ঢাকা     শুক্রবার   ১২ আগস্ট ২০২২ ||  শ্রাবণ ২৮ ১৪২৯ ||  ১৩ মহরম ১৪৪৪

আমার কবি হয়ে ওঠার পেছনে রয়েছে মাতৃহীনতার বেদনা: হেলাল হাফিজ 

শিহাব শাহরিয়ার || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৭:৪৭, ১১ জুলাই ২০২২   আপডেট: ১৮:০৩, ১১ জুলাই ২০২২
আমার কবি হয়ে ওঠার পেছনে রয়েছে মাতৃহীনতার বেদনা: হেলাল হাফিজ 

‘যে জলে আগুন জ্বলে’ লিখে সমকালীন বাংলা কবিতায় যিনি কাব্যঅধিকার স্থাপন করেছেন তিনি হেলাল হাফিজ। তার নিজস্ব কাব্য ভাষা পাঠকমন ছুঁয়েছে। শুধু পাঠক নন, খুব কম লিখেও তিনি বাংলা কবিতায় একটি মাইলফলক তৈরি করেছেন। পেশায় সাংবাদিক হলেও তিনি মূলত কবি। কবিঅর্থে তার পদবাচ্যে যে কবিতা যে কবি, তিনি পুরোটাই কবি। কবি হেলাল হাফিজের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন কবি শিহাব শাহরিয়ার। আজ প্রকাশিত হলো সাক্ষাৎকারের প্রথম পর্ব  

শিহাব শাহরিয়ার: আপনার জন্ম, বেড়ে ওঠা, গ্রাম, জেলা শহর সম্পর্কে জানতে চাচ্ছি।

হেলাল হাফিজ: আমার জন্মশহর নেত্রকোণা। শহর থেকে ১০-১২ মাইল দূরেই আমাদের গ্রামের বাড়ি; বড়তুলি গ্রাম। সেখানেই আমার জন্ম। কিন্তু আমার পড়াশোনা, শৈশব, কৈশোর এবং প্রথম যৌবন কেটেছে নেত্রকোণায়। আজ থেকে প্রায় ৭২-৭৩ বছর আগের কথা। তখন নেত্রকোণা অত্যন্ত ছিমছাম, নীরব, সুন্দর শহর। শহরটিকে চারদিক থেকে যে নদী ঘিরে রেখেছে মগড়া; চোখের কোণের মতো; অনেকের ধারণা ওখান থেকেই নেত্রকোণা নামটা এসেছে। আমাদের এলাকা হিন্দুপ্রধান ছিল। ফলে সাহিত্য, সংস্কৃতি বিশেষ করে সংগীতে... আমাদের লোকসাহিত্যের সবচেয়ে প্রধান অঞ্চল হয়ে ওঠে নেত্রকোণা, কিশোরগঞ্জ এবং পাশাপাশি সিলেটের কিছু অঞ্চল। তো এই লোকসংস্কৃতির একেবারে আঁতুরঘর বলা যায় নেত্রকোণাকে। সেখানে কেটেছে আমার শৈশব, কৈশোর এবং প্রথম যৌবন।

শিহাব শাহরিয়ার: আপনি সেখানে ইন্টারমিডিয়েট শেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভগে ভর্তি হলেন। 

হেলাল হাফিজ: আমার খুব ইচ্ছা ছিল ডাক্তারি পড়ার। আমি স্কুলজীবনে সবচেয়ে কাঁচা ছিলাম অঙ্কে। ডাক্তারি পড়তে হলে আইএসসি পড়তে হবে অর্থাৎ ফিজিক্স, ক্যামেস্ট্রি, ম্যাথ পড়তে হবে। তো আমি সাহস করে ভর্তি হয়ে গেলাম। কিন্তু তত দিনে কবিতার পোকা ঢুকে গেছে মাথায়। তো আইএসসি পাস করে ঢাকা চলে এলাম। এসে মনে হলো আমি যদি ডাক্তারি পড়ি তাহলে কবিতার জন্য সময় দিতে পারবো না, আমার পড়াশোনার চাপ এতো বেশি থাকবে, তখন কী মনে করে যেন আর ডাক্তারি ভর্তি পরীক্ষা দিলাম না। ভর্তি হয়ে গেলাম বাংলায় অনার্সে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। মনে হলো বাংলা পড়লে বোধহয় কিছুটা সময় আমি একটু আড্ডাবাজি করতে পারবো, কবিতার জন্য একটু সময় দিতে পারবো। এটা ১৯৬৭ সালে।

শিহাব শাহরিয়ার: এর দু’বছর পরেই গণঅভ্যুত্থান। 

হেলাল হাফিজ: হ্যাঁ, গণঅভ্যুত্থান আমার দেশকেও পাল্টে দিয়েছে, আমার জীবনও পাল্টে দিয়েছে। আমার জীবন যেভাবে পাল্টে দিয়েছে অর্থাৎ ‘নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়’ ‘এখন যৌবন যার মিছিলে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়’ এই কবিতা ১৯৬৯ সালে রচিত। তখন আমি ইকবাল হলের আবাসিক ছাত্র। তো এই একটি কবিতা রাতারাতি আমাকে তারকাখ্যাতি এনে দেয়। ক্যাম্পাসে কবিতাটি একটা অসম্ভব আদরের, সম্মানের জায়গায় আমাকে প্রতিষ্ঠিত করে।  

শিহাব শাহরিয়ার: ২০ জানুয়ারি আসাদ মারা গেলেন আর মতিউর রহমান মল্লিক মারা গেলেন ২৪ তারিখে গণঅভ্যুত্থান দিবস যেটিকে বলা হচ্ছে। আপনার কবিতা কী আগে নাকি পরে, নাকি ওই দিন লেখা?

হেলাল হাফিজ: আসাদ যেদিন মারা গেলেন ২০ তারিখ, আমি তখনো হলে। আসাদকে নিয়ে তো পরে শামসুর রাহমান ‘আসাদের শার্ট’ শিরোনামে একটা চমৎকার কবিতা লিখলেন। আমার কবিতাটা হলো ফেব্রুয়ারির ১ অথবা ২ তারিখে লেখা। মানে এটার প্রসেস শুরু হয়েছে কিন্তু বেশ আগে; অন্য একটা ঘটনা থেকে। আমি একদিন পুরনো ঢাকা থেকে হলে ফিরছিলাম রিকশায়। ফুলবাড়িয়া রেলস্টেশনের আগে রিকশা একটু দাঁড়ালো। ইপিআর এবং ছাত্রদের মধ্যে সংঘর্ষ চলছে। আমার রিকশার পাশে এসে আরেকটা খালি রিকশা দাঁড়ালো। তো ইপিআর ছাত্রদের ওপর প্রচণ্ড লাঠিপেটা করছে, ছাত্ররা ঢিল ছুঁড়ছে- এসব দেখে খালি রিকশাওয়ালাটা অদ্ভুত এক কথা বললো! সে ছাত্রদের উদ্দেশ্যে বললো, ‘মার ওদের। কোনো কোনো প্রেম আছে মার্ডার করাও জায়েজ।’

রিকশাওয়ালার কথাটা মুহূর্তে আমার মনে এবং মগজে ঢুকে গেল এবং আমাকে গ্রাস করে ফেললো, আলোড়িত করে ফেললো। এই যে এইখান থেকে ওই পঙ্ক্তি ‘কোনো কোনো প্রেম আছে প্রেমিককে খুনি হতে হয়, যদি কেউ ভালোবেসে খুনি হতে চান, তাই হয়ে যান, উৎকৃষ্ট সময় কিন্তু আজ বয়ে যায়।’ 

তো আমার এই কবিতার সূচনা জানুয়ারির প্রথম দিকের ঘটনা। তারপর আরও একমাস চলে গেছে। এই একমাস আমি পাগলের মতো একটা কবিতা লেখার জন্য, এই কথাটা কবিতায় আনার জন্য, কোনো কোনো প্রেম আছে মার্ডার করা জায়েজ- এটা হচ্ছে মূল সোর্স আমার এই কবিতা লেখার পেছনে। তবে সঠিক তারিখ খেয়াল নেই, হয়তো পয়লা ফেব্রুয়ারি বা দ্বিতীয় ফেব্রুয়ারিতে আমি এই কবিতাটা লিখি। 

কবিতাটা আরো দীর্ঘ ছিল। কবিতাটা আমি আহমদ ছফা এবং কবি হুমায়ুন কবিরকে দেখালাম শরীফ মিয়ার ক্যান্টিনে। ছফা ভাই কবিতাটা দেখে বললো খুবই সুন্দর হয়েছে কিন্তু একটু ঝুলে গেছে; দীর্ঘ কবিতা তো, দুই পৃষ্ঠার মতো। বললো কালকে তোকে নিয়ে আহসান হাবীবের কাছে যাবো। দৈনিক পাকিস্তানের সাহিত্য সম্পাদক, পরে যেটা ‘দৈনিক বাংলা’ হলো। পরের দিন হুমায়ূন কবির এবং ছফা ভাই আমাকে নিয়ে আহসান হাবীবের কাছে গেলেন। তো হাবীব ভাই চা খাচ্ছেন, সিগারেট খাচ্ছেন আর কবিতা দেখছেন আর আমার দিকে তাকান। কবিতাটা পড়ে উনি ছফা ভাইকে বললেন, ছফা ও তো বাচ্চা মানুষ, কষ্ট পাবে, এই কবিতাটা আমি ছাপতে পারবো না। এটা ছাপলে কাল আমার চাকরি তো যাবেই, এমনকি কাগজও বন্ধ হয়ে যেতে পারে। কিন্তু হাবীব ভাই নিজে কবি তো। উনি বুঝতে পেরেছেন জিনিসটা। উনি ছফাকে বললেন, আমি ছাপতে পারলাম না কবিতাটা এটা আমার জন্য খুবই বেদনার। তবে হেলালের আর বাকি জীবনে কবিতা না লিখলেও চলবে।

তো আমার একটু মন খারাপ হলো- আহারে কবিতাটা দৈনিক পাকিস্তানে ছাপা হলে কতো না ভালো লাগতো! কিন্তু তার আর দরকার হয়নি। কেন দরকার হয়নি? ছফা ভাইরা বাম রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিল। সে সময় যারা একটু আন্ডারগ্রাউন্ড পার্টি করতো তাদের সঙ্গেও যোগযোগ ছিল। এই দুজন সমস্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দেয়ালে দেয়ালে দুই রাতে এই দুইটা লাইন চিকা মেরে দিল: ‘এখন যৌবন যার, মিছিলে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়, একটু যৌবন যার, যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়।’ মানে আর্টস বিল্ডিংয়ে তো বটেই এমনকি কার্জন হলের দেয়ালে দেয়ালে চিকা। ক্যাম্পাসে রাতারাতি আমি বিখ্যাত হয়ে গেলাম। আমি হল থেকে যখন বের হতাম, ছেলেমেয়েরা আমার নাম বলতো না। বলতো- ওই যে এখন যৌবন যার যায়। 

শিহাব শাহরিয়ার: আমরা শুনেছি এটা সত্যি কিনা, আপনি গুলিস্তান থেকে পুরোনো ঢাকা থেকে ইকবাল হলে আসছিলেন, তখন কী কোথাও থেকে কাগজ নিয়ে কবিতাটা লিখেছিলেন?

হেলাল হাফিজ: না। ওই রিকশাওয়ালার কথাটা আমার মগজে-মনে; একদম টিয়ারশেলের মতো, বন্দুকের গুলির মতো ঢুকে গেছে। 

শিহাব শাহরিয়ার: অনেকেই বলেন মানে সমালোচকরা বলেন এটি স্লোগানধর্মী কবিতা।

হেলাল হাফিজ: এটা একটা মজার ব্যাপার। এ নিয়ে কাব্যমহল দ্বিধাবিভক্ত। কেউ বলে এটা কবিতা হয়নি, স্লোগান হয়ে গেছে। কেউ বলে এটা স্লোগান ছিল কবিতা হয়ে গেছে। তো এটা তো তুমি নিজে যেহেতু কবি বুঝতেই পারো। এটা একটা কবির গৌরবের বিষয় যে, একটা পঙক্তি নিয়ে পাঠকমহল দুই ভাগ হয়ে গেছে। একভাগ বলছে এটা কবিতা না, স্লোগান। একভাগ বলছে, এটা স্লোগান ছিল কবিতা হয়ে গেছে। 

শিহাব শাহরিয়ার: লেখালেখিটা কবে কীভাবে আপনি শুরু করেছিলেন, একটু পেছনে যেতে চাই।

হেলাল হাফিজ: আমি স্কুলজীবনে ছিলাম খেলাধুলার মানুষ। এই ফুটবল, ব্যাডমিন্টন, ভলিবল, ক্রিকেটে অতটা আগ্রহ ছিল না। এমনকি নেত্রকোণার মতো একটা মফস্বল শহরে আমি ওই সময়ে লং টেনিস শিখেছি। সেটা সম্ভব হয়েছিল আব্বার জন্য। আব্বা যেহেতু নামকরা শিক্ষক, নেত্রকোণার এলিট যারা টেনিস খেলতেন বিশেষ করে ডাক্তার বা আইনজীবী বা কলেজের প্রিন্সিপাল, অধ্যাপক; আমি মাঠের পাশে বসে থাকতাম। প্রথম হলো যে বল বয়, বল কুড়িয়ে এনে দেওয়া। এই করতে করতে...। আসলে আমি ছিলাম খেলাধুলার মানুষ। এরপর ছোটবেলায় মাকে হারিয়েছি। তখন তো বুঝতে পারিনি, এতো বড় একটা বেদনা! বয়স যখন বাড়তে লাগলো বেদনা আমরা ভেতরে শিকড় গজাতে লাগলো, গ্রাস করে ফেললো আমাকে। এই মাতৃহীনতার বেদনা আমার কবি হয়ে ওঠার পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান রেখেছে। 

শিহাব শাহরিয়ার: প্রথম কখন লিখলেন, মনে আছে?

হেলাল হাফিজ: আমার মনে হয় আমি তখন ক্লাস সেভেন বা এইটে পড়ি। তখন দুইটা ঘটনা ঘটলো। একটা হলো একটা ছড়া লিখে আমি ‘ইত্তেফাকে’ পাঠিয়েছিলাম কচিকাঁচার আসরে। ছড়াটা ছাপা হলো। আর এর কাছাকাছি সময়ে কয়েকদিন আগে বা পরে আমাদের স্কুলে, তখন প্রত্যেক স্কুলে দেয়ালিকা বের হতো। সেখানে লেখা দিলাম। তো আমার লেখা সিলেক্ট হলো। এই শুরু। আশপাশে অন্য কিছু আর মনে নেই। 

শিহাব শাহরিয়ার: ১৯৭১ সালে আপনি ইকবাল হলে ছিলেন। তখন কার্জন হলে ২৫শে মার্চ রাতে যে ক্র্যাকডাউনটা হয় সেই ঘটনাটা একটু জানতে চাই।   

হেলাল হাফিজ: তখন বঙ্গবন্ধুর ডাকে অসহযোগ আন্দোলন চলছে। সমস্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ। তারপরও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্যেক হলে, কোনো হলে ২৫ জন, ৩০ জন, এমনকি রোকেয়া হলেও ছাত্রী ছিল। ২৫ মার্চ রাতে আমি অলৌকিকভাবে বেঁচে গেলাম। আমার বাঁচার কথা না। আমি বেঁচে গেলাম কারণ তখন তো পুরো হল বন্ধ, ডাইনিং হলও বন্ধ, বাইরে খেতে হয়। তো আমি নিউমার্কেট থেকে একটু আড্ডা মেরে হলে ফিরেছি ২৫ মার্চ রাত আটটার দিকে। হলে ফিরে গোসল করেছি, গোসল করে লুঙ্গি পরা হাফ শার্ট গায়ে পায়ে স্পঞ্জের স্যান্ডেল, খেতে বেরিয়েছি। মেডিক্যাল এবং ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিভার্সিটির মাঝখানে ‘পপুলার’ নামে একটা রেস্টুরেন্ট ছিল। খুব সস্তায় খাওয়া যেত। সেখানে হেঁটে হেঁটে গেলাম। ভাত খেয়ে আমি বেরিয়েছি, পান খাচ্ছি একটা দোকানে; পানটা নিয়ে সিগারেটটা ধরালাম, তখনই শুনি রাস্তায় হইচই। এই ব্যারিকেড দেয়, এই রাস্তায় গাছ কেটে রাখে; লোকজন বলাবলি করছে শহরে নাকি আর্মি ঢুকেছে- এই গুঞ্জন চারদিকে। খুব দ্রুত একটা রিকশা যাচ্ছে পুরান ঢাকার দিকে, এতো ভাগ্য মানে আল্লাহ কীভাবে জীবন রাখে, হঠাৎ আমার মনে হলো হাবিবুল্লাহর সঙ্গে দেখা করা দরকার। সে আমার স্কুলফ্রেন্ড। এফএইচ হলে থাকে ফিজিক্সে অনার্স করছে। আমি রিকশাটা দাঁড় করালাম। বললাম এফএইচ হলের কোণায় পুকুরপাড়ে নামিয়ে দাও। বললো, স্যার তাড়াতাড়ি ওঠেন, শহরে গণ্ডগোল লেগে গেছে।

তো রিকশায় উঠলাম। ও আমাকে নামিয়ে দিয়ে চলে গেল। আমি হাবিবুল্লার রুমে গিয়ে কথা বলছি; আধাঘণ্টা, এর মধ্যে গোলাগুলি শুরু হয়ে গেল, প্রচণ্ড গোলাগুলি, সারারাত ওই হলে ছিলাম ওর সঙ্গে। ২৬ তারিখ সারাদিন কারফিউ। ২৭ তারিখ সকালে কারফিউ ভাঙলো। আমি এফএইচ হল থেকে বের হলাম। এসএম হলের পাশ দিয়ে ব্রিটিশ কাউন্সিলের মাঝখান দিয়ে যে রাস্তাটা সেখান দিয়ে ইকবাল হলেও দিকে যাচ্ছিলাম। দেখি মাঠে অন্তত ৫০টার মতো লাশ পড়ে আছে। আমি তো অস্থির! তাড়াতাড়ি হলে ঢুকে রুমে গেলাম। আমাদের যেসব রুমে তালামারা ছিল সেগুলো ভাঙেনি। যেগুলো খোলা ছিল ওখান থেকে ছেলেদের ধরে নিয়ে মাঠে দাঁড় করিয়ে গুলি করে মেরেছে। আমার রুম তো তালা দেওয়া ছিল। আমি দ্রুত সুটকেস গুছিয়ে হল থেকে বেরিয়ে যেই গেটের কাছে এসছি তখন দেখি নির্মলেন্দু গুণ আমার হলের দিকে আসছে। আমাকে দেখে সে দৌড়ে এসে বুকে জড়িয়ে ধরে বললো, আমি তো তোমার ডেড বডি দেখার জন্য এসছি। বাড়ি ফিরে তোমার আব্বাকে গিয়ে বলতে পারবো, স্যার আমি দেখে এসেছি হেলালের মৃত দেহ। তুমি কী করে বেঁচে আছো? 

এই তো ঘটনা। দুজন সেদিন অনেকক্ষণ কাঁদলাম, দুজনেরই কান্না থামে না, মানে আনন্দের কান্না আরকি, জীবন ফিরে পাওয়ার কান্না। 

শিহাব শাহরিয়ার: আপনার আরেকটি ছোট কবিতা কিন্তু খুব পাওয়ারফুল; পাঠকের মুখে মুখে উচ্চারিত হয়- ‘নিউট্রন বোমা বোঝ মানুষ বোঝ না’- একটু ব্যাখ্যা করবেন। 

হেলাল হাফিজ: আমি তখন ‘দৈনিক দেশ’ পত্রিকার সাহিত্য সম্পাদক। সাহিত্যপাতা বের হতো রোববারে। রাতে আমি একটু প্রেসক্লাবে আড্ডা মেরে ভাত খেলাম। ভাত খেয়ে সাহিত্য পাতার ফাইনাল মেকআপটা দেখার জন্য, তখন তো কম্পিউটার আসে নাই, সব হাতে, অফসেটে গিয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে, তো সাহিত্যপাতা দেখার জন্য নিউজরুমে গিয়ে বসলাম। হঠাৎ দেখি আমার পাশে যে সাব-এডিটর বসে অনুবাদ করছে তার সামনে একটা নিউজ। নিউজটা হলো নিউট্রন বোমা নিয়ে। অর্থাৎ আমেরিকা নিউট্রন বোমা আবিষ্কার করেছে। এর বিশেষত্ব হলো, অন্যান্য যে কোনো আণবিক বোমা যেখানে মারবে সেখানে মানুষ তো মারা যাবেই, সব প্রাণী মারা যাবে, সঙ্গে ঘরবাড়ি দালাকোঠা সব চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যাবে। নিউট্রন বোমার বিশেষত্ব হলো, শুধু প্রাণী মারা যাবে, কোনো অবকাঠামোর ক্ষতি হবে না। মানে কতো ভয়ঙ্কর এবং নির্মম হলে মানুষ এরকম বোমাও আবিষ্কার করতে পারে! তো এই ভাবনা আমাকে অসম্ভব একটা তাড়নার মধ্যে ফেলে দিলো। মানুষ এতো নির্মম যে অবকাঠামো থাকবে কিন্তু প্রাণ নষ্ট হয়ে যাবে! ওখান থেকে এটা আমার মাথায় এসছে। 

তো এটা আমি পাঁচ-ছয় লাইন বোধহয় লিখেছিলাম কিন্তু আলটিমেটলি আমি এটাকে আরো শৈল্পিক রাখার জন্য ভাবলাম, বাড়তি কথাগুলোর দরকার নাই। এই কবিতা দুই লাইনই যথেষ্ঠ। এবং আমি কিন্তু ওখানে প্রশ্নবোধক চিহ্ন দেই নাই। ‘মানুষ বোঝ না’ বলে বিস্ময়বোধক চিহ্ন দিয়েছি। (আগামী পর্বে সমাপ্য)

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়