ঢাকা     শনিবার   ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ||  ফাল্গুন ১৫ ১৪৩২ || ১০ রমজান ১৪৪৭ হিজরি

Risingbd Online Bangla News Portal

রোজায় যে সেবামূলক কাজগুলো করা উচিত 

মুফতি আতাউর রহমান || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৪:৫১, ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬   আপডেট: ১৪:৫৭, ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
রোজায় যে সেবামূলক কাজগুলো করা উচিত 

রোজা কেবল উপোস থাকার নাম নয়, বরং তাকওয়া, সংযম ও আত্মশুদ্ধি অর্জনের মাস। রোজা এমন ইবাদত যার মাধ্যমে মানুষের ভেতর সামাজিক দায়িত্ববোধ জাগ্রত হয়। 

রোজা রাখার মাধ্যমে মানুষ দীর্ঘ এক মাস ক্ষুধা ও তৃষ্ণা সহ্য করে। এতে করে সমাজের অভাবী, দরিদ্র ও অসহায় মানুষের দৈনন্দিন কষ্ট অনুভব করা যায়। ড. ইউসুফ আল-কারজাভি (রহ.) লিখেছেন: ‘রমজানের সামাজিক কল্যাণের অন্যতম দিক হলো ক্ষুধার্ত মানুষের ক্ষুধা ও অসহায় মানুষের অসহায়ত্বের বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করা। রোজাদার তা অর্জন করে যকৃত ও নাড়ির আঁকুতি থেকে এই অভিজ্ঞতা লাভ করে। কেননা যারা প্রাচুর্যের মধ্যে বেড়ে উঠেছে তারা ক্ষুধার জ্বালা, তৃষ্ঞার কষ্ট অনুভব করতে পারে না। তারা মনে করে, সবাই তাদের মতো। কোনো সন্দেহ নেই আল্লাহ সাম্য ও সুবিচার প্রতিষ্ঠার জন্য রোজার বিধান দিয়েছেন। তিনি ক্ষুধাকে ধনী ও গরিব সবার জন্য সমান করেছেন।’ (আল ইবাদাতু ফিল ইসলাম, পৃষ্ঠা ২৭৭)

আরো পড়ুন:

রমজান মাসে রোজা রাখার মাধ্যমে মুমিন যখন অন্যের ক্ষুধা ও দারিদ্র্যের কষ্ট অনুভব করে, তখন তাঁর সামনে আসে মহানবীর (সা.) সাম্য ও ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠার বাণীগুলো। যেমন তিনি বলেছেন, ‘পারস্পরিক দয়া, ভালোবাসা ও সহানুভূতি প্রদর্শনে তুমি মুমিনদের একটি দেহের মতো দেখবে। যখন শরীরের একটি অঙ্গ রোগে আক্রান্ত হয়, তখন শরীরের সকল অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ রাত জাগে এবং জ্বরে অংশ নেয়।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬০১১) অর্থাৎ মুমিন মানুষের সেবা করার তাগিদ অনুভব করতে থাকে। 

রমজান মাসে জনকল্যাণমূলক কাজের অনুপ্রেরণাকে ইসলাম শুধু মুসলমানের অনুভূতির ওপর ছেড়ে দেয়নি, বরং তাদেরকে সরাসরি নির্দেশনা দিয়েছে। পাশাপাশি মহানবী (সা.) নিজের কাজের মাধ্যমে উম্মতকে এ বিষয়ে অনুপ্রাণিত করেছেন। আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (সা.) বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) মানুষের মধ্যে সবচেয়ে দানশীল। রমজানে যখন জিবরাইল তার সঙ্গে দেখা করত তখন তার দানশীলতা আরো বেড়ে যেত।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬)

এছাড়াও একাধিক বিশুদ্ধ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত যে, রমজান মাসে প্রতিটি আমলের প্রতিদান বৃদ্ধি করা হয়। তাই মুমিন এই মাসে অধিক পরিমাণ সেবামূলক কাজ করে নিজের নেকের পাল্লা ভারি করতে চায়।

রমজানে সেবামূলক কার্যক্রম

কোরআন ও হাদিসের অনুপ্রেরণা এবং মুসলিম সমাজের ঐতিহ্য অনুসারে রমজান মাসে করা যায় এমন কয়েকটি সেবামূলক কার্যক্রম তুলে ধরা হলো।

১. ইফতার করানো: রোজাদার ব্যক্তিকে ইফতার করানো অত্যন্ত সওয়াবের কাজ। বাংলাদেশসহ সারা পৃথিবীতে মসজিদ ও সমাজভিত্তিক উন্মুক্ত ইফতারের আয়োজন দেখা যায়। পথচারী ও নিম্ন আয়ের মানুষের ইফতারের আয়োজন করা রমজানের অন্যতম সমাজসেবামূলক কার্যক্রম। ইফতার শুধু বড় আয়োজনে সীমাবদ্ধ নয়। নবী কারিম (সা.) একটি খেজুর দিয়ে হলেও অন্যকে ইফতার করাতে উৎসাহিত করেছেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো রোজাদারকে ইফতার করাবে, সে রোজাদারের সমপরিমাণ সওয়াব পাবে, অথচ রোজাদারের সওয়াব থেকে কিছুই কমবে না।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস : ৮০৭)

২. জাকাত ও দান : রাসুলুল্লাহ (সা.) রমজান মাসে অধিক পরিমাণে দান করতেন। আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, সাহাবায়ে কেরাম রমজানের প্রস্তুতি হিসেবে রমজান শুরু হওয়ার আগেই জাকাত প্রদান করতেন, যেন দরিদ্র মানুষদের রমজানে খাবার নিয়ে দুশ্চিন্তা করতে না হয়। (লাতায়িফুল মাআরিফ, পৃষ্ঠা ২৫৮)

এছাড়াও সদকাতুল ফিতর আগাম আদায় করা যেতে পারে। এতে কিছু মানুষের উপকার হবে।

৩. পথচারী ও শ্রমজীবীর জন্য সেহরি : পথচারী ও শ্রমজীবী মানুষ যারা ঘরের বাইরে থাকে। তাদের জন্য সেহরির ব্যবস্থা করাও একটি সমাজসেবামূলক কাজ হতে পারে। বিশেষ করে রেল স্টেশন, বাস স্টেশন ও নৌ বন্দরগুলোতে। বাংলাদেশে এটার প্রচলন না থাকলেও আরব বিশ্বে এবং ইউরোপের মুসলিম কমিউনিটি এটা করে থাকে। 

৪. পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধন দৃঢ় করা : আরববিশ্বের একটি জনপ্রিয় রমজান সংস্কৃতি হলো এই মাসে আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীর খোঁজখবর নেওয়া। রমজানের প্রয়োজনীয় সামগ্রী উপহার দেওয়া। এর মাধ্যমে ব্যক্তি দান ও আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করার সওয়াব পায়। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘আল্লাহর ভালোবাসায় আত্মীয়-স্বজন, পিতৃহীন, অভাবগ্রস্ত, পথিক, সাহায্যপ্রাথীদেরকে এবং দাসমুক্তির জন্য অর্থ দান করলে (পুণ্য রয়েছে)।’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ১৭৭)

৫. চিকিৎসায় সাহায্য করা : অসুস্থ ব্যক্তির সেবা ও সহযোগিতা করা অত্যন্ত সওয়াবের কাজ। মহানবী (সা.) তাঁর অসুস্থ প্রতিবেশীর খোঁজখবর নিতে তার বাড়ি যান। রমজান মাসে দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত ব্যক্তিদের সাহায্য করার মাধ্যমেও সমাজসেবা করা যেতে পারে।

৬. অপারগের ঋণ শোধ করা : উসমানীয় সাম্রাজ্যের একটি সুন্দর রীতি এটা ছিল যে, সক্ষম ব্যক্তিরা খুঁজে খুঁজে অপারগ ঋণের দায়গ্রস্ত ব্যক্তিদের ঋণ পরিশোধ করত। এখনো তুর্কি সমাজের সক্ষম ব্যক্তিরা দোকানে গিয়ে অন্যের বাকির দায় পরিশোধ করে থাকে। 

সর্বোপরি, সিয়াম সাধনা মানুষকে আত্মকেন্দ্রিকতা থেকে বের করে এনে সমাজমুখী করে তোলে। ক্ষুধা, তৃষ্ঞা ও সংযমের মাধ্যমে মানুষের হৃদয়ে দয়া, সহানুভূতি ও দায়িত্ববোধ জাগ্রত হয়। এজন্য হাদিসে এই মাসকে ভ্রাতৃত্বের মাস বলা হয়েছে। হাদিসে বলা হয়েছে, ‘রমজান হলো ধৈর্যের মাস আর ধৈর্যের প্রতিদান জান্নাত। এটা হলো ভ্রাতৃত্বের মাস, এই মাসে মুমিনের রিজিক বৃদ্ধি করা হয়।’ (শুআবুল ঈমান, হাদিস : ৩৩৩৬)

আল্লাহ সবাইকে সমাজসেবার অনুপ্রেরণা দান করুন। আমিন। 

ঢাকা/শাহেদ

সম্পর্কিত বিষয়:

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়