ঢাকা     শুক্রবার   ১২ আগস্ট ২০২২ ||  শ্রাবণ ২৮ ১৪২৯ ||  ১৩ মহরম ১৪৪৪

বাঙালি মুসলমানের মন: স্বার্থকতা ও সীমাবদ্ধতা

কাজল রশীদ শাহীন || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১২:৫৯, ২৯ জুলাই ২০২২   আপডেট: ১৩:১০, ২৯ জুলাই ২০২২
বাঙালি মুসলমানের মন: স্বার্থকতা ও সীমাবদ্ধতা

‘বাঙালি মুসলমানের মন’ প্রবন্ধে আহমদ ছফাকৃত গুরুত্বারোপ যেমন কৌতূহলোদ্দীপক, তেমনই বিস্ময়জাগানিয়া। বেশ কয়েকটি প্রসঙ্গ হাজির-নাজেল হলেও মুখ্য বিষয় হলো এই সমাজের প্রতিনিধিত্বকারী মানুষের দোদুল্যমানতা-সিদ্ধান্তহীনতা এবং কাণ্ডজ্ঞান ও বিচার বিবেচনা বোধের অপ্রতুলতা।

সময় বিচারে বাঙালি মুসলমানের ইতিহাসের পরম্পরা হাজার বছরের না হলেও কয়েক শতাব্দীর। তারপরও তার নেই নিজস্ব চিন্তাচর্চার অভ্যাস এবং বিশ্ববীক্ষার লক্ষণসমূহ। যদিও আহমদ ছফা আলোচ্য প্রবন্ধে ‘বিশ্ববীক্ষা’ শব্দের প্রয়োগ করেননি। কিন্তু সমস্যার মূলে যে এই বিষয়টিও গভীরভাবে যুক্ত তা কোনোপ্রকারেই অস্বীকার করার উপায় নেই।

বুদ্ধিজীবী ছফার সর্বাধিক আলোড়িত প্রবন্ধ ‘বাঙালি মুসলমানের মন’ হলেও সর্বশ্রেষ্ঠ ও প্রধান প্রতিনিধিত্বকারী নয়। এ ক্ষেত্রে এগিয়ে রয়েছে ‘সাম্প্রতিক বিবেচনা: বুদ্ধিবৃত্তির নতুন বিন্যাস’। এবং এটিই তাঁর ‘সিগনেচার’ প্রবন্ধ হিসেবে মান্যতা পাওয়ার যোগ্য ও যথোপযুক্ত। অবশ্য এই লেখার মূলস্বর এতদ্বিষয়ক নয়। আজকের লেখা ‘বাঙালি মুসলমানের মন: স্বার্থকতা ও সীমাবদ্ধতা’ প্রসঙ্গে। 

১৯৭৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে লেখা ও প্রকাশ ঘটে আলোচ্য প্রবন্ধের। পরে আরও কয়েকটি প্রবন্ধ সহযোগে ‘বাঙালি মুসলমানের মন’ নামে গ্রন্থরূপে প্রকাশিত হয় ১৯৮১ সালে। পঞ্চাশ ছুঁইছুঁই (প্রকৃতার্থে এ মুহূর্তে চলছে ৪৭ বছর) প্রবন্ধটি শুধু দুই প্রজন্মকে আলোড়িত করেনি, পূর্বজ ও সতীর্থদের মনোযোগ কেড়েছে সমানভাবে। একটি জাতিগোষ্ঠীর ঠিকুজি ধরার অনুপম এক সাক্ষ্য আলোচ্য প্রবন্ধ। যার মধ্য দিয়ে প্রাবন্ধিক হয়ে উঠেছেন টিরোসিয়াসের মতো ত্রিকালদর্শী। দৃষ্টি রেখেছেন মুখ্যত অতীতে। গভীর পর্যবেক্ষণে সেখান থেকেই আহরণ করেছেন প্রয়োজনীয় রসদ। বুঝতে চেয়েছেন বাঙালি মুসলমানের বর্তমান বাস্তবতার নেপথ্যের কারণ। তাঁর এই অনুসন্ধান নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে রয়েছে নানা মত, দ্বিধান্বিত এক মূল্যায়ন। প্রতিক্রিয়াশীল ও রক্ষণশীল গোষ্ঠীর প্রতিভূরা ছফার বক্তব্যের শুধু ভিন্ন অর্থ দাঁড় করাননি, নানা ঘটনার জন্ম দিয়ে বিষয়টিকে বিড়ম্বনা ও বিব্রতকর অবস্থার দিকে ঠেলে দিয়েছেন। সেইসময় ছফা বিড়ম্বিত-বিব্রতকর ও অস্বস্তির এই অধ্যায়ে দুই-একটা প্রসঙ্গের জবাব দিলেও উপেক্ষা ও অনাগ্রহ জারি রেখে সৃষ্টি করেছিলেন অনন্য এক নজির। 

আলোচ্য প্রবন্ধের স্বার্থক দিক হলো প্রাবন্ধিক জাতিগত ও ধর্মীয় দিক অবলোকনপূর্বক একটা জাতিগোষ্ঠীর প্রধান পাঁচটি দুর্বল দিক নির্মোহ ও পক্ষপাতহীনভাবে চিহ্নিত করতে সক্ষম হয়েছেন। এগুলো হলো: 

এক. জাতিগতভাবেই বাঙালি মুসলমানের মন স্থির চিত্তের নয়। সর্বদা দোদুল্যমানতায় আক্রান্ত। পরনির্ভরশীলতা এদের সহজাত ও মজ্জাগত। নিজস্ব বিচার বুদ্ধি নেই বললেই চলে।
দুই. বাঙালি মুসলমানের কোনো প্রকার পক্ষপাত নেই নতুন চিন্তার প্রতি। এ ব্যাপারে তাদের আগ্রহ ও কৌতূহল একেবারে তলানিতে। ফলে, নতুন কিছু আবিষ্কার কিংবা উদ্ভাবন নয়, পুরাতনকেই আঁকড়ে ধরতে তারা পারদর্শী ও বিশেষভাবে উৎসাহী। নতুন কিংবা স্বাধীনচিন্তা করতে অনাগ্রহী হওয়ায় তারা বেশীরভাগ ক্ষেত্রে প্রতিক্রিয়াশীল, কিছু ক্ষেত্রে রক্ষণশীল। প্রগতিশীলতায় তাদের উপস্থিতি বিরল।
তিন. বাঙালি মুসলমানের মন সময়ের সঙ্গে পরিবর্তনশীল না হওয়ায় আজও আটকে আছে, ‘প্রাগৈতিহাসিক যুগের আদিম কৃষিভিত্তিক কৌমসমাজের মধ্যে।’
চার. বাঙালি মুসলমান আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের আবিষ্কার ও প্রযুক্তির বিস্ময়কর সব সাফল্যের সুবিধাভোগী হলেও এসব ক্ষেত্রে অবদান রাখতে তাঁর আগ্রহ শূন্য, উপরন্তু রয়েছে নিজেদের ব্যর্থতা ও অযোগ্যতা ঢাকার নানামাত্রিক প্রয়াস।
পাঁচ. আহমদ ছফা বাঙালি মুসলমানের জড়বৎ-আদিম অবস্থার পেছনে জাতিগত কিংবা ধর্মীয় পরিচয়কে দায়ী করেননি। দায়ী করেছেন ‘একটি ঐতিহাসিক পদ্ধতি’কে। এই ‘ঐতিহাসিক পদ্ধতি’ বলতে তিনি মূলত বুঝিয়েছেন দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যমান থাকা স্থবির-অনুকরণপ্রিয় সংস্কৃতি ও সৃজনশীলতার চর্চাকে।

বাঙালি মুসলমানের মন-এর এই বৈশিষ্ট্যসমূহ অবলোকন কিংবা পর্যবেক্ষণ করেই ছফা তার দায় শেষ করেননি, এর পেছনের- নেপথ্যের কারণও তালাশ করেছেন। ধ্রুপদী বুদ্ধিজীবীর এই কোশেশ আগ্রহদ্দীপক শুধু নয়, ভীষণভাবে তাৎপর্যবাহী। ছফার বয়ান, ‘আমি (আহমদ ছফা) বাঙালি মুসলমান সমাজের সৃষ্টিকর্ম বিশ্লেষণ করে একটি সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছিলাম যে, বাঙালি মুসলমান রচিত কোন শৈল্পিক এবং দার্শনিক সৃষ্টি কোনরকম তাৎপর্য দাবি করতে পারে না। তার কারণ, এই সমাজ বাইরের দিক দিয়ে পারিপার্শ্বিক পৃথিবীর ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া, তাপে চাপে বাধ্য হয়ে অল্প-বিস্তর পরিবর্তিত হলেও তার কৌম সমাজের মনের গণ্ডীবদ্ধতার মধ্যে কোন পরিবর্তন আসেনি। বাঙালি মুসলমান সমাজের সমষ্টিগত মনের প্রসারহীনতার একটি মুখ্য কারণই আমি নির্দেশ করতে চেষ্টা করেছি। শুরু থেকেই বাঙালি মুসলমান সমাজ রাষ্ট্রযন্ত্রের সঙ্গে কোনভাবেই সম্পর্কিত ছিল না বলেই তার মনের ধরন-ধারণটি অশ্বখুরাকৃতি হ্রদের মত থেকে গেছে। মানুষের চিন্তা করার ক্ষমতাই তার জাগতিক অগ্রগতির উৎস। বাঙালি মুসলমান চিন্তাই করতে শেখেনি। তার কারণ, কখনো সে রাষ্ট্রযন্ত্র পরিচালনা করার অধিকার পায়নি। একটি রাষ্ট্রগঠনের মাধ্যমে একটি সমাজ বিশ্ব সমাজের অংশে পরিণত হয় এবং বিশ্বসভায় একটি আসন অধিকার করে।’

এক্ষণে মনে রাখা প্রয়োজন ছফা যখন একথা বলেছেন- ‘বাঙালি মুসলমানের মন’ প্রবন্ধ লিখেছেন অর্থাৎ ১৯৭৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে, ততদিনে বাঙালির রাষ্ট্র নির্মাণের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা হয়েছে, যদিও তা একেবারে সদ্য ভূমিষ্ঠ। এ কারণে এই রাষ্ট্র নির্মাণের সুফল কিংবা অভিজ্ঞতা-অর্জনকে বাঙালি মুসলমান কীভাবে-কীরূপে ব্যবহার করে, তার জাতিগত ও সাংস্কৃতিক বিকাশ ত্বরান্বিত করে সেসব নিয়ে কিছু বলার সময় তখনও আসেনি। কিন্তু এখন সেই সময় হয়তো কিছুটা হলেও এসেছে, কারণ রাষ্ট্র নির্মাণের অভিজ্ঞতায় বাঙালি পেরিয়ে এসেছে সুবর্ণজয়ন্তীর মাহেন্দ্রক্ষণ। যে কোনো রাষ্ট্রের কাছে পঞ্চাশ বছর সময় খুব বেশি না হলেও একেবারে ফুঁ দিয়ে হাওয়ায় মিলিয়ে দেওয়ারও নয়। কারণ এই সময়ের মধ্যে বিশ্বের বেশ কয়েকটি রাষ্ট্রের রয়েছে সমৃদ্ধ বিনির্মাণ ও জাতিগত অভিমুখ তৈরির সমীহ ও সম্মান জাগানিয়া নজির। 

ছফা ‘বাঙালি মুসলমানের মন’ প্রবন্ধেই স্পষ্ট করেই সাক্ষ্য দিয়েছেন, বাঙালি মুসলমানের উল্লেখ করার মতো কোনো  কীর্তি ছিল না। কিন্তু বাঙালি মুসলমান একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে একটি জাতীয় রাষ্ট্রের জন্ম দিয়েছে। এটাই তার সবচাইতে বড় এবং অবিস্মরণীয় কীর্তি। এ কীর্তির পাশে অন্যবিধ কীর্তিগুলো ম্লান হয়ে যায়। বাঙালি মুসলমান রাষ্ট্রের অভিজ্ঞতায় অর্ধশতক করলেও তার ‘মন’ পরিবর্তিত হয়নি একরত্তি পরিমাণও। বিশেষ করে ছফার অন্বেষিত-অবলোকিত ‘মন’। পঞ্চাশ বছরের নিজস্ব রাষ্ট্র পরিক্রমণ ও ভ্রামনিক অভিজ্ঞতায় জমা হয়েছে কেবলই  কালো কালো মেঘ। বাঙালি মুসলমানের মন হাঁটেনি ‘বাঙালিত্ব’র পথে। যদিও সে কাগজে কলমে ও নাগরিক পরিচয়ের জাতীয়বাদে বাঙালির মুকুট পরেছে। বাঙালি মুসলমান বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রে বসবাস করলেও তার গৌরব অন্বেষিত হয় অন্য ভূ-ভাগ থেকে। ছফার পর্যবেক্ষণ দানবীয় এক সত্যরূপে হাজের-নাজেল রয়েছে বাঙালি মুসলমানের অন্তর্জগতজুড়ে। ভি. এস. নাইপল যেমনটা বলেছেন, ‘বাঙালি মুসলমান বাংলাদেশে বসবাস করলেও তার মন পড়ে থেকে অন্যত্র, তার দৈনন্দিন সময়ের রুটিন নির্ধারিত হয় অন্য দেশের ঘড়ির কাঁটায়।’ 

এই সংকট মোকাবিলায় যে সাংস্কৃতিক চেতনা জারি থাকার দরকার ছিল তা যেমন নেই রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে, তেমনই বৌদ্ধিক মহলেও। বাঙালি মুসলমানের মন-এর এই সংকটের পেছন অনেকগুলো কারণ বিদ্যমান। এই প্রবন্ধের সীমাবদ্ধতা হলো এতদ্বিষয়ক কোনো প্রস্তাব জারি নেই এখানে।  বিশেষভাবে উল্লেখ হওয়ার মতো বিষয়গুলো হলো :
এক. বাঙালি মুসলমানের আত্ম-পরিচয়ের সংকট। বাঙালি মুসলমান কোথা থেকে কীভাবে আজকের অবস্থানে এলো তা নিয়ে সবিস্তারে কোনো অনুসন্ধান ও গবেষণা নেই। অসীম রায়, রিচার্ড ইটন, মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান, আকবর আলী খান প্রমুখের যে গবেষণা ও অনুসন্ধান তা উৎসমুখ এবং বিভিন্ন বিষয়ের সুলুকসন্ধান হিসেবে বিবেচিত হতে পারে সামগ্রিক নয়।
দুই. বাঙালি মুসলমান তার রেনেসাঁর সঙ্গে পরিচিত নয়। অথচ বেশীরভাগ জাতি- গোষ্ঠীর রয়েছে নিজস্ব রেনেসাঁ ও রিফর্মেশনের নজির।
তিন. বাঙালির স্বভাব বৈশিষ্ট্যে বুদ্ধিজীবীতার নজির হ্রস্ব ও উদাহরণযোগ্য নয়। এখানকার সৃজনশীল মানুষদের বড়ো একটা অংশ মেরুদণ্ডহীন। পদ-পদবি-পুরস্কার-ক্ষমতা ও সুবিধা হাসিলের লক্ষ্যে এরা সৃজন-মননের চর্চা করে। দলীয় বৃত্তের বাইরে বৃহত্তরর মানুষের কল্যাণে তাদের কোনো নিবেদন নেই।
চার. বাঙালি মুসলমান আত্ম মূল্যায়নে বিশ্বাসী নই। সমালোচনা এরা করতে জানে না, সহ্যও করতে পারে না। ফলে, এখান উঁচু মানের সৃষ্টি বিরল, বেশীরভাগ ক্ষেত্রে দূরাশা বৈকি।
পাঁচ. বাঙালি মুসলমানের ভেতর পরিবর্তনকামী সত্তার বিকাশ ও বসবাস নেই। তার রাষ্ট্রীয় চারিত্র্যও একইরূপের, ফলে রাষ্ট্রের অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ হয়েও তার আত্মপরিচয়ের সংকট যেমন রয়ে গেছে, তেমনি বিশ্বসভায় জ্ঞানে-বিজ্ঞানে-দর্শনে মাথা তুলে দাঁড়াবার শক্তিতেও সে বামন বৃক্ষসম। বাঙালির সাংস্কৃতিক বোধ-চর্চা ও চেতনায় এসব ডিঙানোর চেষ্টা নেই, উপরন্তু রয়েছে আত্মম্ভরিতা ও স্তুতিচর্চার বল্গাহীন প্রতিযোগিতা- ফেসবুকে কালচারে যার বল্গাহীন প্রতিযোগিতা প্রতিনিয়ত লক্ষ্যণীয়।

উপর্যুক্ত বৈশিষ্ট্য ছাড়াও অবাক করার মতো অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য রয়েছে বাঙালি মুসলমানের। আবুল হুসেন ‘বাঙালি মুসলমানের শিক্ষা সমস্যা প্রবন্ধে লিখেছেন, ‘কেন মুসলমানের এই দুর্গতি? এই প্রশ্নের উত্তর এককথায় দিতে গেলে বলতে হবে আমাদের শিক্ষা নাই, জ্ঞানের সঙ্গে বহুদূর ক্ষতি ও বিরোধ করে বসেছি এবং বিজ্ঞান ও আর্টকে আমাদের শিক্ষা কেন্দ্র হতে গলাধাক্কা দিয়ে বের করে দিয়েছি, এই ভয়ে, পাছে তাতে আমাদের ধর্ম নষ্ট হয়। ধর্ম আমাদের এতই নাজুক।’

বাস্তবতা হলো বাঙালি মুসলমান তার সমস্য সম্পর্কে অবহিত হলেও তার সমাধানে আগ্রহী নয়। ভাবখানা এমন সমাধান বুঝি প্রাকৃতিকভাবে সম্পন্ন হবে। সমস্যাকে সে দেখেও না দেখার ভান করে। আর দৈবাৎ যদি সমস্যার মুখোমুখি হয়েও যায়, তাহলে তার প্রকৃত ও দীর্ঘমেয়াদি সমাধান না করে গোঁজামিল দিয়ে পরিস্থিতি সামলানোর চেষ্টা করে। ফলে সমস্যা এখানে মহীরুহ রূপেই বিরাজমান থাকে।

কাজী মোতাহার হোসেনের ‘আনন্দ ও মুসলমান গৃহ’ প্রবন্ধটির অংশবিশেষ এ প্রসঙ্গে সবিশেষ উল্লেখের দাবি রাখে। তিনি লিখেছেন : ‘মুসলমান গান গাইবে না, ছবি আঁকবে না, এককথায় মনোরঞ্জনকর ললিতকলার কোনো সংশ্রবেই থাকবে না। মুসলমান পুরুষেরা কেবল কাজ করবে, আর ঘর শাসন করবে; মেয়েরা কেবল রাঁধবে, বাড়বে, আর সে স্বামীর পা টিপে দিবে; তা’ ছাড়া  খেলাধুলা, হাসি-তামাসা বা কোনও প্রকার আনন্দ তারা করবে না। সব সময় আদব-কায়দা নিয়ে দুরস্ত থাকবে।
আনন্দ? কোথায় আনন্দ? কি হবে আনন্দে? মুসলমান তো বেঁচে থাকতে আনন্দ করে না, সে মরে গিয়ে বেহেশতে প্রবেশ করে পেট ভরে খাবে, আর হুরপরীদের নিয়ে অনন্তকাল ধরে আনন্দ করবে। ব্যস! এই তার সান্ত্বনা! গৃহে যখন আমাদের থাকতেই হবে, তখন আমরা এর সংস্কারেও লেগে যাই না কেন? সমাজকে যখন আমরা বাদ দিতে পারি না, তখন একে সরস শোভন এবং আনন্দময় করেই গড়ে তুলি না কেন?’

বাঙালি মুসলমানের ভেতর যেহেতু যুক্তির চেয়ে আবেগ বড়ো এবং গোঁজামিল দেয়াকেই কর্মজ্ঞান করেন একারণে তার ভেতরে প্রশ্ন নেই। প্রশ্ন না থাকলে কোনো জাতিই যে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারে না, আত্মপরিচয় নির্মাণ ও আত্মমর্যাদা প্রতিষ্ঠা করতে পারে না, তা বুঝলেও এসবে হেলদোল নেই, উপরন্তু রয়েছে যুক্তি ছাড়া মেনে নেয়ার প্রবণতা।

আহমদ ছফা বাঙালি মুসলমানের ইত্যকার সব সীমাবদ্ধতার পরও এর জন্য কাউকেই দায়ী করেননি। তাঁর বয়ান :
‘বাঙালি মুসলমানের মন যে এখনো আদিম অবস্থায় তা বাঙালি হওয়ার জন্যও নয় এবং মুসলমান হওয়ার জন্যও নয়। সুদীর্ঘকালব্যাপী একটি ঐতিহাসিক পদ্ধতির দরুন তার মনের উপর একটি গাঢ় মায়াজাল বিস্তৃত রয়েছে, সজ্ঞানে তার বাইরে সে আসতে পারে না। তাই এক পা যদি এগিয়ে আসে, তিন পা পিছিয়ে যেতে হয়। মানসিক-ভীতিই এ সমাজকে চালিয়ে থাকে। দু’ বছরে কিংবা চার বছরে হয়ত এ অবস্থার অবসান ঘটানো যাবে না, কিন্তু বাঙালি মুসলমানের মনের ধরন-ধারণ এবং প্রবণতাগুলো জানার চেষ্টা করলে এ অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার একটা পথ হয়ত পাওয়াও যেতে পারে।’ 

আমরা মনে করি প্রাবন্ধিকের এই উপসংহার সন্তোষজনক নয় এবং এটাকে সীমাবদ্ধতা হিসেবে জ্ঞান করায় যুক্তিযুক্ত হবে। কেবল ঐতিহাসিক পদ্ধতির ওপর দায় চাপিয়ে ছফা কাদের দায়মুক্তি দিলেন এবং কেন দিলেন সেই প্রশ্ন রয়েই গেল। 

আহমদ ছফার ‘বাঙালি মুসলমানের মন’ পরিবর্তিত হয়নি। অবশ্য হয়নি বললে সত্যকে আড়াল করা হবে। পরিবর্তন হয়েছে ইতিবাচক অর্থে নয়, নেতিবাচকতায়। আঁধার কালো এক মেঘ প্রতিনিয়ত জমা হচ্ছে বাঙালি মুসলমানের মনের পরতে পরতে। যার কারণ আমরা চকিতে দেখার চেষ্টা করা হয়েছে। 

‘বাঙালি মুসলমানের মন’র বয়স প্রায় পঞ্চাশের কাছাকাছি। যে প্রবন্ধের স্বার্থকতা অনেক, কিন্তু সীমাবদ্ধতা কিঞ্চিত হলেও তা গুরুত্বপূর্ণ। ছোট্ট এক প্রবন্ধে তিনি চিহ্নিত করেছিলেন একটা জাতির-ধর্ম সম্প্রদায়ের কয়েক শতাব্দীর অন্তর্গত সমস্যা, জিইয়ে রাখার জন্য নয়, মুক্তির লক্ষ্যে। ছফার বুদ্ধিজীবীতার সকল কোশেশও জারি ছিল সেই লক্ষ্যেই, কিন্তু ছফার সাধনা পূর্ণ হয়নি, রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পঞ্চাশেও বাঙালি মুসলমানের মন প্রশ্ন করতে ভয় পায়। সত্যের মুখোমুখি হতে, যুক্তির লড়াইকে মোকাবিলা করতে, নতুন চিন্তা-বিজ্ঞান ও মানবতাবাদের সঙ্গে একাত্ম হতে এখনও বাঙালি মুসলমান সন্দিগ্ধ-সন্দেহবাতিকগ্রস্ত। 

এ কারণে তার মুক্তি তো ঘটেইনি উপরন্তু নানা কুসংস্কারের জগদ্দল পাথরে সে হলুদাভ প্রাণ, যাতে নেই সবুজের কোনো উদ্যম-আবেগ ও উচ্ছ্বাস, নেই-রাষ্ট্র-সমাজ ও ব্যক্তির মুক্তির কোনো প্রার্থনা সঙ্গীত।
 

/তারা/ 

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়