আড়াল থেকে যেভাবে পাওয়ার হিটার হয়ে উঠলেন জাকের আলী
সাইফুল ইসলাম রিয়াদ || রাইজিংবিডি.কম

“এই পুরো ক্যারিবিয়ান সিরিজটি দীর্ঘসময় স্মরণে রাখবে”—সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ইনস্টাগ্রামে কয়েকটি ছবির সঙ্গে এমন ক্যাপশন জুড়ে দেন উইকেটরক্ষক ব্যাটার জাকের আলী অনিক। শুধু জাকের আলীর নিজের নয়, ক্যারিবীয়ান দ্বীপপুঞ্জে ‘জাকের টর্নেডো’ গেঁথে থাকবে লাল-সবুজের ক্রিকেট ভক্তদের মনেও। টেস্ট সিরিজ দিয়ে শুরু, মাঝে ওয়ানডে আর শেষে টি-টোয়েন্টি। জাকের সব সংস্করণেই বিচক্ষণ মানসিকতা, সুনিপুণ দক্ষতা আর দারুণ অভিজ্ঞতার সাক্ষর রেখেছেন।
সেন্ট ভিনসেন্টে শেষ টি-টোয়েন্টিতে একের পর এক ছক্কার মার দেখে ধারভাষ্যকার নিখিল উত্তামচান্দানি বলে উঠলেন, ‘ইটস জাকের আলী শো—সুপারস্টার ইন দ্য মেকিং।’
প্রথম টেস্টে পেয়েছেন ফিফটির দেখা। দ্বিতীয় টেস্টে সেঞ্চুরি পেতে পেতে পাননি। তার ৯১ রানে ভর করে বাংলাদেশ দিতে পারে বিশাল লক্ষ্য। তাতে ভর করে ধরা দেয় বড় জয়।
ওয়ানডেতেও বিপদের মুহূর্তে হাল ধরে ব্যাটিং করেছেন সাবলীলভাবে। শেষ দিকে ঝড়ো ব্যাটিংয়ে চেষ্টা করেছেন রান বাড়ানোর। প্রথম ম্যাচে ৪০ বলে ৪৮, দ্বিতীয় ম্যাচে ৯ বলে ৩ আর শেষ ম্যাচে ৫৭ বলে ৬২।
টি-টোয়েন্টিতে প্রথম ম্যাচে ২৭ বলে ২৭, দ্বিতীয় ম্যাচে ২০ বলে ২১ ও তৃতীয় ম্যাচে ৪১ বলে অপরাজিত ৭২। এই ম্যাচে আলজারি জোসেফদের হাওয়ায় ভাসিয়ে স্টেডিয়াম পার করে জাকের বুঝিয়েছেন তিনি একজন পিওর ‘পাওয়ার হিটার।’
ক্রিকেটের সংক্ষিপ্ত সংস্করণে বাংলাদেশের আক্ষেপের শব্দ পাওয়ার হিটার। ছক্কা মারতে না পারার অদক্ষতা এই সংস্করণে পিছিয়ে দিয়েছে। তবে জাকেরের পারদর্শীতা আক্ষেপ ঘোচাবে কী না সেটা বলে দেবে সময়।
কিভাবে পাওয়ার হিটার হিসেবে নিজেকে তৈরি করেছেন জাকের। যেতে হবে ফ্ল্যাশব্যাকে। বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগে (বিপিএল) কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্সে নিজেকে চেনানোর শুরু। শেষে নেমে একের পর এক ক্যামিও ইনিংস। ২০২৪ বিপিএলে ১৪১ স্ট্রাইকরেটে রান করেছেন ১৯৯টি।
তবুও জাকের জাতীয় দলে ডাক পান না দেখে এমন একটি মন্তব্য করেন কুমিল্লার তৎকালীন কোচ সালাউদ্দিন, যিনি এখন জাতীয় দলের কোচিং প্যানেলে যুক্ত, তা আলোড়ন তুলে সারাদেশে।
সালাউদ্দিন বলেছেন, “জাকেরের কথাটা সবসময় আপনারা ভুলে যান, আপনারা কেউ কিন্তু আসলে কখনোই জিজ্ঞেস করেন না। ছেলেটার হয়ত চেহারা একটু কালো, এই কারণে আমার মনে হয় বোর্ডও তাকে দেখে না ঠিকমতো। আপনারা ছয় নম্বর, সাত নম্বরে প্লেয়ার খোঁজেন। এই ছেলেটা লাস্ট কয়েকটা ম্যাচ থেকে খুবই ভালো খেলতেছে। তার স্ট্রাইক রেট যদি দেখেন, আর সে প্রতিটা দিনই আমাদের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে রানটা করে দিতেছে এবং সে অনেক সেন্সিবল।”
কুমিল্লার হয়ে বিপিএলে ঝড় তুললেও জাকের আলী ছিলেন আড়ালেই। ২০১৬ সালে মিরাজের সঙ্গে খেলেছেন যুব বিশ্বকাপ। জাতীয় দলের জন্য অপেক্ষা করতে হয় ৮ বছর। ততদিনের মিরাজ খেলে ফেলেন দেড়শর বেশি আন্তর্জাতিক ম্যাচ।
লম্বা সময় ধরে জাকের পারফর্ম করে গেছেন ঘরোয়া ক্রিকেটে। সালাউদ্দিনের মন্তব্যের পর জাকেরকে নিয়ে আলোচনা যেন বেগবান হয়। এরপর সুযোগ আসে টি-টোয়েন্টি দলে, খেলেন বিশ্বকাপ। ধাপে ধাপে টেস্ট ও ওয়ানডেতেও অভিষেক ঘটে সিলেটের এই ব্যাটারের।
টি-টোয়েন্টিতে নিজের চতুর্থ ম্যাচে দেখা পেয়েছিলেন ফিফটির। মাত্র ৩৪ বলে দুইশ স্ট্রাইক রেটে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে করেন ৬৮ রান। সবমিলিয়ে ২০২৪ সালে জাকের তিন সংস্করণে ফিফটি করেন ৭টি। জাতীয় দলে চলতি বছরে সমান ফিফটি আছে শুধু মেহেদী হাসান মিরাজের।
জাকেরের পাওয়ার হিটার হয়ে ওঠার পেছনে অবদান আছে সালাউদ্দিনের। মাসকো সাকিব ক্রিকেট একাডেমিতে কুমিল্লার হয়ে অনুশীলনের সময় জাকেরকে তার চিরচেনা স্টাইল বদলে নতুন কৌশল রপ্ত করতে বলেন সালাউদ্দিন। লম্বা সময় ধরে অনুশীলনের পর অনুশীলন করে সেটি নিয়ে এসেছেন নিজের নিয়ন্ত্রণে। তাতেই বাজিমাত। জাকেরকে আর পেছনে তাকাতে হয়নি।
জাকের কিভাবে তিন সংস্করণে এভাবে সমানতালে পারফর্ম করছেন? তৃতীয় টি-টোয়েন্টির ম্যাচ সেরার পুরস্কার হাতে এমন প্রশ্নের উত্তরে জাকের বলেন, “পুরোটাই মাইন্ডসেটের ব্যাপার। ক্যারিবিয়ান বিগ বয়রা যেকোনো ফরম্যাটেই মেরে খেলতে পারে। বিশেষ করে তাদের কন্ডিশনে। এখানে বিশ্বকাপ খেলেছি, তখন ভালো খেলিনি। দেশে গিয়ে পর্যাপ্ত প্রস্তুতি নিয়েছি, এই সফরের জন্য বিশেষ করে। এরপর ভালো খেলতে পেরেছি।”
ঢাকা/রিয়াদ/আমিনুল