ঢাকা, শনিবার, ১০ আষাঢ় ১৪২৪, ২৪ জুন ২০১৭
Risingbd
সর্বশেষ:

‘লিচু’ অর্থনৈতিক চিত্র পাল্টে দিয়েছে

মো. আনোয়ার হোসেন শাহীন : রাইজিংবিডি ডট কম
 
   
প্রকাশ: ২০১৭-০৫-১৫ ১:১১:৩২ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৭-০৫-১৫ ১:১১:৩২ পিএম

মো. আনোয়ার হোসেন শাহীন, মাগুরা : পৈত্রিক সূত্রে পাওয়া ষাট শতক জমিতে লিচুর বাগান করে বছরে আড়াই থেকে তিন লাখ টাকা আয় করছেন মাগুরা সদর উপজেলার আবু তালেব (৫৫)।

দশ বছর আগেও এই জমি থেকে এতো আয় হতো না তার।পাটের আবাদ করে  মাত্র ৫-৭ হাজার টাকা আয় হতো। কেবল আবু তালেবই নয়, মাগুরা সদর উপজেলার তিনটি ইউনিয়নের ত্রিশটি গ্রামের প্রায় কুড়ি হাজার চাষি লিচুর আবাদ করে সাবলম্বী হয়েছেন। ‘লিচু’ পাল্টে দিয়েছে এই জনপদের অর্থনৈতিক চিত্র।

ঢাকা থেকে আসা ব্যাপারী আমির হোসেন  এ বছর মাগুরার হাজরাপুর ইউনিয়নে ১০ লাখ টাকা দিয়ে ৬টি লিচুর বাগান কিনেছেন। ইতিমধ্যে তিনি ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ৫ লাখ টাকার লিচু চালান করেছেন।

একই ভাবে স্থানীয় ইছাখাদার নিশিকান্ত মন্ডল, রাজবাড়ির সাইদ মন্ডল ও রায়হান ব্যাপারী বাগান ঘুরে ঘুরে প্রতি হাজার লিচু দেড় থেকে দু’ হাজার টাকা দরে কিনে ঢাকা, সিলেট, বরিশালসহ দেশের বিভিন্নস্থানে চালান করেছেন। তারা প্রত্যেকেই বিগত ১৫ দিনে ৮ থেকে ১০ লাখ টাকার লিচু কিনেছেন।

এ এলাকার দুই হাজার বাগানের লক্ষাধিক গাছ থেকে এবার প্রায় ২০ কোটি টাকার লিচু বিক্রি হবে বলে হাজরাপুর এলাকার লিচু চাষিরা জানান।

হাজরাপুর ইউনিয়নের ইছাখাদা বাজারে হাইওয়ে সড়কে গিয়ে দেখা যায়, দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আসা ব্যাপারীরা লিচুর ট্রাক লোড করছেন। প্রতিদিন এখান থেকে ৪ থেকে ৬ ট্রাক লিচু দেশের বিভিন্ন স্থানে যাচ্ছে। স্থানীয় বাজারেও উঠতে শুরু করেছে লিচু। খুচরা বাজারে লিচুর দামও বেশ ভাল।

লিচু কিনতে আসা ব্যাপারীরা জানান, রসালো ও সুস্বাদু হওয়ায় মাগুরার হাজরাপুরের লিচুর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। বিশেষ করে অন্যান্য এলাকার চেয়ে এখানকার লিচু কমপক্ষে ১৫ দিন আগে পাকে বলেই ক্রেতা-বিক্রেতাদের কাছে এর চাহিদা বেশ।

ইছাখাদা গ্রামের আব্দুল হালিম জানান, ১৯৯৪ সালে তিনি বাড়ির আঙ্গিনায় মাত্র ১০টি লিচু গাছ লাগিয়েছিলেন। বাণিজ্যিকভাবে লাভবান হওয়ায় এখন তার লিচু গাছের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে দেড় শতাধিক। মোট বাগানের সংখ্যা তিনটি। যা থেকে তিনি প্রতি বছর কমপক্ষে দু’লাখ টাকার লিচু বিক্রি করে থাকেন। এ বছর তিনি ১০০ গাছের লিচু বিক্রি করেছেন দেড় লাখ টাকায়। এই লিচু চাষই তাদের পরিবারের ভাগ্য বদলে দিয়েছে।

একইভাবে ইছাখাদার আবু জাফর তার ১৫০ গাছের লিচু বিক্রি করেছেন দুই লাখ টাকায়। ইছাখাদা গ্রামের শরিফুল ড্রাইভার গত বছর তার ৩০০ গাছের লিচু বিক্রি করেছিলেন আড়াই লাখ টাকায়। আর এ বছর বিক্রি করেছেন ৩ লাখ টাকায়।

সদর উপজেলার হাজরাপুর, হাজীপুর ও রাঘবদাইড় এই তিন ইউনিয়নের ইছাখাদা, মিঠাপুর, গাঙ্গুলিয়া, খালিমপুর,মির্জাপুর, পাকাকাঞ্চনপুর, বীরপুর, রাউতড়া, বামনপুর, আলমখালী, বেরইল, লক্ষিপুর, নড়িহাটিসহ ৩০টি গ্রামের চাষিরা বেশ ক’বছর ধরেই বাণিজ্যিক ভিত্তিতে লিচু চাষ করে আসছেন।

এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, বেপারীরা চাষিদের কাছ থেকে অগ্রিম দরে লিচু গাছ কিনে  বাগানে লিচু সংগ্রহের কাজ শুরু করেছেন অনেক আগেই। যেখানে এলাকার কমপক্ষে ১ হাজার লোকের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে।

ইছাখাদা কৃষক উন্নয়ন সমিতির নেতা কাজী সাইফুল ইসলাম জানান, আগে অন্য ফসল আবাদে তেমন লাভ হতো না। লাভজনক হওয়ায় এলাকার কৃষকেরা লিচু চাষ শুরু করে। এসব লিচু চাষি শূন্য থেকে শুরু করে এখন লাখ লাখ টাকার মালিক হয়েছেন।

সাইফুল ইসলাম  জানান, গতবছর এ এলাকা থেকে ১৫ কোটি টাকার লিচু বিক্রি হয়েছিল। এ বছর প্রায় ২০ কোটি টাকার লিচু বিক্রি হবে বলে তিনি আশা করছেন।

তিনি জানান,  লিচুর বাগান করতে প্রথম বছর একটু খরচ হয়। পরবর্তীতে তেমন আর উল্লেখযোগ্য খরচ নেই বললেই চলে। প্রতি বছর  লিচুর ফুল আসলে শুধু গাছে স্প্রে ও সামান্য পরিচর্যা করতে হয়। এই এলাকার মাটি লিচু চাষের জন্য উপযোগি।

এখানে বোম্বাই, চায়না থ্রি, মোজাফ্ফর ও স্থানীয় হাজরাপুরী জাতের লিচুর চাষ হয়ে থাকে। জেলার অন্যান্য স্থানের চেয়ে এখানকার লিচু রাসালো, মিষ্টি ও আকারে বড় হওয়ায় সারাদেশে হাজরাপুরী লিচুর ব্যাপক চাহিদা সৃষ্টি হয়েছে। যে কারণে মৌসুমের শুরুতে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ব্যাপারী, ফড়িয়া ও আড়তদারা এসে লিচুর বাগান কিনে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে নিয়ে বিক্রি করছেন।

মাগুরা সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা  মো. রুহুল আমিন বলেন, ‘গোটা জেলায় প্রায় ২ হাজার লিচু বাগান রয়েছে। কৃষি বিভাগ নিয়মিত খোঁজ খবর নেওয়ার পাশাপাশি এসব চাষিদের সরকারি সবধরণের সুবিধা দিয়ে আসছে। লিচুর আবাদে অনেক  পরিবার আত্মনির্ভরশীলতার পথ খুঁজে পেয়েছে ।’




রাইজিংবিডি /মাগুরা/  ১৫ মে ২০১৭/  আনোয়ার হোসেন শাহীন/টিপু

Walton Laptop