ঢাকা     শুক্রবার   ০২ ডিসেম্বর ২০২২ ||  অগ্রহায়ণ ১৮ ১৪২৯ ||  ০৭ জমাদিউল আউয়াল ১৪১৪

গুলশানে চালু হচ্ছে ‘স্মার্ট পার্কিং’

মেসবাহ য়াযাদ || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৮:৩০, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২২   আপডেট: ১৮:৫০, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২২
গুলশানে চালু হচ্ছে ‘স্মার্ট পার্কিং’

ফাইল ফটো

ঢাকা শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকার সড়কে ইচ্ছেমতো ব্যক্তিগত গাড়ি রাখা হয়। এতে সড়কে চলাচলের জায়গা কমে সৃষ্টি হচ্ছে যানজটের। এসব গাড়ির বিরুদ্ধে প্রতিদিনই মামলা করেছে ট্রাফিক পুলিশ। কখনো পুলিশকে নানাভাবে ম্যানেজ করছেন গাড়ির মালিক বা চালক। রাস্তায় অবৈধভাবে গাড়ি রাখার এ অনিয়ম কিছুতেই বন্ধ হচ্ছে না।

এ সংকট নিরসনে পাইলট প্রজেক্ট হিসেবে রাজধানীর গুলশান নির্দিষ্ট কিছু সড়কে ‘স্মার্ট পার্কিং’-এর প্রকল্প হাতে নিয়েছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি)। স্মার্ট পার্কিং সিস্টেম চালু হলে স্মার্টফোনের অ্যাপের মাধ্যমে নির্দিষ্ট পার্কিং এলাকার সন্ধান পাবেন গাড়িচালকরা। সেসব নির্ধারিত এলাকায় গাড়ি রাখার জন্য তাদেরকে দিতে হবে নির্দিষ্ট পরিমাণ ফি। নির্ধারিত  সড়কের পার্কিং এলাকার বাইরে অন্য কোথাও গাড়ি পার্ক করা হলে দিতে হবে মোটা অঙ্কের জরিমানা। ট্রাফিক বিভাগ, নগরবিদ এবং সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ডিএনসিসি এ উদ্যোগ সফলভাবে বাস্তবায়ন করতে পারলে যেখানে-সেখানে গাড়ি পার্কিং বন্ধ হবে। এতে যানজট কিছুটা কমবে।

এ বিষয়ে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র মো. আতিকুল ইসলাম বলেছেন, ‘শহরের যেখানে পার্কিং ব্যবস্থা করা হচ্ছে, সেখানেই শুরু হয়ে যাচ্ছে মাস্তানি। বর্তমানে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকার সড়কে কোনো পার্কিং ইজারাদার নেই। তাই, সড়কে গাড়ি পার্কিং সিস্টেমে আনতে স্মার্ট পার্কিং ব্যবস্থা চালু হচ্ছে। সবগুলো পার্কিং একটা অ্যাপের মাধ্যমে পরিচালিত হবে। কোন পার্কিংয়ে কয়টি গাড়ি আছে বা ফাঁকা আছে, তা দেখতে পারবেন গাড়িচালক এবং মালিকরা। ফলে, পার্কিং খুঁজতে কাউকে বেশি সমস্যায় পড়তে হবে না। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এমন পদ্ধতিতেই গাড়ি পার্কিং ব্যবস্থাপনা পরিচালিত হয়।’

তিনি বলেন, ‘প্রথমে গুলশান-বনানীর নির্দিষ্ট কিছু সড়কে স্মার্ট কার পার্কিং চালু করব। নতুন চালু করা এ পাইলট প্রজেক্ট সফল হলে, পর্যায়ক্রমে রাজধানীর উত্তর সিটি করপোরেশনের অন্যান্য স্থানেও এ পার্কিং ব্যবস্থা চালু করা হবে। স্মার্ট কার পার্কিংয়ের এ ধারণা এসেছে ইজারা থেকেই। সনাতন পদ্ধতিতে নয়, এখন থেকে ডিজিটাল পদ্ধতিতে ইজারা দেওয়া হবে। বিদেশে যেমন ঘণ্টা হিসেবে পার্কিং করলে নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা দিতে হয়, এখানেও একই নিয়মে দিতে হবে।’

এ বিষয়ে স্থপতি ইকবাল হাবিব বলেন, ‘ঢাকা শহরে অধিকাংশ হাইরাইজ ভবনে গাড়ি পার্কিংয়ের জন্য পর্যাপ্ত জায়গা নেই। অনেক ভবনে পার্কিংয়ের জায়গাও দোকান বা অফিসের জন্য ভাড়া দেওয়া হয়। এ কারণে এসব ভবনের সামনে গাড়ি পার্ক করেন চালক বা মালিকরা। এতে সড়কের যায়গা কমে যায়, যান চলাচলে সমস্যা হয়, যানজট হয়। সম্প্রতি জেনেছি, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন অনপেমেন্ট নির্দিষ্ট পার্কিং জোন করার পরিকল্পনা করেছে। এটা চালু হলে কেউ আর গাড়ি যত্রতত্র পার্কিং করবেন না বা এর প্রবণতা কমে আসবে।’

তিনি বলেন, ‘অনেক গাড়ির মালিক বা চালক তাদের অফিস বা বাসার সামনের সড়ক নিজের বলে মনে করেন। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অফিস বা বাসার সামনে গাড়ি পার্ক করে রাখেন। এ ব্যাপারে কারো কাছে যেন কোনো জবাবদিহিতা নেই। ট্রাফিক পুলিশকে জরিমানা দিয়ে বা ম্যানেজ করে অবৈধভাবে গাড়ি পার্কিং করা হচ্ছে বছরের পর বছর। রাজউক যেসব ভবন অনুমোদন দিচ্ছে, সেখানে যাতে পর্যাপ্ত পার্কিং সুবিধা থাকে, সেটা নিশ্চিত করতে হবে।’

ডিএনসিসির ট্রাফিক ইঞ্জিনিয়ারিং সার্কেল সূত্রে জানা গেছে, প্রাথমিকভাবে গুলশান ৪, ৬২, ৬৩, ১০৩ ও ১০৯- এই পাঁচটি রোডে স্মার্ট পার্কিং ব্যবস্থা চালুর বিষয়টি প্রায় শেষ পর্যায়ে। তিন মাস মেয়াদি এই প্রকল্প পর্যালোচনা করে পরবর্তী সময়ে উত্তর সিটি এলাকার অন্যান্য সড়কে একই উদ্যোগ নেওয়া হবে। সড়কে গাড়ি পার্কিংয়ের এই সুযোগ পেতে গাড়ির মালিককে নির্দিষ্ট ফি দিতে হবে।

সূত্র জানায়, এখনও ঘণ্টা প্রতি গাড়ি পার্কিং ফি'র পরিমাণ চূড়ান্ত হয়নি। তবে, খসড়া হিসাব অনুযায়ী, ব্যক্তিগত গাড়ি পার্কিংয়ের জন্য এক ঘণ্টায় ৫০ টাকা, দুই ঘণ্টায় ৭৫ টাকা এবং তিন ঘণ্টায় ১০০ টাকা ফি দিতে হবে। তিন ঘণ্টার বেশি যদি কেউ পার্কিং ব্যবহার করতে চান, তাহলে পরবর্তী প্রতি ঘণ্টার জন্য ১০০ টাকা করে ফি নেওয়ার ব্যাপারে প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রস্তাবটি অনুমোদনের অপেক্ষায় আছে।

ডিএনসিসির জনসংযোগ কর্মকর্তা মকবুল হোসাইন শিমুল জানিয়েছেন, ডিএনসিসির গুলশান এলাকার পাঁচটি সড়কে গাড়ি পার্কিংয়ের সাইনবোর্ড লাগানো হয়েছে। সড়কে প্রতিটি গাড়ির জন্য হলুদ রং দিয়ে আলাদা আলাদা মার্কিং করা আছে। রোডগুলো হচ্ছে ৪, ৬২, ৬৩, ১০৩ ও ১০৯ নম্বর।

গুলশান ১০৩ নম্বর রোডের বাসিন্দা চৌধুরী সাফাযেত আহমেদ নতুন এই পার্কিং বিষয়ে বলেন, ‘সড়কে গাড়ি পার্কিংয়ে নির্দিষ্ট জোন এবং সহনীয় ফি নির্ধারণ করা হলে গাড়ি পার্কিংয়ের অব্যবস্থাপনা কমবে। কেউ চাইলেও দীর্ঘ সময় রাস্তায় গাড়ি রাখতে পারবেন না। পুলিশের মামলা, ঝামেলাও কমবে। এমন একটি উদ্যোগ নেওয়ার জন্য মেয়রকে সাধুবাদ জানাই।’

স্মার্ট পার্কিং চালুর ওই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে ডিএনসিসির রাজস্ব বিভাগের কর্মকর্তা নাজমুল (ছদ্মনাম) বলেন, ‘উত্তর সিটি করপোরেশনের কয়েকটি এলাকায় বাস টার্মিনাল এবং গাড়ি পার্কিং ইজারা দিয়ে রাজস্ব আদায় করা হয়। কিন্তু গুলশান, বনানীর মতো এলাকায় সড়কে পার্কিং করা শয়ে শয়ে গাড়ি থেকে কোনো রাজস্ব পায় না ডিএনসিসি। রাস্তায় অবৈধভাবে রাখা গাড়ির বিরুদ্ধে ট্রাফিক পুলিশ মামলা করে, তারা এর মাধ্যমে রাজস্ব আয় করে। কিন্তু, আমাদের এলাকায় আয় হওয়া ওই রাজস্বের কোনো ভাগ পায় না ডিএনসিসি। এবার এই এলাকায় গাড়ি পার্কিং ব্যবস্থা চালু হলে তা থেকে যে ফি যা আদায় হবে, তা ডিএনসিসির তহবিলে জমা হবে।’

এ বিষয়ে ডিএনসিসির ট্রাফিক ইঞ্জিনিয়ারিং সার্কেলের নির্বাহী প্রকৌশলী নাঈম রায়হান খান বলেন, ‘আপাতত পাইলট প্রকল্পে গুলশানের এই পাঁচটি সড়কে ১০৮টি গাড়ি পার্কিংয়ের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। অ্যাপের মাধ্যমে স্মার্ট পার্কিং পরিচালনার জন্য একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে এই দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। শিগগির এই প্রকপ্ল চালু করা হবে। আশা করছি, এতে বেশ সুফল আসবে। এরপর ডিএনসিসি ঢাকার আরও অনেক এলাকায় এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে।’

মেয়া/রফিক

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়