ঢাকা     শনিবার   ০৭ মার্চ ২০২৬ ||  ফাল্গুন ২২ ১৪৩২ || ১৮ রমজান ১৪৪৭ হিজরি

Risingbd Online Bangla News Portal

সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ অপরাধ নিয়ন্ত্রণ

মাকসুদুর রহমান || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ২০:৫১, ৭ মার্চ ২০২৬   আপডেট: ২০:৫৩, ৭ মার্চ ২০২৬
সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ অপরাধ নিয়ন্ত্রণ

ছবি: এআই দিয়ে তৈরি।

নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নিয়েছে। ৫ আগস্ট পরবর্তী দেশের ভেঙে পড়া আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে কাজ করছে নতুন সরকার। এটি সরকারের জন্য এখন একটি বড় চ্যালেঞ্জ বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তারা বলছেন, হত্যা-ধর্ষণের মতো ঘটনা জনমনে উদ্বেগের কারণ যেন না হয় সে চেষ্টা অব্যাহত আছে।

গত ৪ মার্চ কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) সমাজকল্যাণ বিভাগের চেয়ারম্যান ও সহকারী অধ্যাপক আসমা সাদিয়া রুনাকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় বৃহস্পতিবার (৫ মার্চ) নিহতের স্বামী ইমতিয়াজ সুলতান বাদি হয়ে মূল অভিযুক্ত অফিস সহকারী ফজলুর রহমানসহ ৪ জনের বিরুদ্ধে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থানায় মামলা করেন।

আরো পড়ুন:

কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার মোহাম্মদ জসীম উদ্দিন বলেন, “প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, ওই কর্মচারী শিক্ষিকাকে হত্যার পর আত্মহত্যা করতে গেছেন। কর্মচারীকে বদলি এবং মাসিক বেতন নিয়ে নিহত শিক্ষিকার সঙ্গে তার বিরোধ চলছিল। তারই অংশ হিসেবে ওই শিক্ষিকাকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়। তারপরও এ ঘটনার সঙ্গে অন্য কোনো কারণ আছে কিনা তা তদন্তে বের করার চেষ্টা চলছে।”

একইদিন খুলনার রূপসা উপজেলা শ্রমিক দলের সাবেক সভাপতি ও রূপসা-বাগেরহাট আন্তঃজেলা সড়ক পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি মাসুম বিল্লাহকে (৫৫) গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। এ ঘটনা ঘটনা ঘটে বুধবার রাত ৯টার দিকে নগরের ডাকবাংলোর মোড়ে। এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে অশোক ঘোষ নামের এক ব্যক্তিকে একটি বিদেশি পিস্তলসহ আটক করেছে পুলিশ।

ঘটনার সময় ডাকবাংলা মোড়ে মাসুম বিল্লাহ অবস্থান করছিলেন। এ সময় একদল দুর্বৃত্ত তাকে লক্ষ্য করে গুলি করে। সে দৌড়ে বাটার শোরুমে গিয়ে পালানোর চেষ্টা করলেও দুর্বৃত্তরা ধারাল অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে গুরুতর জখম করে দ্রুত পালিয়ে যায়। স্থানীয় লোকজন তাকে উদ্ধার করে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।

ছবি: এআই দিয়ে তৈরি।


গত ৫ মাচ কেএমপির উপপুলিশ কমিশনার (দক্ষিণ) তাজুল ইসলাম রাইজিংবিডি ডটকমকে বলেন, “সন্ত্রাসীরা মাসুমকে কন্ট্রাক্ট কিলিং করতে আসে। ৭ জন মিলে মাসুমকে গুলি করে ও ধারাল অস্ত্র দিয়ে আঘাত করে পালিয়ে যাওয়ার সময় ট্রাফিকের একজন ইন্সপেক্টর অশোক ঘোষকে কোমরে পিস্তল রাখতে দেখে জনগণের সহযোগিতায় তাকে আটক করেন। তদন্ত চলছে, হত্যার কারণ জানতে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে।”

গত ২৭ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর পল্টন থানা এলাকার একটি কমিউনিটি সেন্টারের বিপরীত পাশ থেকে মো. ওবায়দুল্লাহর (৩০) খণ্ডিত একটি পা, পরদিন সকালে বায়তুল মোকারমের স্টেডিয়াম সংলগ্ন গেটের পাশ থেকে দুইটি পূর্ণাঙ্গ হাত, দুপুরে কমলাপুর রেলস্টেশন এলাকা থেকে অন্য একটি পা উদ্ধার হয়। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ ও তথ্য প্রযুক্তির সহায়তায় ঘাতকের অবস্থান শনাক্ত করে।

এক পর্যায়ে শনিবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে মতিঝিল থানার হীরাঝিল হোটেলের সামনে অভিযান পরিচালনা করে শাহিনকে গ্রেপ্তার করে। তার দেখানো মতে কবি জসীমউদ্দীন রোডের ভাড়া বাসা থেকে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত চাপাতি, নিহতের মোবাইল ফোন এবং লাশ পরিবহনে ব্যবহৃত সাইকেলটি উদ্ধার করা হয়। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পরে মাতুয়াইল ময়লার ভাগাড় হতে মস্তক, আমিনবাজারের সালেহপুর ব্রিজের নীচ হতে কোমরের একটি অংশ উদ্ধার করা হয়।

কী কারণে এমন হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হলো জানতে চাইলে মতিঝিল জোনের উপপুলিশ কমিশনার (ডিসি) হারুন অর রশিদ বলেন, “ঘটনার দিন নিহত ওবায়দুল্লাহ ফোন করে শাহীন আলমকে সিগারেট আনতে বলে। এছাড়াও ওবায়দুল্লাহ শাহিনকে বিভিন্ন সময়ে অনৈতিক প্রস্তাব দিয়ে আসছিল।এ নিয়ে তাদের মধ্যে মনোমালিন্য চলে আসছিল। এরই অংশ হিসেবে এ হত্যাকাণ্ড হতে পারে। তারপরও তদন্তের পর বিস্তারিত জানা যাবে।”

গত ২৬ ফেব্রুয়ারি নরসিংদীর মাধবদী এলাকার বাবার সামনে থেকে এক কিশোরীকে তুলে নিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা। পরে তাকে জঙ্গলে নিয়ে ধর্ষণ এবং পরে হত্যা করা হয়। এ ঘটনা নিয়ে চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে। এ নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে যেমন আলোচনা-সমালোচনা চলছে, তেমনি নিন্দা জানানো হয়েছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও মানবাধিকার সংগঠনের পক্ষ থেকে। মূল অভিযুক্ত নূর মোহাম্মদ ওরফে নূরাকে গাজীপুরের মাওনা থেকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এছাড়া কুমিল্লার গৌরিপুর থেকে আটক করা হয় হযরত আলী নামে আরেকজনকে।এর আগে এই ঘটনায় জড়িত সন্দেহে আরো ৫ জনকে গ্রেপ্তার করার কথা জানিয়েছিল পুলিশ।

মাধবদী থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোহাম্মদ কামাল হোসেন জানিয়েছেন, কিশোরী হত্যার এই ঘটনায় এখন পর্যন্ত ৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

গত ১ মার্চ সীতাকুণ্ড পৌর সদরের ইকোপার্কের দুর্গম পাহাড়ি এলাকার বোটানিক্যাল গার্ডেন ও ইকোপার্কের ভেতর থেকে গলা কেটে শিশু কন্যা হত্যার মূল আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

চট্টগ্রামের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (শিল্পাঞ্চল ও ডিবি) মো. রাসেল বলেন, “গত ৩ মার্চ ভোরে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) শিশুটি চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায়। প্রথমে ধর্ষণ ও পরে গলা কেটে হত্যা করা হয় কিশোরীকে। তবে এ ঘটনার কারণ এখনো জানা যায়নি।”

পুলিশ সদর দপ্তর এবং বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বিগত দেড় বছরে হত্যাকাণ্ডের সংখ্যায় বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা গেছে। ২০২৪ সালে ৩৪৩২ জন খুন হন। এর মধ্যে আগস্ট থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত (সরকার পরিবর্তনের পরবর্তী ৫ মাস) ১৫৬৫ জন নিহত হন। আগস্ট মাসেই সর্বোচ্চ ৬২৬টি হত্যা মামলা হয়। আর ২০২৫ সালে  সারা দেশে ৩ হাজারের বেশি খুনের মামলা হয়েছে। সেই হিসাবে গড়ে প্রতিদিন প্রায় ১১ জন মানুষ হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ঢাকা বিভাগে সর্বোচ্চ (৬৮৫টি) এবং ডিএমপি এলাকায় ৩৫২টি খুনের ঘটনা ঘটে।২০২৬ সালের শুরুতে নির্বাচনি সহিংসতা এবং পরবর্তীতে নতুন সরকার গঠনের পরও বিচ্ছিন্নভাবে খুনের খবর পাওয়া যাচ্ছে।

আইন ও শালিস কেন্দ্র (আসক) বলছে, ২০২৫ সালে দেশে প্রতিদিন গড়ে ১১ জন খুন হয়েছেন, যা আগের দুই বছরের তুলনায় বেশি। এর মধ্যে শুধু গত বছরই রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা বেশি। এ ধরনের সহিংসতা নির্বাচনের পরিবেশকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। রাজনৈতিক ও অরাজনৈতিক সব মিলিয়ে গত বছর সারা দেশে ৩ হাজার ৭৮৫টি হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় ৩৫৩টি বেশি।

পুলিশের মুখপাত্র (মিডিয়া) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন বলেন, “আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পুলিশ সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছে।”

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, “অপরাধী যে দলেরই হোক না কেন, তাকে ছাড় দেওয়া হবে না। এমনকি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের বেআইনি আদেশ না মানার জন্য মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।”

ছবি: এআই দিয়ে তৈরি।


এদিকে, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং পুলিশ সদর দপ্তর থেকে পুলিশ বাহিনীকে জনবান্ধব এবং পেশাদার করে তুলতে বেশ কিছু বড় পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে পুলিশ প্রশাসনের ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত ব্যাপক রদবদল শুরু হয়েছে। ডিএমপি কমিশনারসহ গুরুত্বপূর্ণ রেঞ্জ ও জেলাগুলোতে নতুন কর্মকর্তাদের পদায়ন করা হচ্ছে। বাহিনীর জনবল সংকট কাটাতে এবং সক্ষমতা বাড়াতে সম্প্রতি ২৭০১ জন কনস্টেবল নিয়োগের জরুরি নির্দেশ দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। পুলিশ বাহিনীকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করতে এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে একটি স্বতন্ত্র ‘পুলিশ কমিশন' গঠনের আলোচনা চলছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, হত্যা বা যেকোন অপরাধ বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। অপরাধ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হক বলেন, “অনেক ক্ষেত্রে প্রশাসনের দুর্বলতাও অপরাধ প্রবণতাকে উসকে দেয়। এখনই কার্যকর উদ্যোগ না নিলে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড বন্ধ করা কঠিন হবে।আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি রাজনৈতিক দলগুলোকেও আরো সচেতন ও ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। খুনের ঘটনার পেছনে প্রধানত ৪টি কারণ কাজ করছে। ক্ষমতার পরিবর্তনের ফলে মাঠ পর্যায়ে আধিপত্য বিস্তার ও প্রতিপক্ষ দমনের জেরে হত্যাকাণ্ড বা অপরাধ বেড়েছে। বর্তমান বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ প্রেক্ষাপটে আমাদের সামনে বেশ কিছু জটিল বিষয় দাঁড়িয়েছে। বিষয়গুলোর মধ্যে  অপরাধ  প্রবণতা টেনে ধরা সরকারের জন্য এখন একটি বড় চ্যালেঞ্জ।”

ঢাকা/এমআর/এসবি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়