Risingbd Online Bangla News Portal

ঢাকা     শুক্রবার   ১৪ মে ২০২১ ||  চৈত্র ৩১ ১৪২৮ ||  ০১ শাওয়াল ১৪৪২

শঙ্খ ঘোষ: প্রতিবাদী কণ্ঠের শেষ যতিচিহ্ন

সন্দীপন ধর || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ২২:১৯, ২৪ এপ্রিল ২০২১   আপডেট: ২২:২১, ২৪ এপ্রিল ২০২১
শঙ্খ ঘোষ: প্রতিবাদী কণ্ঠের শেষ যতিচিহ্ন

দীর্ঘ কর্মজীবনে শঙ্খ ঘোষ যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়, দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় এবং বিশ্বভারতীর মতো প্রতিষ্ঠানে অধ্যাপনা করেছেন। তাঁর লেখার মাধ্যমেই তিনি বারবার সতর্ক করেছেন রাজনৈতিক দলগুলোকে। রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকারকে প্রয়োজনমত বার্তাও দিয়েছেন। বছর দুয়েক আগে ‘মাটি’ নামে একটি কবিতায় কেন্দ্রীয় সরকারের নাগরিকতা সংশোধন আইনের বিরুদ্ধে গর্জে উঠেছিল তাঁর কলম। ফলে তাঁর প্রয়াণে প্রতিবাদী কণ্ঠে যে শেষ যতিচিহ্ন পড়লো এ কথা বলা যায়।

শঙ্খ ঘোষ প্রাথমিকভাবে ‘কবি’ রূপে পরিচিত হলেও তাঁর গদ্য রচনার সংখ্যা বিপুল। তিনি কবিতা এবং গদ্য মিলিয়ে যে বিরাট মাপের কাজ করেছেন, ইতোমধ্যেই তার দ্বিতীয় তুলনা নেই। বাংলা কাব্যজগতে ‘বাবরের প্রার্থনা’, ‘দিনগুলি রাতগুলি’, ‘মুখ ঢেকে যায় বিজ্ঞাপনে’ অমর হয়ে থাকবে। ‘বাবরের প্রার্থনা’ কাব্যগ্রন্থের জন্য সাহিত্য একাডেমি পুরস্কার পেয়েছিলেন এই কবি।

এর পাশাপাশি তিনি লিখেছেন ‘লাইনেই ছিলাম বাবা’ নামক কাব্যগ্রন্থ যা বিস্ফোরক রাজনৈতিক কবিতা দিয়ে ভরা। প্রকৃতপক্ষে শঙ্খ ঘোষের যে কবিমানস, তার গতি দ্বিমুখী। এক দিকে সেই মন সর্বদা সজাগ সমসময়ের সমস্ত সামাজিক রাজনৈতিক ঘটনার ঘাত প্রতিঘাত নিয়ে। সমাজের যে কোনো অন্যায় অবিচারের বিরুদ্ধে শঙ্খ ঘোষের অতিসংবেদনশীল কবিমন গর্জে উঠেছে বহুবার। সমাজের অসাম্য, ন্যায়বিচারের অভাব তিনি চিহ্নিত করেন অমোঘ কবিতা দিয়ে। যেমন খুবই সম্প্রতি তাঁর একটি কবিতা যা প্রকাশিত হয়েছে শারদীয় আনন্দবাজার পত্রিকায়। পাঠকের জন্য সেই কবিতা পুরোটাই তুলে দিচ্ছি।

খোক্কসরাজ
১। থানাত্থে আইলি বাপ? কী বুল্ল উয়ারা?
২। কী আর বুলবে কও। এমনকি এফ আই আর-ও নিল না একখান।
১। কী নিল না?
২। এফ আই আর। কিছু যে ঘটসে তার নালিশ তো লেখানো চাই।
১। নালিশ নিল না?
২। না। কইল যে ঘটে নাই কিছু। সোমত্ত ডাগর মাইয়া দেখো গিয়া পলাইসে নাগরের লগে।
১। নাগরের লগে পলাইসে? অমন সোনারটুকরা মাইয়া, জলপানি পাওয়া মাইয়া, পাড়ার চুখের মণি মাইয়া, কত সাধ কইরা সেদিন কইল আইস্যা: ‘শহরের কলেজ়ে পড়ুম— শহরের সবচাইয়্যা উঁচা কলেজ়ে’—নাগরের লগে পলাইসে সে? দিনদুপুরে হগলের চুখের সামনে দিয়া টাইন্যাহিঁচড়্যা লইয়া গ্যালো খোক্কসগুলান, চেনাজ়ানা মুখ। সে নাকি পলাইসে নাগরের লগে?
২। চেনাজ়ানা মুখ বইলাই তো মুশকিল মা গ’— রোজ়ই তো ঘটসে এমন এইখানে ওইখানে। নেতাদের ভাইগ্না ভাতিজ়া সব— উয়াদের ধরতে পারে কেউ?
১। শুইনা চুপচাপ চইলা আলি? কিছু কইলি না?
২। কইসি মা, কইসি। চিক্ষৈর দিয়া কইসি। কইথে কইথে গলা চিরা গ্যাসে। কিন্তু ব্যাটা কয়: ‘দুই পাতা ইঞ্জিরি পইড়্যা বড়ো দেখি ত্যাজ় হইসে তোর? বেশি ট্যাফুঁ করলে এমন ধারায় জ়েলে ঠুসে দিব—জ়ীবন ভইরা পচবি গরাদে। যা এখন বাড়ি যা। অন্যের ভাবনা না ভাইবা নিজ়ের আখের গোছা, যা—
১। শহরের বাবুদের কাছে গেছিলি কি?
২। গিয়া কুনো লাভ নাই। বাবুরা একদিন হয়তো শহরের রাজ়পথ ভইরা দিবে মিছিলে মিছিলে। গরম গরম ধ্বনি দিবে। তারপরে দায় সারা হইল ভাইবা দিবানিদ্রা দিবে তারা। সামনে কুনো পথ নাই আর। অজ়াত-কুজ়াত আমরা, জ়ঙ্গুলি মানুষ আমরা, অচ্ছুৎ দলিত্—এককাট্টা হইয়া আমাদের কথা আজ় আমাদেরই কইতে হইবে মা। এককাট্টা হইয়া লড়াই করন ছাড়া আর কুনো পথ নাই আজ।

এই কবিতায় দু’টি চরিত্র কথা বলছে। একেবারে নাটকের মতো সংলাপের ধর্ম নিজের শরীরে গ্রহণ করেছে এই কবিতা। এই কবিতা বলছে তাদের কথা যারা অচ্ছুত, যারা দলিত। থানার পুলিশ এদের কথাটুকু পর্যন্ত শুনতে চায় না। থানার পুলিশ ভয় পায় বড় বড় নেতাদের সাঙ্গোপাঙ্গদের। উগ্র হিন্দুত্ববাদী নেতারা দলিতদের ওপর অত্যাচার করেই যাবে। এমন মানুষেরা তা হলে কোথায় যাবে? কার কাছে? এদের নিজেদের যে জোট বেঁধে এককাট্টা হতে হবে সে কথা বলছে এই কবিতা। কবিতার গঠনের দিকেও যদি তাকাই তা হলে দেখব কবি শঙ্খ ঘোষ এই ৮৮ বছর বয়সে দাঁড়িয়ে নিজের কবিতার জন্য নতুন এক বাক্ভঙ্গি আবিষ্কার করে নিচ্ছেন।

এখনই বলছিলাম যে, শঙ্খ ঘোষের কবিতার গতিধারা চালিত হয় দু’টি ভিন্ন মুখে। একটির উদাহরণ এইমাত্র দিলাম। যেখানে সমাজের নিচুতলার মানুষদের ওপর যে শোষণপীড়ন বঞ্চনা অবিরাম ঘটে চলেছে, সে বিষয়ে কবির প্রতিবাদ ধ্বনিত হয়। অন্য গতিধারাটি কাজ করে সম্পূর্ণ পৃথক একটি দিকে। সেই দিকটি হলো কবির নিজের অবচেতনের মধ্যে কেবলই নেমে চলে তাঁর কবিতা। মনের কোনো গভীর অতলান্তের দিকে তার যাত্রা। যেমন এই দৃষ্টান্তটি নেওয়া যাক:

তোমার শুধু জাগরণ শুধু উত্থাপন কেবল উদ্ভিদ
তোমার শুধু পান্না আর শুধু বিচ্ছুরণ কেবল শক্তি।
...
তোমার কোনো মিথ্যা নেই তোমার কোনো সত্য নেই
কেবল দংশন
তোমার কোনো ভিত্তি নেই তোমার কোনো শীর্ষ নেই
কেবল তক্ষক...

এখানে, তোমার কোনো ভিত্তি নেই, তোমার কোনো শীর্ষ নেই/ কেবল তক্ষক— এই লাইনটি কিন্তু বাচ্যার্থ পেরিয়ে চলে যায়। এ কবিতার শিরোনাম ‘তক্ষক’। কিন্তু তক্ষক শব্দটি যেখানে যে ভাবে প্রয়োগ করা হয়েছে সেখানে আমরা বাচ্যার্থ আশ্রয় করলে কী মানে পাব তার? এ ভাবেই অন্তহীন রহস্যকেও নিজের শরীরে ধারণ করে থাকে শঙ্খ ঘোষের কবিতা। এ রকম আরও দৃষ্টান্ত দেওয়া যায়। যেমন ধরা যাক ‘জল’ কবিতাটি:

জল কি তোমার কোনও ব্যথা বোঝে? তবে কেন, তবে কেন
জলে কেন যাবে তুমি নিবিড়ের সজলতা ছেড়ে?
জল কি তোমার বুকে ব্যথা দেয়? তবে কেন তবে কেন
কেন ছেড়ে যেতে চাও দিনের রাতের জলভার?

এই কবিতাটিতে ‘জল’ শব্দটি কয়েক বার প্রয়োগ করা হয়েছে। কিন্তু স্পষ্ট প্রত্যক্ষ বাচ্যার্থ দিয়ে জল কথাটিকে আমরা ধরাছোঁয়ার মধ্যে পাচ্ছি না। একটি শব্দের চার পাশে যেটুকু অর্থের বৃত্ত থাকে, সেই বৃত্তটিকে পার হয়ে নতুন এক রহস্যময়তায় শব্দটিকে উত্তীর্ণ করে দেওয়া হলো। জল এই সামান্য ও অতিচেনা শব্দও নতুন অর্থস্তর যোগ করল নিজের সঙ্গে। সহজ কথাকে এত অসামান্যতায় উড়িয়ে দেওয়া হলো যে পাঠকের বিস্ময়ে বিমুগ্ধ হওয়া ছাড়া উপায় রইল না।

শঙ্খ ঘোষের কবিতা বুঝবার, সেই কবিতাকে অন্তরে গ্রহণ করার চেষ্টা আমি করে চলেছি দীর্ঘ দিন ধরে। আমি নিজেকে একটা কথা বলি সব সময়: তোমার মনের চেয়ে অনেক বড়, অনেক উঁচু, অনেক দূরপ্রসারিত মন এই কবির। যদি তুমি তাঁকে বুঝতে চাও তোমাকে তোমার মনের উচ্চতা বাড়াতে হবে। নিজেকে বলি: মনে রেখো এই কবি, এই শঙ্খ ঘোষ, রবীন্দ্ররচনাকে নিয়ে লিখেছেন ‘নির্মাণ ও সৃষ্টি’ নামে এক মহাগ্রন্থ। সেই রকম উচ্চতার বই রচনা করার শক্তি যে মনের আছে, তোমাকে সেই মনের কাছাকাছি পৌঁছতে হলে নিজের মনকেও প্রসারিত করার অনুশীলন করে যেতে হবে।

আবার নিজেকে প্রশ্ন করি: কী ভাবে হবে এই অনুশীলন? এই কবি তো সকলের সঙ্গে দেখা করেন। এই কবির সঙ্গে তো তোমারও সাক্ষাৎ পরিচয় আছে। শঙ্খ ঘোষের সামনে নিয়মিত উপস্থিত হতে পারলে, তাঁকে চোখের সামনে সপ্তাহে অন্তত একবার দু’বার দেখার সুযোগ পেলে কি আমার মনও তাঁর মনের অতলান্তে পৌঁছে যাওয়ার পথ পাবে? অথবা তিনি যে সব সামাজিক ক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করেন, সে সব জায়গায় শামিল হতে পারলে কবির একটু সঙ্গসান্নিধ্য লাভ করতে পারলে কি আমার মনও তার উচ্চতা বৃদ্ধি করতে পারবে? যার ফলে শঙ্খ ঘোষের রচনার মন আমার আয়ত্তে আসবে?

যত বার ভাবি, তত বার একটাই উত্তর পাই- না। সে পথ সহজ। কিন্তু সে পথ আসল পথ নয়। কারণ কবি, এ ক্ষেত্রে শঙ্খ ঘোষ, নিজেকে তাঁর রচনার মধ্যে যেভাবে নিক্ষেপ করতে পারেন ‘চেতনে অবচেতনে বাঁধি মিল’, অগ্রজ কবির এই কবিতা পঙ্ক্তিকে যে ভাবে তিনি রচনামুহূর্তে প্রয়োগ করতে পারেন, ব্যক্তিগত সঙ্গলাভ সেই রচনামুহূর্তের কবিমানসকে আমার সামনে তুলে ধরতে পারবে না। শঙ্খ ঘোষকে অনুভব করতে যদি চাই, যা এখনও পারিনি, যদি তাঁর মনের উচ্চতার কিছুটা কাছাকাছি নিয়ে যেতে চাই নিজের মনকে, তা হলে ধারাবাহিক ভাবে শঙ্খ ঘোষের কবিতা ও প্রবন্ধ পাঠ করে চলতে হবে আমাকে। বারবার পড়তে হবে। প্রত্যেক বারই দেখব কোনো নতুন দরজা খুলে যাচ্ছে চোখের সামনে।

শঙ্খ ঘোষ এই ৮৮ বছর বয়সে পৌঁছেও সম্প্রতি শারদীয় দেশে একটা অসামান্য কবিতা লিখেছেন। তার প্রথম লাইনটি হলো: ‘তোমার দুঃখের পাশে বসে আছি।’ কী গভীর এই অনুভব! আমাকেও, যদি শঙ্খ ঘোষকে জানতে চাই, বসে থাকতে হবে শঙ্খ ঘোষের সৃষ্টির কাছে। একাগ্র ও নিবিষ্ট মনে তাঁর রচনা হৃদয়ে গ্রহণ করার চেষ্টা করে যেতে হবে। আমার কি সেই চেষ্টা আছে? মনে মনে কি ভাবি না আমি যে তাঁকে সবটুকু বুঝে ফেলেছি? সেই ভাবনা ভুল।

ঢাকা/তারা

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়