৪১ জন।

প্রথম দিকে করোনাকে ঘিরে মানুষের মধ্যে যে ভয় আর সচেতনতা ছিল, এখন তার অনেকটাই দেখা যাচ্ছে না। ক্রমে মানুষ করোনার ভয় থেকে বেরিয়ে আসছেন। জীবন আর জীবিকার প্রয়োজনে মানুষ বাধ্য হয়েই ঘরের বাইরে বের হচ্ছে। তারা যাচ্ছে কর্মস্থলে। বেশিরভাগ মানুষেরই নিজেদের পরিবহন না থাকায়, বাধ্য হয়ে গণপরিবহন ব্যবহার করতে হচ্ছে। কিন্তু সচেতনতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে না অনেকের মধ্যেই। বিশেষ করে মফস্বল শহর আর গ্রামের মানুষ একেবারেই অসচেতন এ ব্যাপারে। সেনিটাইজেশন করা, ঘন ঘন সাবান দিয়ে হাত ধোয়া, এসব এখন যেনো ‘কথার কথা’। মাস্ক পরছেন না বেশিরভাগ মানুষ। যারা পরছেন, তারাও সঠিকভাবে পরছেন না।

করোনার প্রথম দিকে হাসপাতালের আইসিইউতে সিট না পেয়ে অনেকের মৃত্যু হয়েছে বলে জেনেছি আমরা। করোনায় আক্রান্ত সবার জন্যই যে আইসিইউ বেড প্রয়োজন ছিল বা আছে, তাও না। করোনায় আক্রান্তদের বয়স ৬০ বছরের বেশি হলে, আক্রান্ত রোগীর হৃদরোগ, কিডনিরোগ বা শ্বাসজনিত সমস্যা থাকলেই কেবল তাদের অনেকের জন্য আইসিইউ বেড দরকার হয়। এমনিতেই আমাদের দেশে, স্বাভাবিক সময়ে, রোগীর চাহিদার তুলনায় আইসিইউ বেডের সংখ্যা অনেক কম। যা আছে, তার বেশিরভাগই ঢাকার বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে। দেশের সরকারি ৫২টি হাসপাতালে আছে ৭৩৩টি আইসিইউ বেড। এর মধ্যে ১৭টা সরকারি হাসপাতালে করোনা রোগীদের জন্য আলাদাভাবে রয়েছে ২৩৫টা বেড। আইসিইউতে স্থাপিত একেকটি বেডের জন্য অনেক টাকা বিনিয়োগ করতে হয়। সঙ্গত কারণে এই বেডে থেকে চিকিৎসা নিতে গেলেও অনেক টাকার প্রয়োজন। আইসিইউ বেডে একজন রোগীর চিকিৎসার খরচ স্বাভাবিক হাসপাতাল বেডের তুলনায় অন্তত পাঁচ থেকে সাত গুণ বেশি। ইচ্ছে থাকলেও ধনী এবং উচ্চবিত্ত ছাড়া সাধারণ মানুষের পক্ষে আইসিইউতে লম্বা সময় থেকে চিকিৎসা নেওয়া অসম্ভব। আবার এটাও সত্যি, অগাধ টাকা থাকার পরও করোনাকালীন অনেকে আইসিইউ বেড যোগাড় করতে পারেননি। ফলে একটি আইসিইউ বেডের জন্য রোগীদের মধ্যে হাহাকার লেগে ছিল।

করোনার প্রথম তিন-চার মাস সরকারি বা বেসরকারি কোনো হাসপাতালই তেমন করে রোগীদের করোনা টেস্ট করা, পজিটিভ হলে চিকিৎসা দেওয়া কোনোটাই গুছিয়ে করতে পারেনি। অনেক বেসরকারি হাসপাতালে করোনা টেস্ট করার কোনো ব্যবস্থাই ছিল না। সবাইকেই হাতে গোনা দু’তিনটি সরকারি হাসপাতাল এবং প্রতিষ্ঠানের উপর নির্ভর করতে হয়েছে। ঢাকার প্রায় সব বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি না করে, চিকিৎসা না দিয়ে করোনা রোগীদের পাশাপাশি অন্য রোগে আক্রান্ত মানুষদেরও ফিরিয়ে দিয়েছে। ফলে করোনা রোগীদের টেস্ট বা চিকিৎসা ব্যবস্থা নিয়ে সারাদেশে হাহাকার লেগে যায়। এ জন্য আমাদের স্বাস্থ্যখাতের সাথে জড়িত প্রতিষ্ঠানসমূহ এবং বেসরকারি হাসপাতালগুলোর অনভিজ্ঞতা, প্রস্তুতির অভাব এবং সমন্বয়হীনতা দায়ী ছিল। পরবর্তী সময়ে সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এবং স্বাস্থ্যখাতে কাজ করা সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সে সংকট থেকে আমাদের স্বাস্থ্যখাত অনেকটাই বেরিয়ে আসে।

করোনাকালীন প্রথম ধাপে ফ্রন্টলাইনে কাজ করা অনেক মানুষ অসময়ে মারা গেছেন। এদের মধ্যে স্বাস্থ্যখাতে কাজ করা ডাক্তার, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মী যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে পুলিশ, সাংবাদিক, ব্যাংকারসহ নানা পেশার লোকজন। অপর্যাপ্ত সুরক্ষা সামগ্রী, এসব সামগ্রীর গুণগতমান ঠিক না থাকা, দুর্নীতির মাধ্যমে মানহীন পণ্য আমদানী বা উৎপাদন করে তা সরবরাহ করার কারণই ছিল মূলত এ মানুষগুলোর মৃত্যুর জন্য দায়ী।

করোনাকালীন বেসরকারি হাসপাতালগুলোর পরিচালনা পর্ষদের দূরদর্শীতার অভাব, নিজেদের মধ্যে সমন্বয়হীনতা, হাসপাতালে কর্মরত স্বাস্থ্যকর্মীদের ব্যক্তিগত সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পারেনি। করোনার দোহাই দিয়ে প্রায় সব ধরনের রোগীদের স্বাস্থসেবা না দিয়ে ফিরিয়ে দিয়েছে। আয় কমের অজুহাত দেখিয়ে কর্মী ছাটাই করেছেন কেউ কেউ। বেসরকারি হাসপাতালের কর্মীদের বেতন অর্ধেক করে দিয়েছেন কেউ কেউ। আবার কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান বেতন একদমই দেননি। এভাবে হাসপাতালে কাজ করা মেডিক্যাল আর নন মেডিক্যাল কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উপর মানসিক আর অর্থনৈতিকভাবে অত্যাচার করা হয়। হঠাৎ কাজ হারিয়ে, বেতন না পেয়ে, অর্ধেক বেতন পেয়ে অনেকে এসময় পরিবার নিয়ে মানবেতর জীবন যাপন করেন।

বেসরকারি হাসপাতাল পরিচালনার জন্য তেমন কোনো নীতিমালা আছে বলে মনে হয় না। আর থাকলেও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বা স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে তার কোনো মনিটরিং নেই। ফলে সুযোগটা নিচ্ছেন বেসরকারি হাসপাতালের মালিকপক্ষ। কর্মকর্তা-কর্মচারীরা তাদের প্রাপ্য সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়েও চোখ-কান বুঁজে, বছরের পর বছর কাজ করে যাচ্ছেন। নিজেদের প্রাপ্য সম্মান আর সম্মানী নিয়ে কথা বললে, যে কোনো সময় চাকরি হারানোর ভয় থাকে। ইন্টারন্যাশনাল লেবার অরগানাইজেশনের নিয়ম হচ্ছে, একজন মানুষ দিনে সর্বোচ্চ ৮ ঘণ্টা কাজ করবেন। তাকে দিয়ে এর বেশি কাজ করালে সে কাজের জন্য ঘণ্টা হিসেবে আলাদা করে মজুরি দিতে হবে। অথচ বেসরকারি হাসপাতালগুলোর বেশির ভাগেরই কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় কমপক্ষে দশ ঘণ্টা কাজ করতে হয়। কারো কারো ক্ষেত্রে বারো ঘণ্টার  বেশি সময়ও কাজ করতে হয়। এসব দেখার আসলে কেউ নেই। যে দু’একটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে, তাদেরকেও হাসপাতাল কতৃপক্ষ ‘ম্যানেজ’ করে চলছেন বছরের পর বছর।

সরকারি হাসপাতালে ইচ্ছে থাকলেও আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে অনেকেই সেবা নিতে পারেন না।  তাছাড়া বড় বড় ডাক্তাররাও সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা না দিয়ে রোগীদের বেসরকারি হাসপাতালে (যেখানে তিনি চেম্বার করেন) যাবার জন্য প্রভাবিত করেন। তাই বাধ্য হয়ে, জীবন বাঁচানোর তাগিদে মানুষ বেসরকারি হাসপাতালে যায়। সেখানে আবার খাজনার চেয়েও বাজনা বেশি। ঢাকায় যে কয়টি বেরকারি হাসপাতাল রয়েছে তারা কোনোটাই স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়। কারো চিকিৎসা ভালো তো, সেবা ভালো না। আবার কেউ পাঁচ তারকা মানের সেবা দিলেও চিকিৎসার ক্ষেত্রে বড় দুর্বল। এর উপর রয়েছে, অপচিকিৎসা আর ভুল চিকিৎসা দিয়ে রোগীকে মেরে ফেলার অনেক উদাহরণ। চিকিৎসার পর বিলের ব্যাপার নিয়েও অভিযোগের অন্ত নেই। টেস্ট না করেও বিল ধরা, প্রয়োজন না থাকলেও টেস্ট করা, আইসিইউতে দীর্ঘদিন রোগীকে ধরে রাখাসহ নানা অভিযোগ রয়েছে বেসরকারি হাসপাতালগুলোর বিরুদ্ধে।

চিকিৎসাখাতে এত দুর্নীতি, গলাকাটা খরচ, অপচিকিৎসা আর অবহেলার অভিযোগের পরও এটা সত্যি যে, বাংলাদেশে চিকিৎসা ব্যবস্থার অনেক উন্নতি হয়েছে। আধুনিক অনেক মেশিনারিজের পাশাপাশি নতুন নতুন টেকনোলজিও যোগ হয়েছে আমাদের চিকিৎসাখাতে। সরকারি বা বেসরকারি সব হাসপাতাল আর রোগ নির্ণয়কেন্দ্রের প্রায় প্রতিটিতেই সেটা হয়েছে। মেশিনারিজ বা টেকনোলজির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চিকিৎসাসেবায় অনেক দক্ষ, অভিজ্ঞ আর পেশাদার লোকজনের সমন্বয় ঘটছে দিন দিন। কিন্তু এত কিছুর পরও এটা সত্যি, সেরকমভাবে রোগী বা রোগীর আত্মীয়-স্বজনের মধ্যে আস্থা অর্জন করতে সামর্থ হয়নি আমাদের হাসপাতালগুলো।

চিকিৎসাখাতে প্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণ হবার পরও আমাদের সরকারি আর বেসরকারি হাসপাতালগুলো রোগীদের আস্থা অর্জন করতে পারেনি গোটা পাঁচেক কারণ। রোগীকে ডাক্তারদের সময় কম দেয়া, ভর্তি রোগীর ক্ষেত্রে তার আত্মীয়দের সঠিকভাবে কাউন্সেলিং না করা, রোগীর সঙ্গে আন্তরিকতাপূর্ণ ব্যবহার না করা, ওয়ান স্টপ সার্ভিস না থাকার কারণে রোগীদের হয়রানি হওয়া এবং হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীর হিডেন খরচ।

বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে প্রচুর বিনিয়োগ করেও কেবল সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার অভাবে তার সুফল পাওয়া যাচ্ছে না। ব্যবসা হয়ত হচ্ছে কিন্তু সেটা সুনামের সাথে না। হাসপাতালে পা দেবার পর থেকে বেরিয়ে যাওয়া পর্যন্ত একজন মানুষ যদি হাসপাতালের কর্মকর্তা আর কর্মচারীর আচরণে সন্তুষ্ট হন, তাহলে চিকিৎসাসেবা যাই পান না কেন, খুশি মনে তিনি বাড়ি ফিরে যান। ফিরে গিয়ে সেই হাসপাতালের গুণগান প্রচার করেন অন্যদের কাছে। আবার সেই একই মানুষ হাসপাতালে এসে যদি কারো কাছে অসদাচরণ বা অসহযোগিতা পান সেটাও তিনি ফলাও করে প্রচার করেন।

এসব থেকে বেরিয়ে আসতে হবে হাসপাতালগুলোকে। পেশাদার আর অভিজ্ঞ লোকবল দিয়ে রোগীর চিকিৎসাসেবার পাশাপাশি হসপিটালিটি নিশ্চিত করতে হবে। রোগীর আত্মীয়-স্বজনদের সঙ্গে রোগীর শারীরিক অবস্থার সঠিক তথ্য দিয়ে কাউন্সেলিং করতে হবে। হাসপাতালে কর্মরত সব রোগী বা তার লোকজনের সঙ্গে হাসিমুখে আচরণ করা এবং সাহায্য করা বাধ্যতামূলক করা উচিত। হাসপাতালের ডাক্তার, নার্সসহ সব স্বাস্থ্যকর্মীর উচিত খুব ঠাণ্ডা মাথায়, ভালো আচরণ দিয়ে, সহমর্মিতা দিয়ে, সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়া। যাতে রোগী বা রোগীর লোক তার হাতে হাত রেখে আস্থা আর ভরসা পায়। ডাক্তারদের উচিত রোগীর রিপোর্টগুলো ভালোমত দেখা। যতটা সহজ করে সম্ভব, রোগী বা রোগীর লোককে তার শারীরিক অবস্থা বর্ণনা করা। রোগীর সাথে মানবিক আর আন্তরিক আচরণ করা। রোগীর অবস্থা যাই হোক, তাকে ভরসা দেওয়া। ভবিষ্যতে করণীয় বলে দেওয়া।

এ সামান্য ক’টি কাজ, হাসপাতালে কর্মরত সবাই মিলে করা খুব কঠিন নয়। এজন্য দরকার কেবল মানবিক গুণাবলী। ব্যবহার না করতে করতে আমাদের সেসব গুণাবলীর মধ্যে জং ধরেছে। যে কোনো একটি হাসপাতাল মডেল হিসেবে এ চার-পাঁচটি কাজ শুরু করুক তাহলে আমাদের দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ধরনটাই পাল্টে যাবে। রোগীরা সামান্য কারণেই আর দেশের বাইরে যাবেন না। প্রায় সব রকমের রোগের চিকিৎসা ব্যবস্থাই আছে আমাদের দেশে।  তাই চিকিৎসার পাশাপাশি সেবা দিয়ে যত দ্রুত রোগী বা তার আত্মীয় স্বজনদের আস্থাভাজন হওয়া যাবে, ততই বিদেশে যাওয়া রোগীদের সংখ্যা কমবে। পাশাপাশি আমরাও খুব ভালোভাবে চিকিৎসাসেবা নিয়ে বাসায় ফিরে যেতে পারবো।

লেখক: গদ্যকার

ঢাকা/তারা

সম্পর্কিত বিষয়:

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়