ঢাকা     মঙ্গলবার   ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ||  ফাল্গুন ১১ ১৪৩২ || ৬ রমজান ১৪৪৭ হিজরি

Risingbd Online Bangla News Portal

রমজান মাসে পবিত্র কোরআন চর্চার নানা দিক

মুফতি আতাউর রহমান || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৩:৩৬, ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬   আপডেট: ১৩:৫৩, ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
রমজান মাসে পবিত্র কোরআন চর্চার নানা দিক

মাহে রমজানের সঙ্গে পবিত্র কোরআনের সম্পর্ক অত্যন্ত নিবীড়। কোরআনের সঙ্গে এই সম্পর্ক রমজানকে অন্য মাসের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব এনে দিয়েছে। পবিত্র কোরআনের একাধিক আয়াত দ্বারা রমজান মাসের সঙ্গে কোরআনের সম্পর্ক প্রমাণিত হয়। মহান আল্লাহ রমজান মাস সম্পর্কে বলেন, ‘রমজান মাস, এতে মানুষের পথপ্রদর্শকরূপে কোরআন অবতীর্ণ হয়েছে।’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ১৮৫)

পবিত্র কোরআন চর্চার মাস রমজান

আরো পড়ুন:

মহানবী (সা.) রমজান মাসে কোরআন চর্চা বাড়িয়ে দিতেন।  তিনি এই মাসে অধিক পরিমাণে কোরআন তিলাওয়াত করতেন। ফাতেমা (রা.) থেকে বর্ণিত, ‘তার পিতা তাকে বলেছেন, প্রতি রমজানে জিবরাইল (আ.)-কে একবার কোরআন তিলাওয়াত করে শোনাতেন। কিন্তু মৃত্যুর বছর তিনি তাকে দুইবার কোরআন শোনান।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬২৮৫)

যারা কোরআন চর্চায় নিজেদের আত্মনিয়োগ করে তাদের ব্যাপারে মহানবী (সা.)-এর ঘোষণা হলো, ‘যারা কষ্ট সত্ত্বেও কোরআন সহিহ শুদ্ধভাবে পড়ার চষ্টো ও মেহনত চালিয়ে যায়, তাদের জন্য রয়েছে দ্বিগুণ সওয়াব।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস : ১৪৫৮)

রমজানে কোরআন চর্চার নানা দিক

সমাজের অনেকেই রমজানে কোরআন চর্চাকে শুধু তিলাওয়াতে সীমাবদ্ধ করে ফেলেন। কিন্তু কোরআন চর্চার পরিধি আরো বিস্তৃত। নিম্নে কোরআন চর্চার কয়েকটি উপায় তুলে ধরা হলো।
১. তিলাওয়াত বিশুদ্ধ করা : মুসলমানের জন্য কোরআনের তিলাওয়াত বিশুদ্ধ করা ফরজ। কেননা বিশুদ্ধ তিলাওয়াত ছাড়া নামাজ শুদ্ধ হয় না। প্রাজ্ঞ আলেমরা বলেন, প্রত্যেক নর-নারীর ওপর কোরআন এতটুকু সহিহ শুদ্ধ করে পড়া ফরজে আইন, যার দ্বারা অর্থ পরিবর্তন হয় না। অর্থ পরিবর্তন হয়, এমন ভুল পড়ার দ্বারা নামাজ নষ্ট হয়ে যায়। অতএব কমপক্ষে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের জন্য যে সুরাগুলোর প্রয়োজন, সেগুলো শুদ্ধ করে নেওয়া আবশ্যক, অন্যথায় সে গুনাহগার হবে। (মুকাদ্দামায়ে জাজারিয়া, পৃষ্ঠা ১১)

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যারা সহিহ শুদ্ধভাবে কোরআন তিলাওয়াত করে, তারা নেককার সম্মানিত ফেরেশতাদের সমতুল্য মর্যাদা পাবে।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস : ১৪৫৮)

অতএব একজন মুমিনের উচিত, রমজান মাসে নিজের তিলাওয়াত শুদ্ধ করে নেওয়া। রমজান মাসে মসজিদে মসজিদে বিশুদ্ধ তিলাওয়াত শেখার অনেক কোর্স হয়। চাইলে সেগুলোতেও অংশগ্রহণ করা যেতে পারে। 

২. তিলাওয়াত সুন্দর করা : যাদের তিলাওয়াত শুদ্ধ তারা রমজানে তিলাওয়াত সুন্দর করার চষ্টো করতে পারেন। এই ক্ষেত্রে অভিজ্ঞ কারীদের তিলাওয়াত শোনা এবং তাদের সহযোগিতা গ্রহণ করা যেতে পারে। মহানবী (সা.) তিলাওয়াত সুন্দর করতে উৎসাহিত করেছেন। তিনি বলেন, ‘তোমরা সুললিত কণ্ঠে কোরআন পড়, কেননা তা কোরআনের সৌন্দর্য আরো বাড়িয়ে দেয়।’ (শুআবুল ইমান, হাদিস : ২১৪১)

৩. তিলাওয়াতের পরিমাণ বৃদ্ধি করা : রমজান মাসে কোরআন চর্চার অন্যতম দিক হলো অধিক পরিমাণে তিলাওয়াত করা। রাসুলুল্লাহ (সা.) রমজান মাসে অধিক পরিমাণে কোরআন তিলাওয়াত করতেন। আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রমজানের প্রতি রাতে জিবরাইল (আ.) রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সঙ্গে দেখা করতেন। তারা পরস্পরকে কোরআন শোনাতেন। (সহিহ বুখারি)

৪. অর্থ ও ব্যাখ্যা পড়া : পবিত্র কোরআন মহান আল্লাহ মানুষের হেদায়েত, জ্ঞান ও ইসলামী শরিয়তের উৎস  বানিয়েছেন। আর কোরআনের অর্থ ও ব্যাখ্যা পাঠ করলেই তা লাভ করা সম্ভব। যদিও অর্থ না বুঝে কোরআন তিলাওয়াত করলেও সওয়াব পাওয়া যায়, কিন্তু কোনো সন্দেহ নেই কোরআন দ্বারা পুরোপুরি উপকৃত হতে হলে কোরআনের অর্থ ও ব্যাখ্যা জানা প্রয়োজন। সাহাবায়ে কেরাম (রা.) কোরআনের অর্থ ও ব্যাখ্যা শেখার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করতেন। আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বলেন, ‘যখন আমাদের ভেতর কেউ ১০টি আয়াত শিখত, তখন সে এগুলোর অর্থ জেনে আমল করার আগ পর্যন্ত সামনের দিকে অগ্রসর হতো না।’  (সিয়ারু আলামিন নুবালা : ৪/২৭১)

৫. তাফসির মজলিসে অংশগ্রহণ : রমজান উপলক্ষে বিভিন্ন মসজিদে তাফসিরুল কোরআনের আয়োজন করা হয়। যারা ব্যক্তিগত ব্যস্ততা এবং শিক্ষাগত সীমাবদ্ধতার কারণে নিজে তাফসির পাঠের সুযোগ পান না, তারা এসব মজলিসে অংশগ্রহণ করতে পারেন। পবিত্র রমজান উপলক্ষে বিভিন্ন রেডিও ও টেলিভিশনে নিয়মিত কোরআন শিক্ষার আসর এবং তাফসিরুল কোরআনের অনুষ্ঠান হয়। এগুলো দ্বারাও উপকৃত হওয়া যায়। মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘যখন কোনো সম্প্রদায়  আল্লাহর কোনো ঘরে সমবেত হয়ে আল্লাহর কিতাব তিলাওয়াত করে এবং পরস্পর তা নিয়ে আলোচনা করে, তখন তাদের ওপর শান্তি বর্ষিত হয়, তাদের আল্লাহর রহমত ঢেকে নেয়, ফেরেশতারা তাদের ঘিরে রাখে এবং আল্লাহ তার নিকটবর্তী ফেরেশতাদের কাছে তাদের প্রশংসা করেন।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস : ১৪৫৫)

৬. খতম তারাবিতে অংশগ্রহণ করা : যদিও তারাবির নামাজে কোরআন খতম করা অপরিহার্য নয়, কিন্তু সাধারণ মুসল্লিদের প্রতি খেয়াল করে বেশির ভাগ মসজিদে কোরআন খতম করা হয়। খতম তারাবিতে অংশ নিয়েও মুসলি্লরা কোরআন শ্রবণ করতে পারেন। কোরআন শ্রবণ করাও সওয়াবের কাজ আর নামাজে তা শ্রবণ করা আরো বেশি সওয়াবের কাজ। আল্লাহ বলেন, ‘আর যখন কোরআন পাঠ করা হয় তখন তোমরা মনোযোগসহ তা শোনো এবং নিশ্চুপ হয়ে থাকো, যাতে তোমাদের প্রতি রহমত করা হয়।’ (সুরা আরাফ, আয়াত : ২০৪)

৭. বিশেষ বিশেষ সুরা মুখস্থ করা : পবিত্র কোরআনের এমন কিছু বিশেষ সুরা রয়েছে যেগুলোকে অন্য সুরার তুলনায় মর্যাদাবান মনে করা হয়। যেগুলো নিয়মিত পাঠ করার ব্যাপারে হাদিসে উৎসাহিত করা হয়েছে। যেমন সুরা ইয়াসিন, সুরা আর রহমান, সুরা ওয়াকিয়া, সুরা মুলক ইত্যাদি। রমজানে এসব সুরাগুলো মুখস্থ করা যেতে পারে। এ ছাড়াও আয়াতুল কুরসি, সুরা বাকারার শেষ আয়াতগুলো, সুরা হাশরের শেষ আয়াতগুলোও মুখস্থ করা যেতে পারে। এতে সারা বছর এসব সুরা ও আয়াত দ্বারা উপকৃত হওয়ার সুযোগ পাওয়া যাবে। 

৮. ঘরে কোরআনের তালিম করা : রমজান মাসে পরিবারের সবাই যেন কোরআন চর্চায় যুক্ত হয় সেজন্য পারিবারিক উদ্যোগও নেওয়া যেতে পারে। প্রতিদিন একটি সময় নির্ধারণ করে তখন জরুরি সুরাগুলো বিশুদ্ধ করে নেওয়া, কোরআনের নির্বাচিত সুরা ও আয়াত মুখস্থ করা এবং কোরআনের নির্বাচিত অংশের তাফসির পাঠ করে অন্যকে শোনানো যেতে পারে। এটা পরিবারের অভিভাবকদের দায়িত্বও বটে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘তোমাদের মধ্যে সেই উত্তম যে নিজে কোরআন শিক্ষা করে এবং অন্যকে শিক্ষা দেয়।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৫০২৭)

আল্লাহ সবাইকে রমজান মাসে অধিক পরিমাণে তিলাওয়াত করার তাওফিক দিন। আমিন।  

ঢাকা/শাহেদ

সম্পর্কিত বিষয়:

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়