ঢাকা     মঙ্গলবার   ২১ মে ২০২৪ ||  জ্যৈষ্ঠ ৭ ১৪৩১

ডেকেছে দূর নক্ষত্রের দেশ 

অনিকেত সুর  || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৪:০৩, ১০ মে ২০২৩   আপডেট: ১১:২২, ১৪ জুন ২০২৩
ডেকেছে দূর নক্ষত্রের দেশ 

বাঙালির লোকসংস্কৃতি ও সভ্যতার শেকড়চারী সচেতন যে কোনও প্রেমিক মানুষের কাছে বোশেখের তাৎপর্য অমেয়। আমাদের নববর্ষ এবং সেইসঙ্গে বাংলা সংস্কৃতি ও সাহিত্যের প্রাণপুরুষ রবীন্দ্রনাথের জন্ম এই বোশেখেই। রবীন্দ্রজয়ন্তী আমাদের প্রাণের উৎসব। আমি তো তাঁর জন্মদিনে অন্য সবকিছু ভুলে থাকি। তবে এবারের পঁচিশে বৈশাখ প্রায় বিপরীতধর্মী দু’টি ঘটনার সাক্ষী হয়ে রইল। রবীন্দ্রজয়ন্তী পালনের মধ্যেই এলো একটি বড় শোকের খবর। দুই বাংলার জনপ্রিয় লেখক, ঔপন্যাসিক সমরেশ মজুমদার মারা গেছেন। কলকাতার একটি পত্রিকার মারফত গতমাসেই তাঁর অসুস্থ হবার সংবাদটি অবগত হয়েছিলাম। আশা করেছিলাম, সুস্থ হয়ে ফিরে আসবেন, তাঁর সব্যসাচী কলম আবার সচল হয়ে উঠবে, ঠিক যেভাবে সচল ছিলেন অসুস্থ হবার আগ পর্যন্ত। শেষবার তাঁর একটি ছোটগল্প পড়েছিলাম এক অনলাইন পত্রিকায়। গত বছর নভেম্বরে। বরাবর যেমন হয় তাঁর লেখা, তেমনই সহজ সরল ঢং। গল্পটির নাম ছিল ‘স্থির আনন্দ’। লেখার এই সহজ ভঙ্গি আর বিষয়বস্তুর সরস উপস্থাপনার কারণেই সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের মতো তিনি দু’বাংলাতে সমান জনপ্রিয় হয়ে ছিলেন।        

ইশকুল জীবন পর্যন্ত তাঁর কোনও লেখার সঙ্গে আমার পরিচয় ঘটে নি। কলেজকালীন তাঁর প্রথম যে লেখাটা পড়ি, খুব সম্ভবত সেটির নাম ‘আট কুঠুরী নয় দরজা’, একটা কিশোর থ্রিলার। পড়েছিলাম ঢাকা কলেজের লাইব্রেরিতে বসে। এরপর ভারতীয় তথ্যকেন্দ্রের পাঠাগারে ‘অর্জুন সমগ্র’র একটি খণ্ড। তখন পড়ার আনন্দে পড়তাম। লেখকের লেখা বিশ্লেষণের মানসিক অবসর ছিল না। পরে নিজে যখন একটু-আধটু লিখতে শুরু করি, কিছু লেখকের বিশাল লেখার ভাণ্ডার নিয়ে রীতিমত অবাক হবার পালা আমার! এই তালিকায় সুনীল-সমরেশ দু’জনেই ছিলেন। 

বোঝা যায়, দু’জন খেটেছেন হারকিউলিসের মতো। বাস্তব অভিজ্ঞতার সঙ্গে তাঁদের দু’জনের মধ্যেই ছিল অশ্বখুর কল্পনাশক্তি। ভেবেছি, সার্বক্ষণিক লেখার মধ্যে ডুবে না থাকলে এমন বিশালায়তন লেখা দাঁড় করানো সম্ভব নয়। তো এঁরাই আবার সংসার করেছেন, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা জমিয়েছেন, চাকরিও করেছেন। কলম চালনার পাশাপাশি কল্পনাকেও দ্রুতগতিতে চালিয়ে তরতর ক’রে লেখা এগিয়ে নেওয়া- খুব শক্তিমান না হলে সম্ভব নয়। এ প্রসঙ্গে রুশ ঔপন্যাসিক দস্তয়েভস্কির একটা কথা মনে পড়ছে। তাঁর আত্মজৈবনিক উপন্যাস ‘বঞ্চিত-লাঞ্ছিত’র শুরুতে বলেছেন: ‘লেখার চেয়ে ঐ লেখা নিয়ে নিজের মনে নাড়াচাড়া করতে করতে আগুপিছু পায়চারী করা আমার অভ্যাস, কী হবে, হতে যাচ্ছে উপন্যাসে, এই নিয়ে ভাবনা। এতে ক’রে লেখা আরম্ভ করতে দেরী হয়, লেখার গতি কমে যায়...।’ 

অতএব, যথার্থ কারণেই আমরা দেখতে পাচ্ছি, দস্তেয়ভস্কি সারাজীবন যা লিখেছেন, সমরেশ মজুমদার লিখেছেন আয়তনে তার চেয়ে কয়েকগুণ। 

সচরাচর আমাদের এখানে দেখি, বড়দের উপন্যাস যাঁরা লিখেছেন, ছোটদের জন্য, কিশোরদের জন্য তাঁরা তেমন কিছু লেখেন নি। বা তাঁদের সেই সময় হয় নি। সুনীলের মতো সমরেশ মজুমদারও বড়দের জন্য লেখার পাশাপাশি ছোটদের লেখা লিখেছেন সমান তালে। এবং দুই ভিন্ন বয়েসীদের জন্য লিখতে গিয়ে প্রকরণগত সীমাটাও যথাযথ মেনে চলেছেন। এটা সহজ কাজ নয়। এ বিষয়ে আমাদের দেশের লেখকদের মধ্যে কেবল মঞ্জু সরকারের নামই তুল্য উদাহরণ হিসাবে উচ্চারণ করা যায়।

বলতে ভালো লাগে, সমরেশ মজুমদার খুব বন্ধুবৎসল আর দারুণ আড্ডাপ্রিয় মানুষ ছিলেন। বাঙালি লেখক আড্ডাবাজ হবে না, তা কী ক’রে হয়! আর একগাদা ইয়ার-দোস্ত যদি না থাকে, তবে মজা কোথায়! ‘দেশ’ পত্রিকায় প্রথম গল্পটি ছাপা হবার পর যে পনেরো টাকা সম্মানী পেয়েছিলেন, পুরোটাই কফির টেবিলে উড়িয়ে দিয়েছিলেন বন্ধুবান্ধবসহ। সেই ১৯৬৭ সালে পনেরো টাকার দাম কিন্তু কম নয়। তখন এক টাকারও অনেক মূল্য ছিল। তো এরপর থেকে বন্ধুরা তো চড়াও হলো সমরেশের ওপর। না, আরও আরও গল্প লিখতে হবে। বন্ধুদের খাওয়ার লোভ এবং ওদের খাওয়ানোর লোভেই লিখতে লাগলেন একের পর এক গল্প। গল্প লিখছেন একদিকে, অন্যদিকে প্রাপ্ত সম্মানী প্রিয় ইয়ার-দোস্তদের নিয়ে উড়িয়ে দিচ্ছেন কফির টেবিলে। আমরা হয়তো এখন কল্পনাও করতে পারি না, ষাটের দশকটা সংস্কৃতির জগতের মানুষদের নানা আড্ডার ভেতর দিয়ে কেমন প্রাণবান আর জীবন্ত হয়ে উঠেছিল। এই আড্ডার সূত্র ধরেই রচিত হতো গান, নাটক, কবিতা, গল্প। সেই মাতাল দশকের উচ্ছ্বল তরুণেরা একে একে হারিয়ে গেছে, কিন্তু তাঁদের চঞ্চল উদ্দাম প্রাণের মিলিত সুর এখনও ভেসে বেড়ায় বাতাসে। কান পাতলেই শোনা যায়। সমরেশ মজুমদার ছিলেন সেই উত্তাল সময়েরই একজন প্রতিনিধি। 

তাঁর বিখ্যাত ‘উত্তরাধিকার’, ‘কালবেলা’, ‘কালপুরুষ’, সাতকাহন’ পড়েছিলাম আরও পরে। আমি তখন কলেজ জীবনের সমাপনী পরীক্ষা দিয়ে ফেলেছি। ‘উত্তরাধিকার’-এর মূল চরিত্র অনিমেষের পঙ্গু জীবনটা ভালো লাগে নি। তখনও আমার ভেতরে গল্পের নায়ককে নিয়ে একটা রোমান্টিক ভাবাদর্শের বাতাবরণ বজায় ছিল। নায়ক কেন এতো অসহায় হবে! তবে পরবর্তীতে অবশ্য এটা কেটে গেছে। সমরেশ বাস্তবতার বাইরে তাঁর গল্পের পাত্র-পাত্রীদের কোনও উন্মার্গচারিতার রাজ্যে নিয়ে যেতে চান নি।  এবং লেখক হিসাবে তিনি যথোপযুক্ত কাজটিই করেছেন। তাঁর লেখায় কেউ কেউ পুরুষবাদিতার গন্ধ শুঁকে বেড়িয়েছেন। আমার প্রত্যয়, এও এক ভ্রান্ত অন্যায্য সন্ধান। লেখক তো একটা বিশেষ সমাজ ও কালের সঙ্গে যুক্ত। সেই সমাজ ও কালে ঘটনার পাত্র-পাত্রীদের চরিত্র যেমন হয়, সেভাবেই তাদের উপস্থাপন করা তাঁর কাজ। তিনিও তাই করেছেন। পুরুষের আধিপত্যকামিতা মানসিক সংকীর্ণতা ও ঈর্ষাপরায়ণতার প্রতিষ্ঠা বিদ্যমান সমাজের সঙ্গে যুক্ত ক’রে যথাসঙ্গত প্রাসঙ্গিকভাবে পেশ করেছেন। এতে পুরুষবাদী গন্ধ খুঁজে পাওয়া এক ভুল প্ররোচনা। 

সমরেশ উদার মানবতাবাদী, তবে সুনীলের মতো বিদ্রোহী নন। ‘রাধাকৃষ্ণ’ পড়ার মধ্য দিয়ে আমার সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের লেখার পাঠ শুরু হয়েছিল, যেখানে তিনি কৃষ্ণকে বর্ণনা করেছেন এক দুরাচারী লম্পট চরিত্র হিসাবে। এই বর্ণনা প্রচলিত সংস্কার ও বিশ্বাসের সঙ্গে দ্বান্দ্বিক, যদিও তিনি সঠিক কাজটি করেছেন। বিপরীতে সমরেশ তাঁর কোনও লেখায় প্রচলিত সংস্কারের পক্ষে বা বিপক্ষে যান নি। কিন্তু তাঁর লেখা প’ড়ে ধীরে ধীরে পাঠক একটা সংস্কারবর্জিত আধুনিক মানুষ হয়ে ওঠার প্রস্তুতি নিতে পারে। 

উপন্যাস-সাহিত্যে সমরেশ দান করেছেন দুই হাতে। তাঁর সঙ্গে তাঁর প্রজন্মের কলকাতার আরও বেশ কিছু সাহিত্যিক এই ধারা সমৃদ্ধ করেছেন। পশ্চিমবঙ্গের উপন্যাস-সাহিত্য যে কোনও বিবেচনায় বাংলাদেশের উপন্যাসের চেয়ে শক্তিশালী, গুণগত ও সংখাগত, উভয় বিচারেই। এ কারণে পশ্চিমবঙ্গের লেখকদের লেখা এই বাংলার লেখকদের চেয়ে এখানে অধিক পঠিত ও জনপ্রিয়। এবং সমরেশ মজুমদার জনপ্রিয়তমদের একজন।     

তাঁর লেখার বাংলাদেশী পাঠকদের ব্যাপারে, তিনি একটা কথা বলেছেন, যেটি এখানে না বললেই নয়। বলেছেন, ‘আমি দেশের বাইরে পৃথিবীর যে-প্রান্তেই গেছি, আমার সাথে দেখা করতে এসেছেন যাঁরা, তাঁরা সবাই ছিলেন বাংলাদেশের পাঠক।’ একটা প্রজন্মের মধ্যে তাঁর লেখার উল্লেখযোগ্যসংখ্যক পাঠকগোষ্ঠী গড়ে উঠেছিল এই দেশে। বর্তমানে, নতুন প্রজন্মের ভেতর দুই বাংলাতেই বাংলা বইয়ের পাঠকসংখ্যা কমে গেছে। ইলেক্ট্রনিক বিনোদনেই ওরা পার করছে বেশী সময়।

জীবনে প্রেম সম্পর্কে জানতে চাইলে বলেন, ‘আমি যখন রবীন্দ্রনাথের গান শুনি, তখনি প্রেমে পড়ি। আমি যখন রবীন্দ্রনাথের গান গাই, তখন প্রেমে পড়ি। আমার কোনো ঈশ্বর নেই। আমি জন্মসূত্রে হিন্দু। কিন্তু কেন হিন্দু আমার বাবা তা ব্যাখ্যা করতে পারে নি, আমার পিতামহ ব্যাখ্যা করে নি। মুসলিম, খ্রিস্টানবন্ধুদের মতো আমার কোরআন বা বাইবেল নেই। অন্য যে ধর্মগ্রন্থগুলো আছে, বলা হয় সেগুলো বাঙালির নয়। তাহলে কী নিয়ে বাঁচব? এই ভাবতে ভাবতে আমি জানলাম, আমার একজন ঈশ্বর আছেন, তাঁর নাম রবীন্দ্রনাথ। তিনি প্রতি মুহূর্তে আমাকে বাঁচার রসদ জোগান। যখনই দুঃখ পাই, আমি ‘গীতবিতান’ খুলি, যখন সুখ পাই তখনো ‘গীতবিতান’ খুলি এবং আমি উজ্জীবিত হয়ে উঠি।’ 

বাংলাদেশের মানুষের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘আপনারা আমাকে দু’হাত ভরে দিয়েছেন। আমি তার কতটা যোগ্য প্রতিদান দিয়েছি আমি জানি না। আপনাদের ভালোবাসা আমাকে ঋদ্ধ করেছে। আমি বাংলাদেশে জন্মাইনি, কিন্তু আমার বুকের ভিতরে বাংলাদেশ।’ 

অখণ্ড বাংলার লোক, জনপ্রিয় এই ঔপন্যাসিক, জীবনদৃষ্টিতে ঋদ্ধ, বাঙালিপ্রেমী সমরেশ মজুদার চলে গেছেন। পেছনে রেখে গেছেন বিপুল মানুষের ভালোবাসা। এই বন্ধন ছিন্ন করেই যেতে হয়। তিনিও তাই চলে গেলেন। কারণ, ডেকেছে তাঁকে দূর নক্ষত্রের দেশ। তাঁকে জানাই অন্তিম প্রণিপাত।  

তারা//

আরো পড়ুন  



সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়