ঢাকা     রোববার   ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ ||  ফাল্গুন ১২ ১৪৩০

 ২৮ ফিট উঁচু বিগ্রহের কালভৈরব মন্দির

সুমন্ত গুপ্ত || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৯:৪০, ১৯ মে ২০২৩   আপডেট: ১৯:৪৫, ১৯ মে ২০২৩
 ২৮ ফিট উঁচু বিগ্রহের কালভৈরব মন্দির

অনেক দিন কোথাও যাওয়া হয় না। ঘুরতে যেতে মন চাইছিল। শুক্রবার সূর্যমামা নয়ন মেলার পরেই ফোন দিলাম আমাদের চার চাকার পাইলট পলাশ ভাইকে। বেশ কয়েকবার ফোন দিলাম, সাড়াশব্দ নেই। যার মানে দাঁড়ায় পলাশ ভাই এখনো নিদ্রায় আছেন। যাইহোক শেষ পর্যন্ত সকাল নয়টার দিকে ফোন ব্যাক করলেন তিনি। ফোন ধরেই পলাশ ভাইকে বললাম ফ্রেশ হয়ে বাসায় চলে আসেন বাইরে যাব। 

স্বল্প সময় পরেই পলাশ ভাই বাসায় এসে উপস্থিত। সময় নষ্ট না করে বেড়িয়ে পড়লাম। গাড়িতে উঠতেই পলাশ ভাই বললেন কোথায় যাব? আমি বললাম, তা তো জানি না। ঢাকামুখী চলেন দেখি। কোথায় গিয়ে থামা যায়। তপ্তরোদে মহাসড়ক পেড়িয়ে আমরা এগিয়ে চলছি। চলতি পথে যাদুর বাক্স ঘাঁটছিলাম। আমি মোবাইলকে জাদুর বাক্স বলি। কেননা এই জাদুর বাক্সের নেশা থেকে বের হওয়া খুব কঠিন। যাইহোক জাদুর বাক্সের কল্যাণে চোখে পড়ল ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের মেড্ডায় অবস্থিত ৩০০ বছরের পুরনো শ্রী শ্রী কালভৈরব মন্দিরের কথা।

পলাশ ভাইকে বললাম ব্রাহ্মণবাড়িয়া যাওয়ার জন্য। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কালভৈরব মন্দিরের গিয়েছেন কিনা জানতে চাইলে পলাশ ভাই বললেন- যাই নাই কখনো। তবে নেটে সার্চ দিয়ে বের করা যাবে। পলাশ ভাইয়ের কথা শুনে মনে হলো আসলেই আমরা ডিজিটাল যুগে আছি। প্রায় আড়াই ঘণ্টা ধরে আমরা মহাসড়কে আছি। ছয়লেনের সড়ক ধরে এগিয়ে চলছি। লেনের কাজ এখনও শেষ হয়নি। ব্যাপক কর্মযজ্ঞ চলায় গাড়ি একটু ধীরগতিতেই চলছিল। পলাশ ভাই বললেন, সড়কটি আশুগঞ্জ নৌবন্দর থেকে আখাউড়া হয়ে আগরতলা ঢুকেছে। আশুগঞ্জ নৌবন্দর থেকে সরাইল বিশ্বরোড মোড়, সেখান থেকে আখাউড়ার ধরখার। পরে ঢুকেছে ত্রিপুরার রাজধানী আগরতলায়।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদরের মেড্ডা এলাকায় যখন আমাদের গাড়ি থামলো তখন সূর্য হেলান দিয়েছে পশ্চিম কোণে। সড়ক থেকেই চোখে পড়ে মন্দিরটির বিশাল তিনটি মঠ। একটু সামনে এগোতেই গেট ঠেলে পা রাখতে রাখতেই দৃষ্টি পড়লো খোদাই করা লেখার দিকে। লেখা ‘শ্রী শ্রী কালভৈরব নাটমন্দির’। নেট ঘেঁটে পলাশ ভাই নিয়ে এলেন শত বছরের পুরনো কালভৈরব মন্দিরের প্রবেশ দ্বারে। নগ্ন পায়ে আমরা এগিয়ে চললাম মন্দির পানে। দর্শন পেলাম ২৮ ফুট উঁচু শ্রী শ্রী কালভৈরব মূর্তির। মাথা ঠেকে আছে মন্দিরের ছাদে। প্রশস্ত মধ্যপ্রদেশ উঁচিয়ে পায়ের উপর হাত রেখে বসে আছেন শিব। জটা বিছিয়ে আছে কাঁধজুড়ে। হাতের ডান পাশে বিশাল এক ত্রিশুল। সামনে থেকে না দেখলে মূর্তিটির বিশালতা আন্দাজ করা যায় না। আগর বাতির সুবাসিত গন্ধে মন নিয়ে গেল এক অপার্থিব জগতে। 

কথা হচ্ছিল স্থানীয় প্রবীণ শিবু বাবুর সাথে। তিনি বলছিলেন ১৯০৫ সালে নির্মিত দৃষ্টিনন্দন ২৮ ফিট উচ্চতার কালভৈরব বা শিব মূর্তি ভারতীয় উপমহাদেশের সর্বাধিক উচ্চতার মূর্তি হিসেবে গণ্য করা হয়। বিশালাকার মূর্তির ডান দিকে কালী এবং বাম দিকে দেবী পার্বতীর প্রতিমা রয়েছে। সরাইলের বিখ্যাত জমিদার নূর মোহাম্মদ কালভৈরব মন্দিরের জমি দান করেন। 

প্রচলিত আছে, কাশীশ্বর দেবাদিদেব মহাদেব নিজ শরীরের অংশ থেকে কালভৈরবের সৃষ্টি করে তাকে কাশীধাম রক্ষার ভার প্রদান করেন। শ্রী শ্রী কালভৈরবের আবির্ভাবের পর স্থানীয় দূর্গাচরণ আচার্য স্বপ্নে প্রাপ্ত নির্দেশ অনুসারে মাটি দিয়ে বিশালাকার কালভৈরবের বিগ্রহ (মূর্তি) তৈরী করেন। নির্মাণের পর থেকে স্থানীয় ভক্তবৃন্দের সহায়তায় ১৯৭১ সাল পর্যন্ত নিয়মিতভাবে পূজা-অর্চনা হয়ে আসছিল। মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় কালভৈরবের বিগ্রহটি পাক হানাদার বাহিনী কর্তৃক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরে ড. মহানামব্রত ব্রহ্মচারী মহারাজ ও স্থানীয় মানুষের সহযোগিতায় আবারো ২৮ ফুট উঁচু শ্রী শ্রী কালভৈরব মূর্তি ও মন্দির পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়। 

শ্রী শ্রী কালভৈরব মন্দিরের বাম পাশে আলাদা ভবনে ১০৫ বছরের পুরনো ১১ কেজি ওজনের কষ্টি পাথরের শ্রী শ্রী কৈলাশ্বেশ্বর শিবলিঙ্গ রয়েছে। বিগ্রহ ছাড়াও প্রাচীনতম এই মন্দিরে আরো আছে দেবী পার্বতী, কালী মূর্তি, দূর্গামন্দির, সরস্বতী দেবী, শ্রী শ্রী কালভৈরব নাটমন্দির এবং দুইটি মঠ। প্রতিবছর বাংলা সালের ফাল্গুনী শুক্লা সপ্তমী তিথিতে এখানে ৪ দিনব্যাপী পূজা, হোমযজ্ঞ, মেলাসহ প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীর বিভিন্ন অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। তখন শ্রীলঙ্কা, ভারত, মালদ্বীপ, চীনসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে পূজারী, ভক্ত এবং দর্শনার্থীদের ভিড়ে মুখর হয়ে ওঠে কালভৈরব মন্দির প্রাঙ্গণ। মন্দিরটি পরিদর্শনের সময় দেখতে পেলাম দূরদূরান্ত থেকে মানুষ এসেছেন। কেউ এসেছেন মনবাঞ্ছা পূরণের নিমিত্তে। আবার কেউ  এসেছেন  মনবাঞ্ছা পূরণের পর পূজা দিতে।   

সনাতন ধর্মে বিশ্বাসীদের মতে, কালভৈরব হচ্ছেন সনাতন ধর্মালম্বীদের দেবতাবিশেষ। সংস্কৃত শব্দ 'ভৈরব'-এর অর্থ ভয়ঙ্কর বা ভয়াবহ। যা শিবের একটি হিংস্র প্রকাশ। এর সঙ্গে মৃত্যু ও বিনাশ সম্পর্কিত। তাই কালভৈরবকে মনে করা হয় মহাদেব শিবের রুদ্ররূপ। দুষ্ট শক্তির বিনাশ করতে মহাদেব এই রুদ্ররূপ ধারণ করেন। হিন্দু পুরাণ, বজ্রযানী বৌদ্ধ শাস্ত্র এবং জৈন ধর্মগ্রন্থগুলোর বক্তব্য অনুযায়ী, 'মহাজগতের বিশেষ স্থানগুলি ভৈরব রক্ষা করেন। ভৈরবের মোট সংখ্য ৬৪। তাদের আটটি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়। প্রতিটি শ্রেণির আবার একজন করে প্রধান ভৈরব রয়েছেন। প্রধান আট ভৈরবকে 'অষ্টাঙ্গ ভৈরব' বলা হয়। এই আটজন মহাবিশ্বের আটটি দিকের অধিপতি। এই আটজন আবার নিয়ন্ত্রিত হন মহাস্বর্ণ কালভৈরবের দ্বারা। তিনি সাধারণভাবে কালভৈরব নামেই পরিচিত।

কীভাবে যাবেন

ঢাকার সায়েদাবাদ কিংবা যাত্রাবাড়ি থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া রুটে চলাচলকারী বাসে চড়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল উপজেলাস্থ বিশ্বরোড আসা যায়। সরাইল বিশ্বরোড এসে রিকশায় বা স্থানীয় পরিবহণে মেড্ডা এলাকার অবস্থিত কালভৈরব মন্দির যেতে পারবেন।
 

তারা//

আরো পড়ুন  



সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়