দীপেন দেওয়ানের পদত্যাগে হতবাক স্থানীয় নেতারা
রাঙামাটি প্রতিনিধি || রাইজিংবিডি.কম
দীপেন দেওয়ান। ফাইল ফটো
বিএনপি সরকার গঠনের মাত্র সাড়ে তিন মাসের মাথায় মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেছেন পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী দীপেন দেওয়ান। সোমবার (১ জুন) সকালে তিনি পদত্যাগপত্র জমা দেওয়ার পর তা গ্রহণ করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। শারীরিক অসুস্থতার কারণে তিনি এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
প্রধানমন্ত্রীর কাছে জমা দেওয়া পদত্যাগপত্রে দীপেন দেওয়ান উল্লেখ করেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে তিনি বিভিন্ন শারীরিক জটিলতায় ভুগছেন। অসুস্থতার কারণে মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত কার্যক্রম পরিচালনা এবং দায়িত্ব পালনে নানাবিধ সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে। সরকারের উন্নয়ন ও প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডেরে গতিশীলতা বৃদ্ধির স্বার্থে বর্তমান পদ থেকে অব্যাহতি গ্রহণ প্রয়োজন বলে মনে করছেন তিনি। এ কারণে পদত্যাগপত্র গ্রহণের অনুরোধ জানান।
দীপেন দেওয়ানের ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচিত রাঙামাটি জেলা বিএনপি সহ-সভাপতি অ্যাডভোকেট সাইফুল ইসলাম পনির বলেন, “আমরা খবরটা শুনে অবাক হয়ে গেছি। আমাদের কল্পনাতেও নাই যে, এমন সিদ্ধান্ত উনি নিতে পারেন। আমাদের সঙ্গেও তিনি কথা বলেননি, পরামর্শও করেননি। আর উনার শারীরিক অবস্থাও এমন নয় যে,
পদত্যাগ করতে হবে, উনি সব কাজই করছিলেন।”
তিনি বলেন, ‘মন্ত্রণালয়ে কিছু বিষয় নিয়ে সম্ভবত তার মধ্যে অস্বস্তি ছিল। জেলা পরিষদ পুনর্গঠন নিয়েও কিছু থাকতে পারে হয়ত, ছাত্রদলের কমিটি গঠন কিংবা অন্যান্য আরো বিষয়ও থাকতে পারে, আমি নিশ্চিত কিছু জানি না। কথা বলতে পারলে বুঝতে পারতাম। কিন্তু এই সিদ্ধান্ত নেওয়াটা সম্ভবত ঠিক হয়নি।”
রাঙামাটি জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট মামুনুর রশীদ মামুন বলেন, “পার্বত্য মন্ত্রীর পদত্যাগের কথা আমি বিশ্বাসই করতে পারিনি প্রথমে। কেনো তিনি এমনটা করলেন, বুঝতেই পারছি না। উনার শারীরিক অবস্থা যতটুকু জানি, এমন নয় যে, পদত্যাগ করতে হবে। আর যদি মান-অভিমান বা অন্য কোনো কারণ থাকে, তিনি জেলা বিএনপি ও নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলতে পারতেন, সেটাও করেননি। আমি বুঝতে পারছি না, কি থেকে কি হলো।”
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির মনোনয়নে রাঙামাটি আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন দীপেন দেওয়ান। ১৭ ফেব্রুয়ারি বিএনপি সরকার গঠন করলে তাকে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়।
দীপেন দেওয়ানের রাজনৈতিক ও পারিবারিক পরিচয় দীর্ঘদিনের। তার বাবা সুবিমল দেওয়ান ছিলেন বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের উপদেষ্টা, যার পদমর্যাদা ছিল মন্ত্রীর সমান। তিনি রাঙামাটি জেলা বিএনপির প্রতিষ্ঠাকালীন সাধারণ সম্পাদক এবং পরে সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পিতার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার অনুসরণ করে ২০০৬ সালে সরকারি চাকরি ছেড়ে বিএনপির রাজনীতিতে যোগ দেন দীপেন দেওয়ান। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে
সম্পৃক্ত ছিলেন।
রাঙামাটি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়, রাঙামাটি সরকারি কলেজ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষ করার পর দীপেন দেওয়ানের ইচ্ছা ছিল সরাসরি রাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার। তবে পরিবারের চাপে বিসিএস পরীক্ষায় অংশ নেন এবং সপ্তম বিসিএসে উত্তীর্ণ হয়ে জুডিসিয়াল সার্ভিসে যোগ দেন। ২০০৬ সালে চারদলীয় জোট সরকারের শেষ সময়ে তৎকালীন উপমন্ত্রী মনিস্বপন দেওয়ান দলত্যাগ করলে বিএনপিতে যোগ্য নেতৃত্বের প্রয়োজন দেখা দেয়। সে সময় বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার আহ্বানে সাড়া দিয়ে প্রায় ২০ বছরের জুডিসিয়াল সার্ভিসের চাকরি ছেড়ে রাজনীতিতে যোগ দেন দীপেন দেওয়ান। রাজনীতিতে প্রবেশের পরপরই নানা প্রতিকূলতার মুখোমুখি হন তিনি।
বিএনপির দলীয় সূত্র জানায়, ওয়ান-ইলেভেনের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নির্বাচন স্থগিত হয়ে গেলে তার রাজনৈতিক অগ্রযাত্রাও থমকে যায়। নতুন নির্বাচনি বিধানের কারণে ২০০৮ সালের সংসদ নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ হারান তিনি। পরে ২০১০ সালে রাঙামাটি জেলা বিএনপির সভাপতি নির্বাচিত হন। ২০১৬ সাল থেকে তিনি বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির ধর্মবিষয়ক সহ-সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করে আসছেন।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে রাঙামাটিতে বিএনপির অন্যতম অভিভাবকসুলভ নেতা হিসেবে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন দীপেন দেওয়ান। অবরোধ, মিছিল, সমাবেশসহ দলীয় সব কর্মসূচিতে তার সরব উপস্থিতি ছিল। দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম ও দুঃসময়ের পর তিনি জেলার প্রথম পূর্ণাঙ্গ মন্ত্রী হওয়ার গৌরব অর্জন করেন।
গত ১৭ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ ভবনের শপথ কক্ষে বিএনপির নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের সঙ্গে তিনি সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেন। পরে একই দিন মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত হয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন।
ঢাকা/শংকর/মাসুদ