ঢাকা     শুক্রবার   ৩১ মে ২০২৪ ||  জ্যৈষ্ঠ ১৭ ১৪৩১

মশা নিধনে ডিএনসিসি-জাবি’র ল্যাব কার্যক্রম শুরু হবে কবে?

মেসবাহ য়াযাদ || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ২২:১৯, ১৫ এপ্রিল ২০২৪  
মশা নিধনে ডিএনসিসি-জাবি’র ল্যাব কার্যক্রম শুরু হবে কবে?

২০২৩ সালের জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা স্টেটের মায়ামি ডেইড কাউন্টি ঘুরে এসে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) মেয়র আতিকুল ইসলাম বলেছিলেন, এতদিন ভুল পদ্ধতিতে মশা নিধনের কাজ করেছি। সঠিকভাবে কাজ করতে সচেতনতা বৃদ্ধি, ল্যাব প্রতিষ্ঠা, নতুন ধরনের কীটনাশকের ব্যবহারসহ ব্যবস্থাপনাগত নানা পরিবর্তন করা হবে।

এর পর মশা নিধনে সহায়ক হিসেবে ল্যাব প্রতিষ্ঠার কথা জানিয়েছিল ডিএনসিসি। সে অনুযায়ী গত বছরের ২৪ জুলাই মশাবাহিত রোগ নিয়ন্ত্রণে গবেষণা কার্যক্রমে সহায়তার উদ্দেশ্যে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) সঙ্গে সমঝোতা স্মারক সই করে ডিএনসিসি। এই সমঝোতা স্মারক চুক্তি দুই বছর অর্থাৎ ২০২৬ সালের জুন মাস পর্যন্ত ল্যাব ব্যবহার করার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে। 

চুক্তি অনুযায়ী ডিএনসিসির পক্ষ থেকে জাবির ল্যাবে আধুনিক মাইক্রোস্কোপ, কম্পিউটার, এসি ও ল্যাব সংস্কার করে দেওয়ার কথা ছিল। পাশাপাশি ডিএনসিসি থেকে দুই জন কর্মচারী ল্যাবের কাজে সহযোগী হিসেবেও কাজ করার কথা। তবে, চুক্তির পর প্রায় সাত মাস হয়ে গেলেও ল্যাবের চাহিদা মেটানোর কাজ সম্পন্ন করতে পারেনি ডিএনসিসি।

এ গবেষণার কাজে মূল দায়িত্ব পালন করবেন জাবির প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক, কীটতত্ত্ববিদ ড. কবিরুল বাশার ও তার টিম। এই ল্যাবের কাজ হবে—বিভিন্ন এলাকায় মশার প্রজননস্থল খুঁজে বের করে সেখান থেকে পূর্ণাঙ্গ মশা ও মশার ডিম সংগ্রহ করা এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে মশার প্রজাতি আলাদা করা। পরবর্তীতে সেই মশার ধরন বুঝে পরিমিত ওষুধ স্প্রে করে স্ব স্ব প্রজাতির মশা ধ্বংস করা।

মেয়রের এই তথ্য জানানোর পর বছর গড়িয়ে গেলেও তা বাস্তবায়ন করতে পারেনি ডিএনসিসি। বরং, গত এক বছর ধরে সেই পুরনো পদ্ধতিতেই মশা নিধনের চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে। এক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ হচ্ছে—মশা নিধনে কীটতত্ত্ববিদের সম্পৃক্ততা, ল্যাব প্রতিষ্ঠা ও ডেঙ্গু মৌসুম শুরুর আগেই মাঠ পর্যায়ে কাজ শুরু করতে হবে। বাস্তবে, এসব কাজে এখনও পিছিয়ে রয়েছে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন।

তবে, প্রচার-প্রচারণা ও নাগরিকদের সচেতন করতে অনেক কর্মসূচি পালন করছে ডিএনসিসি। শিশুদের ডেঙ্গুর বিষয়ে সচেতন করতে ‘মশার কামড় ক্ষতিকর’ নামে একটি বই ছাপানো হয়। ডিএনসিসির তথ্য মতে, প্রাথমিকভাবে ১ লাখ বই ছাপানো হয়েছে। এসব বই বিভিন্ন স্কুলেও বিতরণ করা হয়েছে। এছাড়া, মাঠ পর্যায়ে জনসাধারণের মাঝে সচেতনতা বাড়াতে লিফলেটও বিরতণ করা হয়। এতে যুক্ত করা হয় বিএনসিসি ও স্কাউট সদস্যদের।

কীটতত্ত্ববিদ ড. কবিরুল বাশার বলেছেন, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন থেকে আমাদের ল্যাবে কিছু প্রয়োজনীয় জিনিস দেওয়ার কথা ছিল। চুক্তি সই করার পর এখনও সেগুলো পাইনি। ডিএনসিসি থেকে জনবল দিলে তাদেরকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রশিক্ষণ শেষে তারা মাঠে ও ল্যাবে কাজ করবেন। তাদের কাজের জন্য ল্যাবে কিছু বেসিক জিনিস লাগবে। 

যথাসময়ে ল্যাব প্রস্তুত থাকলে ডেঙ্গু মৌসুমের আগে থেকেই কিছু প্রস্তুতি নেওয়া যেত, জানিয়ে ড. কবিরুল বাশার বলেন, প্রতি মাসে যে মৌসুমি মশার উৎপাদন বাড়ছে, তা কীভাবে বাড়ছে, কেন বাড়ছে—এসব তথ্য পাওয়া যেত এবং তথ্যগুলো মশা নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হতো।

ডেঙ্গুর পিক টাইমে গত বছরের জুলাই মাস জুড়ে রাজধানীতে ডিএনসিসির আওয়াতাধীন এলাকায় ডেঙ্গু মশা নিধনে অভিযান চালানো হয়। সেসব অভিযানে কোথাও ডেঙ্গু মশার লার্ভা পাওয়া গেলে ওই ভবন মালিককে জরিমানা করা হয়। কেবল জুলাই মাসব্যাপী এই অভিযানে ২ কোটি টাকা আদায়ও হয়। এতকিছুর পরও ২০২৩ সালে সর্বাধিক ৩ লাখ ২০ হাজার ১৫৮ জন ডেঙ্গু-আক্রান্ত হয়েছেন। তাদের মধ্যে ঢাকায় ১ লাখ ৯ হাজার ৭৪৩ ও ঢাকার বাইরে ২ লাখ ১০ হাজার ৪১৫ জন। তেমনই ইতিহাসে সর্বোচ্চ বেশি মানুষ ডেঙ্গুতে মারা যান গত বছর, ১ হাজার ৬৯২ জন।

গত বছর মশা নিধনে ডিএনসিসির বড় উদ্যোগ ছিল নতুন ধরনের কীটনাশক ওষুধ ‘বিটিআই’ আমদানি। যদিও সেই বিটিআই আমদানি প্রক্রিয়া বড় ধরনের সমালোচনার মুখে পড়ে ডিএনসিসি। প্রস্তুতকারক কোম্পানির নাম জালিয়াতি করে পাঁচ টন ওষুধ এনে তা ডিএনসিসিকে সরবরাহ করে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান মার্শাল অ্যাগ্রোভেট। যার মূল্য ১ কোটি ৬৯ লাখ ২৫ হাজার টাকা। তবে ডিএনসিসি মেয়র আতিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের জালিয়াতি প্রকাশ পাওয়ার পর তাদেরকে কোনো টাকা দেওয়া হয়নি। অভিযুক্ত ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানকে কালো তালিকাভুক্তও করা হয়েছে। এরপর সেই ওষুধ (বিটিআই) ব্যবহার বন্ধ করে দেয় ডিএনসিসি।

গত ৫ ফেব্রুয়ারি নগরভবনে ‘ডেঙ্গু মোকাবিলায় বছরব্যাপী আমাদের প্রস্তুতি এবং করণীয়’ শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকে ডিএনসিসির মেয়র বলেন, এই প্রথম স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কাছ থেকে কীটতত্ত্ববিদ পেয়েছি। আমরা ১০ জনের জন্য আবেদন করেছিলাম। পাঁচজন পেয়েছি। এসব কীটতত্ত্ববিদ ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে মশার প্রজাতি নির্ণয়, স্থানভিত্তিক মশার ঘনত্ব, অধিক মশা উৎপাদনের কারণ এবং মশক নিধনকর্মীদের প্রশিক্ষণ দেবেন।

তবে, খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পাঁচজন কীটতত্ত্ববিদের মধ্যে তিনজন ইতোমধ্যে ডিএনসিসিতে যুক্ত হলেও এখনও দুজন কাজে যুক্ত হননি। এই দুজনের একজন ডিএনসিসিতে না আসার জন্য মামলা করেছেন বলেও জানায় ডিএনসিসির একটি সূত্র। আর যুক্ত হওয়া তিনজনের একজন মাঠ পর্যায়ে কাজ শুরু করলেও বাকি দুজন কোনো কাজের সঙ্গে যুক্ত নেই।

ডিএনসিসিতে যুক্ত কীটতত্ত্ববিদরা কী ধরনের কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারেন, জানতে চাইলে গবেষক ড. কবিরুল বাশার বলেন, আমাদের ল্যাব থেকে যে ডাটা আসবে, আমরা সেটা তাদেরকে দেবো। তারা সেই ডাটা মশা নিয়ন্ত্রণে ব্যবহার করবেন। তারা যদি ল্যাবে কাজ করেন, তাহলে সমন্বয় করে কাজ করব। তারা ল্যাবে না এলেও সমস্যা নাই। একই ডাটার ওপর কাজ করব আমরা সবাই।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মীর খায়রুল আলম বলেন, ল্যাব বিষয়ে যখন চুক্তি হয়, তখন আমি ডিএনসিসিতে ছিলাম না। তবে, ল্যাবের সঙ্গে কাজ করার বিষয়ে ডিএনসিসি বিভিন্ন কার্যক্রম করছে।

ডিএনসিসির প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইমরুল কায়েস চৌধুরী বলেন, এ বিষয়ে কাজ চলছে। আশা করছি, অচিরেই জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যাবের সঙ্গে ডেঙ্গু বিষয়ে ডিএনসিসি পরিপূর্ণভাবে কাজ শুরু করতে পারবে।

অপরদিকে, ডিএনসিসির জনসংযোগ কর্মকর্তা মকবুল হোসাইন বলেন, ল্যাবের বিষয়টি আমাদের মাথায় আছে। আমাদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মীর খায়রুল আলম নতুন এসেছেন। তিনি ইতোমধ্যে বিষয়টি নিয়ে আলোচনায় বসেছেন। শিগগিরই পূর্ণভাবে ল্যাবের কাজ শুরু হবে।

মেয়া/রফিক

আরো পড়ুন  



সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়