ঢাকা     শনিবার   ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ||  মাঘ ২৪ ১৪৩২

Risingbd Online Bangla News Portal

‘দলে প্রত্যেক ক্রিকেটারের মধ্যে বড় কিছু পাওয়ার ক্ষুধা দেখি’

ইয়াসিন হাসান || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ০২:৫৭, ৩০ মে ২০১৯   আপডেট: ০৫:২২, ৩১ আগস্ট ২০২০
‘দলে প্রত্যেক ক্রিকেটারের মধ্যে বড় কিছু পাওয়ার ক্ষুধা দেখি’

লন্ডন থেকে ইয়াসিন হাসান : বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের সবচেয়ে ছোট জেলার ঘাস মাড়িয়ে তিনি বড় হয়েছেন। ধুলো গায়ে মেখে কেটেছে তার শৈশব-কৈশোর। স্রোতের প্রতিকূলে চিত্রা নদী পার হওয়া ছিল তার আরেক নেশা। সেই দস্যিপনার, ডানপিটে আর দুরন্ত ছেলেটার নাম মাশরাফি বিন মুর্তজা।

ঘরের মাঠে ২০১১ সালে বিশ্বকাপ স্বপ্ন নিষ্ঠুরভাবে চূর্ণ হওয়া সেই মাশরাফি দ্বিতীয়বারের মতো ১৬ কোটির নেতৃত্বের দায়িত্বে। বাংলাদেশের কোনো অধিনায়কের কপালে জোটেনি এমন ভাগ্য। নিজে ব্যক্তিগতভাবে অপেক্ষায় চতুর্থ বিশ্বকাপের। ক্রিকেটের অনেক অলি-গলি পেরিয়ে মাশরাফির দল এখন বিশ্বকাপের মঞ্চে। ক্রিকেটের ‘জন্মস্থান’ ইংল্যান্ডে আজ থেকে শুরু হচ্ছে বিশ্বকাপের দ্বাদশ আসর। বাংলাদেশ মাঠে নামবে দুদিন পর।

আয়ারল্যান্ডে ত্রিদেশীয় সিরিজে অংশগ্রহণ করতে যাওয়ার আগে রাইজিংবিডি’র এই প্রতিবেদকের মুখোমুখি হয়েছিলেন বাংলাদেশ দলের অধিনায়ক। দুজনের আলাপচারিতায় উঠে আসে বিশ্বকাপ নিয়ে অনেক কথা। একান্ত সাক্ষাৎকারের পুরোটাই পাঠকদের জন্য দেওয়া হলো:

আপনার প্রথম বিশ্বকাপ খেলার কথা মনে আছে? সেই ২০০৩ সালে...
মাশরাফি বিন মুর্তজা: হ্যাঁ, সব মনে আছে। ডারবানে কানাডার বিপক্ষে ম্যাচ। মনজু ভাই (মঞ্জুরুল ইসলাম) প্রথম ওভার করল। আমি দ্বিতীয় ওভার। ব্যাটসম্যান ছিল জন ডেভিসন। প্রথম বলেই চার খেয়েছিলাম। আমি ২ উইকেট পেয়েছিলাম ম্যাচে। সব মনে আছে।

চার বছর পর আবার ওয়ানডে বিশ্বকাপ, ব্যক্তিগতভাবে আপনি কতটা রোমাঞ্চিত?
মাশরাফি বিন মুর্তজা: রোমাঞ্চিত তো অবশ্যই। সাথে বড় দায়িত্ব অনুভব করছি। চার বছর পর আরেকটি বিশ্বকাপ। ওই বিশ্বকাপে আমরা ভালো করেছিলাম। শেষ চার বছর ভালো কেটেছিল। এবার সেই ধারাবাহিকতা ধরে রাখার পালা। একটা বিষয় যে আমরা চার বছর ভালো করেছি সেটা সবাই কম বেশি দেখেছে। এখন এখানে যদি ভালো করতে পারি, সেটা আরো ভালোভাবে মূল্যায়িত হবে।

২০১৯ বিশ্বকাপে হচ্ছে ১৯৯২ বিশ্বকাপের নিয়মে। লিগ পদ্ধতিতে। সবগুলো দল সবার সঙ্গে খেলবে। এটা কি বাংলাদেশের জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে গেল নাকি, গ্রুপ পর্বের লড়াই হলে বাংলাদেশের সম্ভাবনা বেশি থাকত
মাশরাফি বিন মুর্তজা: চ্যালেঞ্জ না আসলে...আমরা আগে যেটা করতাম, আমাদের প্রত্যাশিত জয়গুলো তো পেতামই। সাথে অন্য বড় দলের যেকোনো একটাকে হারাতাম। সেখান থেকে পরের স্টেজে। দেখেন ২০০৭ সালে ভারতকে হারালাম। উঠে গেলাম দ্বিতীয় পর্বে। ২০১১ সালে নেদারল্যান্ডস, আয়ারল্যান্ডকে হারানোর পর ইংল্যান্ডের বিপক্ষে জিতেছিলাম। যদিও সেবার দ্বিতীয় পর্বে যেতে পারিনি। তবুও বড় একটা দলকে হারিয়েছিলাম। ২০১৫ সালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে জিতে কোয়ার্টার ফাইনাল। ২০১৭ সালে চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে জিতে সেমিফাইনাল। বড় যেকোনো একটা দলকে হারালেই আমরা চলে যেতাম। এবার ম্যাচ বেশি। পরের রাউন্ডে যেতে হলে আমাদের বড় কয়েকটা দলকে হারাতে হবে। তাই সেভাবে চ্যালেঞ্জ বলতে কিছু নেই। আমরা জিততেই মাঠে নামব।
 


বিশ্বকাপের সূচিতে শুরুতে বাংলাদেশের কম বিরতিতে টানা ম্যাচ। শেষ দিকে আবার লম্বা বিরতি। এটা কি ভালো হলো নাকি খারাপ?
মাশরাফি বিন মুর্তজা: আমার কাছে মনে হয় এটা খানিকটা উদ্বেগের জায়গা। আমার সাথে বিপিএলে অ্যালেক্স হেলস দলে ছিল। ও আমায় বলেছিল ইংল্যান্ডে পরের দিকে বল স্পিন করা শুরু করবে। আর স্পিন করা শুরু করলে আমাদের একটা সুবিধা সব সময়ই থাকে। এমনকি পেসাররাও সুবিধা পেত। কাটারগুলো ধরত। বৈচিত্র্য থাকত। শুরুর দিকে ফ্ল্যাট উইকেট থাকবে। আর শেষ দিকে আমরা খেলব তাদের সাথে যাদের স্পিন আক্রমণ ভালো। পাকিস্তান, ভারত আছে। কথার কথা, যদি শুরুতে নিউজিল্যান্ড, সাউথ আফ্রিকার বদলে যদি এখানকার কেউ...আবার শেষ দিকে ওদের কেউ থাকত, তাহলে আমাদের সুবিধা হতো।

শুরুতে আমাদের কিছু টানা ম্যাচ। আবার প্রতিপক্ষগুলোও কঠিন। দক্ষিণ আফ্রিকা, নিউজিল্যান্ড, ইংল্যান্ড। তিনটা দলই কঠিন ও শক্তিশালী। আমরা ৭ দিনে এই তিনটি ম্যাচ খেলে ফেলব। তবুও বড় কোনো সমস্যা দেখছি না। সুযোগ অবশ্যই থাকবে, সেগুলো কাজে লাগাতে হবে।

যদি সেমিফাইনাল কিংবা ফাইনাল খেলে বাংলাদেশ। তাহলে প্রায় সোয়া দুই মাসের বিদেশ সফর। দেশের বাইরে এত লম্বা সময় কাটানো এবং মনোযোগ ধরে রাখা কতটা গুরুত্বপূর্ণ...
মাশরাফি বিন মুর্তজা: এটা সবাই ব্যক্তিগতভাবে নিয়ন্ত্রণ করবে। আমরা সবাই পেশাদার ক্রিকেটার। মনোযোগ সরে যাওয়া কোনো অজুহাত হতে পারে না। হ্যাঁ, হোম সিকনেস কাজ করবে এটা স্বাভাবিক। কিন্তু মাঠের পরিবেশ ভিন্ন। এখানে সবাই জানে যে তাদের ব্যক্তিগত কাজ কী।

আপনি মাঠের ভেতর যেভাবে সামলে নেন, মাঠের বাইরেও আপনি নেতা। সবাইকে দেখভাল করেন। সবাইকে সঙ্গে নিয়ে চলেন। এ সফরে তো মনে হচ্ছে আপনার ওপর দিয়ে ঝড়-ই যাবে!
মাশরাফি বিন মুর্তজা: নাহ সেরকম কিছু না। প্রত্যেক সফর যেভাবে হবে এটাও সেকরম। আমার রুমে আড্ডা হবে। এইতো। সবাই তো চলাচল একসঙ্গেই করে। তাই সেভাবে কোনো সমস্যা হবে না।

২০১৫ বিশ্বকাপ ও ২০১৭ চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে দুবারই আপনারা ভারতের কাছে হেরেছেন। আবার এশিয়া কাপেও দুবার। আসলে বড় মঞ্চে বাংলাদেশ ভারতের বিপক্ষে পেরে ওঠে না কেন
মাশরাফি বিন মুর্তজা: আমরা পারি না সেটা ভুল। আমরা আসলে ভারতের বিপক্ষে জয়ে অভ্যস্ত নই। একবার অভ্যস্ত হয়ে গেলে তখন সব কিছুই আবার ইতিবাচক হবে। তখন আপনা আপনি জয় আসবে। সেটা সিরিজে হোক আর বড় কোনো মঞ্চে। যেসব কারণে আমরা ভারতের বিপক্ষে বড় মঞ্চে হেরেছি সেগুলো সবগুলোই ক্ষুদ্র ভুল। বড় মঞ্চে আপনি কোনো সময়ই ছোট ভুল করতে পারবেন না। আবার অনেক সময় দেখা যায় ভুল করলে রিকোভার হয়ে যায়। কিন্তু আমরা যে সময় ভুল করেছি সেগুলো রিকোভার করতে পারিনি। হয়তো সুযোগও ছিল না।

২০১৫ বিশ্বকাপে কিছু সিদ্ধান্ত যেগুলো বাংলাদেশের বিপক্ষে গেছে, সেসব অতীত হয়ে গেছে নিশ্চয়। কিন্তু বিশ্বকাপে নামার আগে কি আবার মাথায় ঘুরপাক খাবে সেসব ব্যাপার?
মাশরাফি বিন মুর্তজা: আমি আসলে অতীত মনে রাখি না। প্রয়োজনও পড়ে না অতীত মনে রাখার। আমি বর্তমানে বিশ্বাস করি। সবাইকে বলব এখন কী হচ্ছে সেটা নিয়েই যেন চিন্তা করে। অতীত ভাবলে কষ্ট বাড়বে। সামনে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে না।

২০১৫ বিশ্বকাপে ভালো করে আপনি কিংবা আপনার দল ক্ষুধা বাড়িয়েছে, জয়ের ক্ষুধা। এবার কি শিরোপা দিয়ে সেই ক্ষুধা মেটানো যাবে? 
মাশরাফি বিন মুর্তজা: শিরোপা হবে কি হবে না, জানি না। তবে আমরা আমাদের সর্বোচ্চটা দিয়ে চেষ্টা করব। আমি এ দলে প্রত্যেক ক্রিকেটারের মধ্যে বড় কিছু পাওয়ার ক্ষুধা দেখি। আমারও একই ক্ষুধা আছে। কিন্তু আমরা এখনই অতসব নিয়ে ভাবছি না। ওয়ার্ল্ডকাপ জেতা তো অত সহজ নয়। অনেক বড় দলই এখনো পারেনি। অনেক প্রসেসের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। আমরা সেই প্রসেসটা মেইন্টেইন করতে চাই। নিজেদের স্বাভাবিক খেলা যদি খেলতে পারি তাহলে লাইনে থাকব। যদি বাড়তি চিন্তা করে চাপ বাড়াই তাহলে লাইনের বাইরে চলে যাব। তাই অল্প অল্প করে এগোনো ভালো।
 


২০১৫ বিশ্বকাপের পর ৫৮ ওয়ানডেতে ৩০ জয়। ২৫ পরাজয়, ৩ ড্র। পরিসংখ্যান বলছে বাংলাদেশ যতটা ধারাবাহিক আবার ততটাই অধারাবাহিক। জয়-পরাজয়ের পরিসংখ্যানে খুব পার্থক্য নেই... (ত্রিদেশীয় সিরিজের আগ পর্যন্ত)
মাশরাফি বিন মুর্তজা: এটা আসলে এই মুহূর্তে খুব বেশি মেটার করছে না। জয়-পরাজয়ের যে পরিসংখ্যান বলছেন তা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এখন আমরা যেভাবে এগিয়ে যাচ্ছি সেই প্রসেসটা আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। ছেলেরা এখন ধারাবাহিক আছে। সেটা বড় পাওয়া।

দেশের মাটিতে পাকিস্তান, ভারত, দক্ষিণ আফ্রিকা, জিম্বাবুয়ে, আফগানিস্তানের বিপক্ষে সিরিজ জয়। আবার বিদেশের মাটিতে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে হারিয়েছেন, নিউজিল্যান্ডকে দুবার হারিরেছেন। ঘরের সুবিধা নিয়ে প্রতিপক্ষকে হারানো সহজ। কিন্তু বিদেশে সাফল্য খুব নেই। এবার সেই ইতিহাস বদলাবে
মাশরাফি বিন মুর্তজা: বিদেশে সাফল্য একেবারেই কম সেটা ভাবা আসলে ভুল। হ্যাঁ, আমরা ঘরের মাঠে যেই সাপোর্ট পাই  সেটা বিদেশে গেলে অন্য দল নেয়। তাই পারফরম্যান্সে ওঠা-নামা আছে। বিশ্ব ক্রিকেটে এখন প্রত্যেক দলই বিদেশের মাটিতে ভোগে। এটা নতুন নয়। আমরা জয়ের অভ্যাস করেছি সেটা খুব বেশিদিনের নয়। হয়তো দেশের মাটিতে টানা সাফল্য আছে। একটা সময় এই ধারাবাহিকতা বিদেশেও থাকবে।

আরেকটা জিনিস দেখেন, ভারত কিন্তু সম্প্রতি অ্যাওয়ে সিরিজ জিতছে। বিশেষ করে কুলদীপ ও চাহাল আসার পর থেকে তারা কিছুটা জিতছে। কিন্তু বিশ্বকাপ ও চ্যাম্পিয়নস ট্রফি বাদে অ্যাওয়ে সিরিজে কিন্তু ভারতও ভুগছে। অ্যাওয়ে সিরিজ জিততে হলে এক্স ফ্যাক্টরের প্রয়োজন হয়। এটা ভারতের এখন আছে। আর কোনো দলের ওই এক্স-ফ্যাক্টর নাই। বিশ্বকাপে আপনি ইংল্যান্ডকে ফেবারিট বলছেন স্বাগতিক বলে। এ ছাড়া ভারতকে যেই কন্ডিশন কিংবা উইকেটই দেন না কেন, তারা ফেবারিট থাকবে এ দুই স্পিনারের জন্য।

বিশ্বকাপে বাংলাদেশের সম্ভাবনা?
মাশরাফি বিন মুর্তজা: বাংলাদেশ অনেক ভালো করবে এর থেকে বেশি কিছু বলতে পারছি না। তবে আমি কোনো অনিশ্চয়তার ওপর থাকতে চাই না। দেখুন চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে যদি বৃষ্টি না হতো তাহলে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ম্যাচের ফল পক্ষে নাও আসতে পারত। তাহলে সেমিফাইনাল খেলাও অনিশ্চিত থাকত। আবার বিশ্বকাপেও ২০১৫ সালের ম্যাচে অস্ট্রেলিয়ার সাথে পয়েন্ট ভাগাভাগি। এই ধরনের পরিস্থিতিতে আমি যেতে চাই না। ভাগ্যের প্রয়োজন হয়। ভালো খেলতে হবে সেই প্রত্যাশা করছি।

বিশ্বকাপে এটাই কি বাংলাদেশের সেরা দল হতে যাচ্ছে?
মাশরাফি বিন মুর্তজা: এটা এ সময়ের সেরা দল। যেই বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত যারাই গিয়েছে সেটাই ছিল সেরা দল। দেশের সেরা ১১ জন দেশকে প্রতিনিধিত্ব করেছে। এখন যারা আছে তারা এ সময়ের সেরা।

পরিণত বাংলাদেশ বললে ভুল হবে না। আপনারা সিনিয়র পাঁচজন একসঙ্গে একশরও বেশি ম্যাচ একসঙ্গে খেলেছেন। এখন লিটন, সাব্বির, সৌম্য, মুস্তাফিজরা একসঙ্গে ম্যাচ খেলছেন। রুবেলও আছে। পারস্পরিক বোঝাপড়াটা ভালো। তাতে কি সম্ভাবনা জোরালো হচ্ছে না?
মাশরাফি বিন মুর্তজা: চাওয়াটা আসলে কোন পর্যায়ের সেটা বুঝতে পারছি না...চাওয়াটা যদি হয় নকআউট স্টেজ তাহলে একরকম। আর যদি হয় বিশ্বকাপ তাহলে আরেকরকম। আপনি শুধু ভালো খেলবেন তাহলে আরেক রকম। আমি সত্যি বলতে ভালো খেলার পক্ষে। ভালো খেললে আসলে আপনার চাওয়াটাতে আস্তে আস্তে পৌঁছানো যাবে।
 


বড় মঞ্চে বাংলাদেশ পারফর্ম করতে পারে না- এরকম অপবাদ বলুন আর অভিযোগ, ২০১৫ বিশ্বকাপের আগে লেগেই ছিল। সেটা আপনার দল অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ড বিশ্বকাপে মিটিয়ে দিয়েছে। ২০১৭ চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে সেই ধারাবাহিকতা ছিল। নিদাহাস ট্রফিতে যদিও আপনি ছিলেন না, সেখানেও ছিল। আবার দুবাইয়ে এশিয়া কাপেও ছিল। ইংল্যান্ডে প্রমাণের কিছু নেই। তবুও কি মনে হচ্ছে জয়ের ধারাবাহিকতা দেখানোর এটাই হবে সেরা মঞ্চ।
মাশরাফি বিন মুর্তজা: অবশ্যই। দেখুন কয়েক বছর আগেও কিন্তু আমাদের নিয়ে বিশ্লেষণ করার কিছু তেমন ছিল না। কিন্তু আমরা এখন ভয়ডরহীন ক্রিকেট খেলছি। আমাদের তরুণরা প্রতিরোধের বদলে প্রতিশোধ নিচ্ছে। এটা হচ্ছে দলের সবচেয়ে বড় শক্তির জায়গা। আমরা বড় দল হতে পারিনি কিন্তু আমরা ওই প্রসেসে আছি। আমরা বলে-কয়ে যেকোনো দলকে হারাতে পারি, কারণ আমরা ওই সামর্থ্য রাখি। এগুলো আমরা করে দেখিয়েছি। জয়ের যে ধারাবাহিকতা আছে সেটা বিশ্বকাপের মঞ্চে তুলে ধরতে পারলে অবশ্যই আমরা এগিয়ে যাব। প্রতিপক্ষরা আমাদের নিয়ে চিন্তা করছে। ক্রিকেটবোদ্ধারা তাদের মূল্যবান মতামত দিচ্ছেন। এগুলো সব ইতিবাচক বাংলাদেশ ক্রিকেটের জন্য।

ব্যক্তিগত পারফরম্যান্সে আসি, বিশ্বকাপে মাশরাফির ট্রামকার্ড কে?
মাশরাফি বিন মুর্তজা: একজনের ওপর আমি আসলে মোটেও নির্ভর নই। মুস্তাফিজ, সৌম্য, লিটন, সাব্বিরকে ভালো করতেই হবে। আবার আমরা যারা আছি তামিম, সাকিব, মুশফিক... এরা সবাই ভালো এবং ইনফর্মে। রিয়াদও আছে। ওরা সবাই ভালো করবে আমার বিশ্বাস।

২০১৫ বিশ্বকাপ থেকে শুরু। সৌম্যকে আপনি শেষ চার বছরে যতটা আত্মবিশ্বাস দিয়েছেন সেটা হয়তো অন্য কেউ তাকে দেয়নি। যতবার আপনি তাকে সমর্থন দিয়েছেন সেটা ঠিকঠাক হয়তো করতে পারেনি। এবার তার কাছ থেকে বিশ্বমঞ্চে আপনি কি চাইবেন?
মাশরাফি বিন মুর্তজা: সৌম্য যেদিন খেলবে সেদিন অন্যরা দর্শক হয়ে থাকবে। ও ওর মতো খেলুক, রান করুক। চাপমুক্ত থাকলে ভালো খেলতে পারবে এমনটাই আমার বিশ্বাস।

কিছুদিন আগে বলেছেন লিটন ‘ম্যাসিভ ডেসট্রয়’ করবে। এ বিশ্বাস আপনার আছে? খুব কাছ থেকে লিটনকে দেখছেন। তার মধ্যে এ বিশ্বাসটা কতটুকু আছে?
মাশরাফি বিন মুর্তজা: ওর মধ্যে দৃঢ়চেতা একটা গুণ আছে। লণ্ডভণ্ড করে দিতে পারে সেরকম একটা ব্যাপার আছে। আপনার এশিয়া কাপের ফাইনালে ওর ব্যাটিং দেখেছেন। ও চাইলে সেদিন আরো অনেক রান করতে পারত। হয়তো সঙ্গী পায়নি...একটা সময় শট খেলা কমিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু ও এরকমই। এভাবেই ব্যাটিং করবে। আর বিশ্বাসের কথা যেটা বললেন, ও নিজে জানে ও কতটুকু সামর্থ্য রাখে।

আর মুস্তাফিজ। ২০১৫ বিশ্বকাপের পর তো বাংলাদেশের সবচেয়ে হট ফেবারিট মুস্তাফিজ। যদি এক কথায় বলতে হয় মুস্তাফিজের থেকে আপনার প্রত্যাশা, তাহলে কী বলবেন?
মাশরাফি বিন মুর্তজা: ও সুস্থ হয়ে দলে থাকুক এর চেয়ে বেশি কিছু ওর থেকে আপাতত চাই না। আমাদের স্ট্রাইক বোলার। মাঠে ওর উপস্থিতি মেটার করবে। বিশ্বকাপের পুরো সফরে ও সুস্থ ও ফিট থাকলে ওর থেকে আপনা আপনি অনেক কিছু পাওয়া যাবে।

সাব্বিরকে দলে ফেরাতে কম জল ঘোলা হয়নি। এক সাক্ষাৎকারে আপনি সব দায় দায়িত্ব নিয়েছেন। নিউজিল্যান্ডে সেঞ্চুরি করে মান রেখেছে। তার থেকে আপনার ব্যক্তিগত চাওয়া?
মাশরাফি বিন মুর্তজা: সাব্বির কী করতে পারে হয়তো ক্ষেত্র বিশেষে দেখিয়েছে। সেগুলো থেকেও বেশিকিছু সে দিতে পারে। এবারের বিশ্বকাপে এমন কিছু সাব্বির করুক যেটা মানুষ মনে রাখবে, এমনটাই প্রত্যাশা করছি।

এ দলটির শক্তির জায়গা?
মাশরাফি বিন মুর্তজা: দলটির ঐক্য ও ছাড় না দেওয়ার মানসিকতা।
 


আর দুর্বল জায়গা?
মাশরাফি বিন মুর্তজা: আসলে অনেক কিছু নিয়েই অনেক কাজ করার আছে।

আপনার বোলিং নিয়ে যদি বলি, শেষ চার বছরে ৫৬ ম্যাচে ৬৯ উইকেট পেয়েছেন। বাংলাদেশের পক্ষে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। বিশ্বে স্পিন, পেস মিলিয়ে ১৫তম, শুধু পেসারদের মধ্যে অষ্টম। বয়স বাড়ার সাথে সাথে আপনার উইকেট ক্ষুধাও বাড়ছে। এ বিশ্বকাপে কি এমন কোনো ল্যান্ডমার্ক তৈরি করতে চান যেখানে আপনার শ্রেষ্ঠত্ব আরো দৃঢ়ভাবে ফুটে উঠবে?
মাশরাফি বিন মুর্তজা: ব্যক্তিগতভাবে আমার কোনো লক্ষ্য নেই। যেটা বললেন ইফেকটিভ বোলিং...এটা আমার এক নম্বর চাওয়া। ব্যক্তিগতভাবে আমি যা দেখি, বিশ্বকাপ জিতে আসলে, দল খুশি, বাংলাদেশের সবাই খুশি হবে ভালো কিছু করে আসলে। আমার ব্যক্তিগত চাওয়াই থাকবে প্রত্যেক ম্যাচে ইমপ্যাক্ট বোলিং। গ্যারান্টি তো নেই কিছুরই। তবুও চেষ্টা থাকবে যে ভালো কিছু করেই যেন বিশ্বকাপ থেকে ফিরতে পারি।

এবার নিয়ে চারটি বিশ্বকাপ হচ্ছে। ২০১১ বিশ্বকাপ খেলার সুযোগ পেলে পাঁচটি হয়ে যেত। তখন কেঁদেছিলেন। এখন কি আফসোস হচ্ছে না। পাঁচটি বিশ্বকাপ হলে তো ক্রিকেটের কিংবদন্তিদের পাশে আপনার নাম থাকত...
মাশরাফি বিন মুর্তজা: নাহ, এখন আর ওসব নিয়ে একটুও ভাবি না। হ্যাঁ, ২০১১ বিশ্বকাপ খেলতে পারলে ভালো লাগত। কিন্তু যেহেতু হয়নি তাই ওভাবে চিন্তা করেও কোনো লাভ নেই এখন।

আপনাদের চারজনের চতুর্থ বিশ্বকাপ। মাহমুদউল্লাহর তৃতীয়। এটাই কি আপনারদের দেওয়ার শ্রেষ্ঠ সময়?
মাশরাফি বিন মুর্তজা: আমাদের পারফরম্যান্সের ওপর অনেক কিছু নির্ভর করবে এটা ঠিক। কিন্তু সব কিছুতেই যে আমরা সফল হব এটা ভুল। কোনো কিছুর নিশ্চয়তা নেই। আমরা সিনিয়র বলে অবশ্যই এক স্টেপ ফরোয়ার্ড হয়ে দায়িত্বটা নেব ঠিকই। আমি মনে করি আমাদের প্রত্যেকের এ বিশ্বকাপ ভিন্ন ইমেজ তৈরি করবে। আমরা শেষ চার বছর কি করেছি, পরবর্তীতে কোথায় যাচ্ছি এগুলো ঠিক হয়ে যাবে এ বিশ্বকাপে।




রাইজিংবিডি/লন্ডন (ইংল্যান্ড)/৩০ মে ২০১৯/ইয়াসিন/পরাগ

রাইজিংবিডি.কম

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়