সাগরে দস্যু আতঙ্ক: অপহরণের পর মুক্তিপণই সমাধান
ইমরান হোসেন, বরগুনা || রাইজিংবিডি.কম
পাথরঘাটার পদ্দা এলাকায় নোঙর করা মাছ ধরার ট্রলার।
আবারও দস্যু আতঙ্কে দিন কাটছে বরগুনার পাথরঘাটার জেলেদের। গভীর সাগর ছাড়িয়ে দস্যুদের থাবা এখন উপকূলেও। একের পর এক অপহরণ, নির্যাতন ও মুক্তিপণের ঘটনায় জীবিকা নিয়ে শঙ্কায় পড়েছেন নদীতীরবর্তী মানুষ। ভয়ে সাগরে না-নামায় হাটবাজারে আশঙ্কাজনক হারে কমছে মাছের সরবরাহ।
জেলেরা বলছেন, সুন্দরবন ও বঙ্গোপসাগর অঞ্চলে একের পর এক জেলে বহরে হামলা, অপহরণ, গুলি ও লুটপাটের একাধিক ঘটনায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে গোটা উপকূলে। জলদস্যু আতঙ্ক এতটাই ছড়িয়েছে, জেলেরা কথা বলতেও ভয় পাচ্ছেন, নিচ্ছেন না আইনের আশ্রয়। মুক্তিপণ দিলে মিলবে মুক্তি, নয়তো বন্দি থাকতে হচ্ছে ভয়ংকর দুই বাহিনী ‘বড় জাহাঙ্গীর’ ও ‘জাহাঙ্গীর এম ছোট ভাই’ বাহিনীর হাতে।
সম্প্রতি মুক্তিপণ দিয়ে জলদস্যুদের কবল থেকে ফিরে আসা জেলেদের দাবি, সরকারের লুট হওয়া অত্যাধুনিক অস্ত্র নিয়ে সাগরে ডাকাতি করছে দস্যুরা। বরগুনা মৎসজীবী ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতি গোলাম মোস্তফা চৌধুরীর দেয়া তথ্য মতে, ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি সময় থেকে এখন পর্যন্ত সুন্দরবন এবং বঙ্গোপসাগরের দুবলা, কটকা ও আলোরকোল এলাকা থেকে শুধু বরগুনা জেলা থেকে অন্তত ৪৬ জন জেলে অপহরণের শিকার হয়েছেন জলদস্যু ‘বড় জাহাঙ্গীর’ ও ‘জাহাঙ্গীর এম ছোট ভাই’ বাহিনীর হাতে। এদের মধ্যে গত ১৫ ফেব্রুয়ারি সুন্দরবনের কটকা থেকে পাথরঘাটা সদর ইউনিয়নের রুহিতা গ্রামের মাসুম মাঝিকে ট্রলারসহ অপহরণ করে দস্যুরা। পরে চার লাখ টাকা মুক্তিপণের বিনিময়ে তিনি মুক্তি পেলেও ট্রলারের তিন মাঝি—মাহবুব (২৭), সোহেল (১৭) ও রাজু (২৬) এখনো নিখোঁজ রয়েছেন।
জলদস্যুরা অপহরণ করে স্বজনদের কাছে মুক্তিপণ চাওয়ার সময়ই অপহৃত জেলেদের মাধ্যমে মুঠোফোনে বলে দেয়, যে বা যারা এ বিষয়ে প্রশাসন কিংবা সাংবাদিকদের সাথে কথা বলবে তাকেই মেরে ফেলা হবে।
সম্প্রতি বরগুনার পাথরঘাটার দুই জেলে সিদ্দিক মিয়া ও আব্দুল্লাহ দুই লাখ সাড়ে চার হাজার টাকা মুক্তিপণ দিয়ে জাহাঙ্গীর এম ছোট ভাই বাহিনীর কবল থেকে মুক্তি পেয়েছেন। এ প্রসঙ্গে আব্দুল্লাহ বলেন, ‘‘আমি আর এই পেশায় ফিরব না। না খেয়ে থাকলেও আর মাছ শিকারে যাবো না। ভয়ংকর এই বাহিনী হাত-পা বেঁধে উল্টো ঝুলিয়ে ভয়াবহ নির্যাতন করে।’’
মুক্তিপণের টাকা দিতে দেরি হওয়ার কারণে শারীরিক নির্যাতন করা হয় সিদ্দিক মিয়াকে। মুক্তিপণ দিয়ে ফিরে এসে পাথরঘাটা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে তাকে চিকিৎসা নিতে হয়। বর্তমানে অনেকটা সুস্থ হলেও এ বিষয়ে কোনো কথা বলতে তিনি রাজি হননি।
শুধু সুন্দরবন ও বঙ্গোপসাগর নয়, পাথরঘাটার পদ্দা এলাকায় নোঙর করা এফবি রাসেল শেখ ট্রলার এবং ট্রলারে থাকা পাহারাদার মিরাজুল ইসলামকে অপহরণ করে নিয়ে গেছে দস্যুরা। ফেব্রুয়ারির শেষের দিকের এই ঘটনায় আতঙ্ক এবার স্থলে থাকা জেলেদের উপরেও পড়েছে। দস্যুদের তাণ্ডবে সুন্দরবন ও বঙ্গোপসাগরের বিভিন্ন এলাকায় মাছ শিকার বন্ধ করে জাল দড়ি ও ট্রলার ফেলে নিরাপদে সরে গেছেন জেলেরা।
গত ২২ ফেব্রুয়ারি জলদস্যুরা পাথরঘাটার পদ্দা এলাকার জেলে রাজু (৩১) ও কাঁকড়াশিকারি নিহার মণ্ডলকে অপহরণ করে। পরে এক লাখ টাকা মুক্তিপণ পেয়ে ছেড়ে দেয়। ফেরার পথে আরেকটি দস্যুদল তাদের ট্রলার লক্ষ্য করে গুলি চালায়। এতে ট্রলার ক্ষতিগ্রস্ত হলেও রাজু ও নিহার মণ্ডল প্রাণে বেঁচে যান।
ভয়ে সাগরে ট্রলার ভাসাচ্ছেন না জেলেরা
নিহার মণ্ডল বলেন, ‘‘বড় জাহাঙ্গীর বাহিনী আমাকে অপহরণ করে নিয়ে যায়। চোখ বেঁধে জঙ্গলে নিয়ে শিকল পরিয়ে রাখে। পরে স্ত্রীর ফোন নাম্বার আমার কাছ থেকে চেয়ে নেয়। স্ত্রীকে ফোনে রেখে আমাকে কাঁটাযুক্ত লাঠি দিয়ে বেধড়ক পেটাতে থাকে। আমার স্ত্রী আমার চিৎকার আর কান্না সহ্য করতে না পেরে ধারদেনা করে এক লাখ টাকা মুক্তিপণ দিলে আমাকে ওরা ছেড়ে দেয়।’’
‘‘কটকা এলাকায় মাছ ধরার সময় দস্যু বাহিনী কয়েকদিন আটকে রাখে। মুক্তির পর ফেরার পথে আবারও বাধার মুখে পড়লে দ্রুত ট্রলার চালিয়ে সেখান থেকে সরে আসি,’’ বলেন রাজু।
পদ্দা এলাকার জেলে হাবিব, সুমন, হাসনাত, কবিরসহ একাধিক জেলে জানান, এলাকার জেলেরা ট্রলারসহ জাল দড়ি ফেলে রেখে এসেছি পদ্দা স্লুইজ গেটে। দস্যু দমন না করতে পারলে আর মাছ শিকার করতে যাবে না তারা।
জেলে কুদ্দুস ফরাজী বলেন, ‘‘না খেয়ে থাকলেও আর সাগরে যাবো না। যে কয় টাকার মাছ বিক্রি করি তার থেকে বেশি দিতে হয় মুক্তিপণ। প্রশাসন সব জানে চট্টগ্রাম এলাকার দস্যুরা গ্রেপ্তার হলেও বরগুনার দস্যুরা গ্রেপ্তার হয়নি। অর্ধাহার-অনাহারে দিন কাটাই কিন্তু মাছ শিকারে যাই না।’’
একই এলাকার এফবি এলাহী ট্রলারের মালিক আব্দুল লতিফ রাইজিংবিডিকে বলেন, ‘‘আমি নিজেই ট্রলার নিয়ে মাছ শিকার করি। আমাদের ১৮ জেলেকে গত সপ্তাহে জলদস্যুরা আলোরকোল এলাকায় চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে। আমাদের মাছ ও জ্বালানি রসদ তারা লুট করে নিয়ে যায়। এ সময় তাদের কাছে আমরা যে অস্ত্র দেখেছি সব পুলিশের অস্ত্র। আমরা পুলিশের হাতে ওই অস্ত্র আগে দেখেছি।’’
এগুলো পুলিশের লুট হওয়া অস্ত্র হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন আব্দুল লতিফ।
এদিকে এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ মৎস্যজীবী ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতি গোলাম মোস্তফা চৌধুরী রাইজিংবিডিকে বলেন, ‘‘প্রশাসনকে ম্যানেজ করে জলদস্যুরা রাজত্ব করছে সুন্দরবনে। কঠোরভাবে দমন না করলে মৎস্যখাতে প্রভাব আরো খারাপ ভাবে পরবে। বিভিন্ন সময়ে আত্মসমর্পণ করা জলদস্যুরা এখন নতুন করে দস্যুতায় জড়িয়ে পড়েছে, সাগরে মাছ শিকারের পরিবেশ নাই এখন। জেলেরা মাছ শিকারে যেতে চাচ্ছে না। ট্রলার মালিকরাও পথে বসতে শুরু করেছে। বেশিরভাগ ট্রলার ঘাটে পড়ে আছে।’’
এই যখন মাঠের চিত্র, তখন জেলেদের নিয়ে সরাসরি কাজ করা মৎস্য অধিদপ্তরের দাবি, তাদের দৃষ্টিতে এখন পর্যন্ত বড় কোনো ঘটনাই ঘটেনি। বরগুনা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা জিয়া উদ্দিন বলেন, ‘‘মৌখিকভাবে কিছু দস্যুতার ঘটনা শুনেছি। তবে, জেলরা লিখিতভাবে আমাদের কিছু জানায়নি। তারপরও আমি জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের সাথে কথা বলেছি, নৌবাহিনীকেও বলেছি। তারা দস্যু দমনে কাজ করবেন বলে জানিয়েছেন।’’
ঢাকা/ইমরান//