RisingBD Online Bangla News Portal

ঢাকা     শুক্রবার   ২৩ অক্টোবর ২০২০ ||  কার্তিক ৮ ১৪২৭ ||  ০৬ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

প্রযুক্তির ছোঁয়ায় হারিয়ে যাচ্ছে গ্রামীণ খেলাধুলার ঐতিহ্য

হাছিবুল বাসার মানিক || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ০৮:৪৯, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২০   আপডেট: ১০:৪৮, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২০
প্রযুক্তির ছোঁয়ায় হারিয়ে যাচ্ছে গ্রামীণ খেলাধুলার ঐতিহ্য

সময় বহমান। সে বহমান সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বদলে যায় আমাদের চারপাশের চিত্রও। বদলে যায় সমাজ, সংস্কৃতি। প্রযুক্তির উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে বর্তমান সময় হয়ে উঠেছে অনেকটাই যান্ত্রিক। আগের সেই প্রাণোচ্ছ্বল খেলোধুলার ঘটেছে অপমৃত্যু। প্রযুক্তির ছোঁয়ায় হারিয়ে যাচ্ছে আদিকালের গ্রামীণ খেলাধুলার ঐতিহ্য।

বিংশ শতাব্দীর শেষাংশেও গ্রামের শিশু-কিশোররা পড়াশোনার পাশাপাশি মেতে উঠতো বিভিন্ন ধরনের খেলায়। বিকেলে খোলা মাঠে দস্যিপনা চালাতো শিশু-কিশোররা। যুবারা দলবেঁধে খেলত হা ডু ডু, দাঁড়িয়াবান্ধা, কাবাডিসহ বিভিন্ন গ্রামীণ খেলা। এমনকি সেখানে স্থান পেত বর্তমান সময়ের সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা ক্রিকেট, ফুটবলও। শৈশবের দুরন্তপনায় মেতে থাকতো ছেলে-মেয়ের দল।

বর্তমান আধুনিক প্রযুক্তি কেড়ে নিয়েছে অতীতের ঐতিহ্যবাহী খেলাধুলাকে। আর প্রজন্মকে ক্রমেই ঠেলে দিচ্ছে যান্ত্রিকতার দিকে। কেবল যান্ত্রিকতায় যদি সঙ্গী হতো তবুও মেধাবী এক ভবিষ্যতের বাংলাদেশ পাওয়ার জোর সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু খেলাধুলার প্রতি অনাসক্তি কিশোর-যুবকদের ঠেলে দিচ্ছে ভয়ঙ্কর মাদকতার দিকে। ফলে ভবিষ্যত বাংলাদেশ হচ্ছে মেধাশূন্য।

এছাড়া বর্তমানে শহরাঞ্চলে তো বটেই গ্রামাঞ্চলেও খোলা জায়গা বা খেলার মাঠের স্বল্পতার কারণে অনেক গ্রামীণ খেলার মৃত্যু ঘটেছে অনেক আগেই। ফলে বর্তমানে ভিডিও গেম, টেলিভিশন, মোবাইল ফোন ইত্যাদি গ্রামীণ খেলাধুলার সে স্থান দখল করে নিয়েছে। ছেলেমেয়েরা একটু সময় পেলেই মেতে ওঠে এসব যান্ত্রিক জিনিস নিয়ে।

বলা হয়, পড়াশুনা যেমন ছেলেমেয়েদের মানসিক বিকাশ ঘটায় তেমনি শারীরিক বিকাশ ঘটাতে খেলাধুলার কোন বিকল্প নেই। আগেরকার দিনে গ্রামাঞ্চলে হা-ডু-ডু, কাবাডি, নৌকাবাইচ, জব্বারের বলি খেলা ও লাঠিখেলার জন্য রীতিমত প্রতিযোগিতা চলত। বিভিন্ন গ্রামে এসব খেলার জমজমাট আয়োজন হতো। এ সমস্ত খেলা দেখার জন্য অনেক দূরদূরান্ত থেকে মানুষ দলে দলে এসে উপস্থিত হতো মাঠে। অনেক খেলোয়াড় টাকার বিনিময়েও বিভিন্ন দলের হয়ে খেলতো। তাতে করে ভালো খেলায় টাকাসহ নানারকম পুরস্কার যেমন মিলতো সেই সঙ্গে ভালো খেলোয়াড় হিসেবে সুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়তো এলাকায়। সমাজের সর্বস্তরের মানুষ এসমস্ত খেলোয়াড়দেরকে অনেক সম্মান করতো।

অতীতের সময়ে প্রতিবছর সব স্কুল-কলেজ, মাদরাসাগুলোতে নানা ধরনের খেলাধুলার আয়োজন করা হতো। বর্তমানে অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব কোন খেলার মাঠও নেই। ফলে খেলাধুলা উপস্থিতি না থাকায় শিক্ষার্থীদের শারীরিক বিকাশ ঘটছে না। বর্তমানে আকাশ সংস্কৃতির অপগ্রাসের ফলে ছেলেমেয়েরা ক্রমশ খেলা বিমুখ হয়ে পড়েছে। এ প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা গ্রামবাংলার হাজার বছরের ঐতিহ্য এসব গ্রামীণ  খেলাধুলা তো করেই না, এমনকি এসব খেলাধুলার নাম জানে কিনা সেটি এক প্রশ্ন। অথচ এক সময় এ সমস্ত খেলাধুলাকে বাদ দিয়ে বাঙালি ঐতিহ্যের পূর্ণতাকে কল্পনাও করা যেত না। বর্তমানে এসব ঐতিহ্যবাহী খেলাধুলার প্রচলন না থাকায় গ্রামীণ জনপদ থেকে হারিয়ে যেতে বসেছে হাজার বছরের বাঙালী ঐতিহ্য।

এ অবস্থা চলতে থাকলে হয়ত অচিরেই গ্রামীণ খেলাধুলা আমাদের সংস্কৃতি থেকে হারিয়ে যাবে। পরিণত হবে রূপকথার গল্পে। এ সমস্ত গ্রামীণ খেলাধুলার সঙ্গে রয়েছে আমাদের পূর্বপুরুষদের নাড়ির সম্পর্ক। তাই তাদের স্মৃতি ও ঐতিহ্য ধরে রাখতে আমাদের উচিত এ সমস্ত গ্রামীণ খেলাধুলার আয়োজন করা। বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে এর পরিচিতি ও সুফল তুলে ধরতে হবে।

আশার বাণী হচ্ছে যে, এখন সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে কিছু উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। তবে মাদকের ভয়াল গ্রাস থেকে প্রজন্মকে রক্ষা ও গ্রামীণ খেলাকে বাঁচাতে এদেশের সচেতন ব্যক্তিরাও এগিয়ে আসতে হবে, সোচ্চার ভূমিকা পালন করতে করতে হবে। এরসঙ্গে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগ বৃদ্ধির মাধ্যমেই কেবল অতীত ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনা সম্ভব।

লেখক: শিক্ষার্থী, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ,
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

ঢাকা/কামরুল

সম্পর্কিত বিষয়:

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়