ঢাকা, মঙ্গলবার, ১২ আষাঢ় ১৪২৬, ২৫ জুন ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

আমাদের বইমেলা, আমাদের লেখক-পাঠক

ফারুক সুমন : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৯-০২-০৬ ১:৩৯:৪০ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৯-০৪-০৪ ১:২২:২০ পিএম
Walton AC 10% Discount

ফারুক সুমন: শিল্প-সাহিত্যের উৎকর্ষ এবং ব্যাপ্তি একটি জাতির রুচির পরিচয় বহন করে। শিল্প-সাহিত্য যেহেতু প্রধানত ভাষাকে আশ্রয় করে উদ্ভাসিত হয় সেহেতু এক্ষেত্রে ভাষার সমৃদ্ধিও গুরুত্বপূর্ণ। বাংলা ভাষার যে গৌরবোজ্জ্বল ঐতিহাসিক পরম্পরা রয়েছে তার কেন্দ্রে বিশ্বমানের শিল্পফসল। আমাদের কবিতা, আমাদের গল্প, আমাদের উপন্যাস, আমাদের নাটক, আমাদের মূলধারার চলচ্চিত্র আমি বলবো ইতোমধ্যে অগ্রগতির পথেই এগিয়ে যাচ্ছে। অনেকেই হয়তো দ্বিমত পোষণ করতে পারেন। কিন্তু বিশ্বায়ন এবং বিশ্ব-রাজনীতির কাছে আমাদের সাহিত্যও উপেক্ষিত। নোবেল পুরস্কার পাওয়ার মতো শিল্পসম্ভার থাকা সত্ত্বেও কেবল মিডিয়ার মারপ্যাঁচ এবং সমৃদ্ধ অনুবাদের দীনতার কারণে আমাদের শিল্পসাহিত্যের সন্ধান এখনো বিশ্ব-দরবারে সেভাবে পৌঁছেনি।

প্রতিবছর ফেব্রুয়ারি মাসে আমাদের আবেগ স্থির হয়ে যায় মাতৃভাষার কল্যাণে। কারণ এই মাসের একুশ তারিখ আমাদের মাতৃভাষা দিবস। সর্বস্তরে ভাষার ব্যবহার এবং ভাষার মান রক্ষায় আমরা কলরব করি। এছাড়া ‘একুশ আমার পরিচয়’-এই স্লোগানকে বুকে ধারণ করে ১৯৮৪ সাল থেকে নিয়মিত রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় গ্রন্থমেলার আয়োজন হয়ে আসছে। ফলে আমাদের লেখক-পাঠকের মনে এই সময়ে একধরনের চাঞ্চল্য তৈরি হয়। গ্রন্থমেলাকে কেন্দ্র করে লেখকদের বইপ্রকাশ এবং পাঠকদের বই ক্রয় একটা লক্ষণীয় রেওয়াজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তুলনামূলক বছরের অন্য সময়ে বই ক্রয় কিংবা প্রকাশের চিত্র খুব সামান্য। এতে কী বোঝা যায়? আমাদের বইপ্রকাশ এবং বইয়ের পাঠক তবে মৌসুমনির্ভর? এক্ষেত্রে মনে হয় বইপড়ার মতো জনরুচি আমাদের লেখকগণ তৈরি করতে ব্যর্থ হয়েছেন।

প্রতিবছর বইমেলাকেন্দ্রিক বই প্রকাশের যে হিড়িক তৈরি হয় এটাকে অনেকেই নেতিবাচক ভাবে দেখেন। আদতে বছরজুড়ে বই প্রকাশের চল থাকলে বোধহয় এমনটি মনে হতো না। লেখক কিংবা প্রকাশক উভয়েই ফেব্রুয়ারি মাসের আশায় বসে থাকেন। অপরদিকে পাঠকের মনেও এমন ধারণা তৈরি হয়েছে যে, বইমেলা ছাড়া নতুন বই খুব একটা প্রকাশ হয় না। এই ত্রিমাত্রিক সমস্যা থেকে বেরিয়ে আসা দরকার। বছরজুড়ে বই একেবারেই যে প্রকাশিত হচ্ছে না তেমন নয়। তবে বইমেলার মৌসুমের তুলনায় একেবারেই নগন্য। তবে হ্যাঁ, বইমেলাকে কেবল বই বেচাকেনার উৎসব হিসেবে বিবেচনা করলে অন্যায় হবে। কারণ বইমেলাকে কেন্দ্র করে একধরনের সাংস্কৃতিক উৎসবের পরিবেশ তৈরি হয়। প্রায় সববয়সী মানুষের সমাগম থাকে বইমেলায়। বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষ বাঙালির ঐতিহ্য ঘনিষ্ঠ পোশাক পরে মেলায় আসেন। সাংস্কৃতিক নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন থাকে মেলা চত্বরে। ফলে বাঙালির নিজস্ব সংস্কৃতির একটা বারতা দেশময় ছড়িয়ে পড়ে। এমনকি বিশ্ব-পরিমণ্ডলে আমাদের প্রাণের মেলার সৌরভ ছড়িয়ে পড়ে। একমাত্র বইমেলা উপলক্ষে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বইপ্রেমীরা ঢাকা আসেন। শিশুকিশোর কিংবা তরুণ-তরুণীরা তাদের অভিভাবকদের কাছে মেলায় যাবার বায়না ধরে।

বইয়ের প্রতি, বইপড়ার প্রতি আগ্রহ তৈরি করা জরুরি। ভালো বই আছে কিন্তু পাঠক নেই, এটা লেখক কিংবা প্রকাশকের জন্যে সুখকর নয়। বইপড়ার অভ্যাস শৈশব থেকেই তৈরি করতে হবে। আমাদের ছেলেমেয়েদের বই পাঠে উৎসাহী করা আমাদের নিজেদের দায়িত্ব। স্কুল কলেজ পড়ুয়া ছাত্রছাত্রীদের মনে আমরা কেবল ভালো জিপিএ অর্জনের প্রতি প্রণোদনা দিয়ে যাচ্ছি। এ কারণে তারা অতিমাত্রায় পাঠ্যবই নির্ভর হয়ে উঠছে। এর বাইরে তারা যেটুকু সময় পাচ্ছে নিজেদের ভার্সুয়াল পৃথিবীতে ভাসিয়ে দিচ্ছে। ইন্টারনেট আসক্তি আমাদের ছেলেমেয়েদের সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিচ্ছে। আমাদের অভিভাবকগণ প্রথমত এর জন্যে দায়ী। কারণ শৈশব কৈশোরে তারা ওদের হাতে ৫০০ টাকা দামের খেলনা ধরিয়ে দিলেও বই কেনার জন্য ৫০০ টাকা বরাদ্দ রাখেন না। কারণ বই কেনার জন্যে যে যৎসামান্য টাকা খরচ হবে এটাকে আমরা অপচয় মনে করি।

আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে সমৃদ্ধ গ্রন্থাগার নেই। যদিও বা আছে, ছাত্রছাত্রীদের সেখানে আনাগোনা নেই বললেই চলে। কারণ ওদের মনে সারাক্ষণই এ-প্লাস অর্জনের আতঙ্ক। ক্লাস আর বাণিজ্যিক কোচিংয়ে যাওয়া আসায় দিন শেষ। অথচ আমারা যদি সভ্য, মানবিক একটি প্রজন্ম তৈরি করতে চাই তবে এদেরকে অবশ্যই পাঠ্যপুস্তকের বাইরে বইপড়ার প্রতি আগ্রহী করে তুলতে হবে। সম্প্রতি দেশের কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগার পরিদর্শনের অভিজ্ঞতা থেকে বলছি। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থীরা গ্রন্থাগারে বসেই চাকরির প্রস্তুতিমূলক পড়াশোনা করছে। যেখানে বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া তরুণ তরুণীরা সৃজনশীল কিংবা উদ্ভাবনী পড়াশোনা নিয়ে উচ্চতর পঠনপাঠনে ব্যস্ত থাকার কথা। সেখানে তারা পত্রিকা পড়ে কিংবা সাধারণ জ্ঞানের শর্টকাট বইয়ে মুখ গুঁজে পড়ে আছে।

মূলত আমাদের পাঠকের মৃত্যু ঘটে শৈশবে। শৈশবে পাঠাভ্যাস গড়ে তোলা না গেলে পরে আর হয় না। বড় হয়ে বইপড়াকে তারা সময় ও অর্থের অপচয় মনে করে। বইয়ের সৌরভ থেকে আমৃত্যু তারা বঞ্চিত থাকে। বই বর্জিত মানুষের সুখ-দুঃখের প্রকাশ তাই বর্ণহীন। নিজের ভেতরে মর্মগত কোনো ভুবন তাদের থাকে না। ফলে তারা স্বভাবে অমানবিক কিংবা রুঢ় মনোভঙ্গির হয়ে থাকে। বইপড়ার প্রতি আগ্রহ তৈরিতে অভিভাবকের পাশাপাশি আমাদের শিক্ষক সমাজের রয়েছে বড় দায়বদ্ধতা। কিন্তু এখানে আমরা একটা বড় হতাশার দৃশ্য দেখতে পাবো। কেবল সাহিত্যের কোনো কোনো শিক্ষক বইপড়ার প্রতি শিক্ষার্থীদের প্রণোদিত করলেও অন্য বিষয়ের শিক্ষকগণ এক্ষেত্রে ভীষণ শৈথিল্য প্রদর্শন করেন। একজন বিজ্ঞানের শিক্ষক মনে করেন বিজ্ঞানের বাইরে পড়া মানেই গল্প উপন্যাস। একজন ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগের শিক্ষকও অনুরূপ ধারণা পোষণ করেন। অবশ্য এঁদের মধ্যে ব্যতিক্রমও আছেন যারা গ্রন্থানুরাগী। আমাদের শিক্ষক এবং অভিভাবক শিক্ষার্থীদের ভালো জিপিএ অর্জনে গুরুত্বারোপ করেন সে তুলনায় বইপড়ায় ততোটা নয়।

বইমেলায় যাদের গমনাগমন দেখা যায়, তাদের মধ্যে বেশির ভাগ দর্শনার্থী। দীর্ঘক্ষণ ঘুরাঘুরি শেষে বই না কিনে মেলাচত্বর ত্যাগ করেন। আপাত দৃষ্টিতে কিছুটা অশোভন দেখালেও মেলা কর্তৃপক্ষ একটি শর্ত আরোপ করতে পারেন। মেলাচত্বর ত্যাগ করার সময় প্রত্যেকের হাতে ক্রয়কৃত কমপক্ষে একটি বই বাধ্যতামূলক থাকতে হবে। মেলায় সবচে বেশি বিক্রি হয় মুষ্টিমেয় জনপ্রিয় কিছু লেখকের বই। এক্ষেত্রে নতুন লেখকগণ যতই ভালো লিখুন না কেন পাঠকের কাছে তাঁরা থাকেন অচেনা অজানা। নতুন লেখকদের পাঠের সাথে পাঠকদের পরিচয় করিয়ে দেওয়ার জন্যে বেশি বেশি উদ্যোগ নেওয়া দরকার। এতে যেমন নতুন লেখকের বইয়ের প্রতি পাঠকের আগ্রহ বাড়বে তেমনই নবীন লেখকরাও উৎসাহ বোধ করবেন। সর্বোপরি অমর একুশে গ্রন্থমেলা আমাদের শিল্প-সাহিত্য এবং সংস্কৃতির প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। মেলাকেন্দ্রিক নতুন বইয়ের গন্ধে বিভোর হয়ে লেখক-পাঠকের মাঝে যে উন্মাদনা সঞ্চারিত হয় তা সারা বছর প্রবহমান থাকুক।




রাইজিংবিডি/ঢাকা/৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৯/তারা

Walton AC
     
Walton AC
Marcel Fridge