ঢাকা     শনিবার   ০২ জুলাই ২০২২ ||  আষাঢ় ১৮ ১৪২৯ ||  ০২ জিলহজ ১৪৪৩

রাইজিংবিডিতে সংবাদ: সেই স্টেশন মাস্টারকে বদলি

ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধি || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৭:৩২, ২৪ মে ২০২২   আপডেট: ১৭:৩৫, ২৪ মে ২০২২

টিকিট কালোবাজারিতে স্টেশন মাস্টার, অগ্রিম বুকিংয়েও নেন চারগুণ দাম!— এই শিরোনামে রাইজিংবিডিতে সংবাদ প্রকাশের পর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মুকুন্দপুরের স্টেশন মাস্টার হুমায়ুন কবিরকে বদলি করা হয়েছে।

মঙ্গলবার (২৩ মে) বিকেলে ঢাকা বিভাগের ২৪৫ কন্ট্রোল অর্ডার নম্বরে মুকুন্দপুর স্টেশনে ফোন দিয়ে হুমায়ুন কবিরের বদলির বিষয়টি জানানো হয়।

কন্ট্রোল অর্ডারে বলা হয়, স্টেশন মাস্টার হুমায়ুন কবিরকে মুকুন্দপুর স্টেশন থেকে আখাউড়া বাইপাস কুড্ডা স্টেশনে বদলি করা হয়েছে। এ ছাড়া হুমায়ুন কবিরের স্থলাভিষিক্ত করা হয়েছে মনতলা স্টেশন মাস্টার পরশ আলি শিকদারকে। 

হুমায়ুন কবিরের বদলির বিষয়টি রাইজিংবিডিকে নিশ্চিত করেছেন মুকুন্দপুর স্টেশনের স্টেশন মাস্টার (এসএম-৪) সাইফুল ইসলাম। 

তিনি বলেন, সোমবার বিকেলে ২৪৫ কন্ট্রোল অর্ডারের নম্বর থেকে ঢাকা বিভাগের (সিটিএনএল) মো. ওয়াসিম ফোন দিয়ে হুমায়ুন কবিরের বদলির বিষয়টি আমাকে জানান।

উল্লেখ্য, গত ৮ মে রাইজিংবিডিতে প্রকাশিত নিউজটি পড়ুন—

ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার বিজয়নগর উপজেলার পাহাড়পুর ইউনিয়নে অবস্থিত মুকুন্দপুর রেল স্টেশনের টিকিট মাস্টার হুমায়ুন কবিরের বিরুদ্ধে যাত্রীদের এন্তার অভিযোগ। যাত্রীদের দাবি, হুমায়ুন কবির নিজেই টিকিট কালোবাজারি করেন। এ ছাড়া অগ্রিম বুকিং দিলেও তিনি তিন-চারগুণ দামে যাত্রীদের কাছে টিকিট বিক্রি করেন। এমনকি কেউ এটার বিরুদ্ধে কথা বললে তাকে ‘অপদস্থ’ করেন বলেও জানা গেছে।  

স্টেশন সূত্রে জানা যায়, মুকুন্দপুর রেল স্টেশনে যাত্রাবিরতি দেওয়া একমাত্র ট্রেন জয়ন্তিকা এক্সপ্রেস। সিলেট থেকে ছেড়ে আসা ঢাকাগামী জয়ন্তিকা ট্রেনের মুকুন্দপুরে মোট আসন ২৫টি। আর ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা জয়ন্তিকার আসন ২০টি। মুকুন্দপুর স্টেশন থেকে শুধু সিলেট ও ঢাকাগামী আসনের সিট দেওয়ার নিয়ম রয়েছে। এ ছাড়া মধ্যবর্তী কোনো স্টেশনের যাত্রাবিরতির আসন দেওয়ার নিয়ম নেই এই স্টেশনে।

শনিবার (৭ মে) সরেজমিন মুকুন্দপুর রেল স্টেশনে রাইজিংবিডি প্রতিবেদকের কথা হয় কয়েকজন ভুক্তভোগীর সঙ্গে।

এর মধ‌্যে একজন হচ্ছেন মোছাম্মত ছায়েদা। ছায়েদা রাইজিংবিডিকে জানান, ঈদের ছুটি শেষে ঢাকা যেতে ছয় দিন আগে মুকুন্দপুর রেল স্টেশনে টিকিটের অগ্রিম বুকিং দেন। শনিবার নিয়ম অনুযায়ী টিকিট আনতে গেলে বাঁধে বিপত্তি। স্টেশন মাস্টার হুমায়ুন জানান, টিকিট নিতে লাগবে বাড়তি টাকা, সেটাও প্রায় চারগুণ।

ছায়েদা বলেন, স্টেশন মাস্টার ১৭০ টাকার টিকিট ৭০০ টাকা ছাড়া দেবেন না বলে আমাকে জানান। আমার বুকিং দেওয়া টিকিট ছিল; এত টাকা কেন দিতে হবে— এমন প্রশ্নে মাস্টার ছায়েদাকে বলেন, ‘টিকিট নেই। ম‌্যানেজ করে দিতে হবে’। এরপর বাধ‌্য হয়েই চারগুণ দাম দিয়ে টিকিট সংগ্রহ করেন তিনি।

এরকম অভিযোগ এই স্টেশনের প্রায় প্রত‌্যকে যাত্রীর। তারা নিয়মিত টিকিট ভোগান্তির শিকার বলেও অভিযোগ করেন। যাত্রীদের অভিযোগ, আগে থেকে বুকিং দিয়ে রাখলেও কাউন্টারে মাস্টারকে বাড়তি বা দ্বিগুণ টাকা দিলেই মেলে টিকিট। নয়তো বলেন, টিকিট নেই। 

পাহাড়পুর ইউনিয়নের বামুটিয়া গ্রামের মিজানুর রহমান। চাকরি করেন রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোতে। তিনি গত ৩০ এপ্রিল ঢাকাগামী জয়ন্তিকা এক্সপ্রেসের একটি টিকিটের জন্য বুকিং দিয়ে গেলেও গতকাল (শনিবার) স্টেশনে এসে ১৭০-এর টিকিট ৪০০ টাকায় নিয়েছেন। একইভাবে কামালমুড়া গ্রামের বাদশা মিয়া ১০ দিন আগে বুকিং দিয়েও টিকিট কেনেন ৩০০ টাকায়। ভিটিদাউদপুর গ্রামের সাইফউদ্দিন ঢাকাগামী দুটি আসনের (৩৯০) টিকিট ৭০০ টাকায় নিয়েছেন।

বেশ দাম দিয়ে কেন টিকিট নেন— এমন প্রশ্নে সবার একই কথা। বাধ‌্য হয়ে তারা টিকিট সংগ্রহ করেন। কারণ সড়ক পথের চেয়ে ট্রেনযাত্রা বেশি নিরাপদ ও আরামদায়ক বলে বেশি দামেই তারা টিকিট নেন। এ ছাড়া প্রতিবাদ করলেও স্টেশন মাস্টার বিভিন্নভাবে অপদস্থ করেন। টাকা দিলে স্টেশন মাস্টার কীভাবে টিকিটের ব্যবস্থা করেন, সেই ফিরিস্তি শোনালেন আবুল কালাম নামে এক যাত্রী। তিনি রাইজিংবিডিকে বলেন, পরিবার নিয়ে স্থানীয় কালাছড়া ঘুরতে এসেছি। ঘুরা শেষে মুকুন্দপুর স্টেশন থেকে জয়ন্তিকা ট্রেনের তিনটি টিকিট সংগ্রহ করতে যাই। কিন্তু স্টেশন মাস্টার জানালেন ‘টিকিট নেই’। এরপর বাড়তি টাকা দেওয়ার প্রস্তাব করতেই তিনি ৪৫০ টকায় শ্রীমঙ্গলের তিনটি টিকিট হাতে ধরিয়ে দেন। অথচ টিকিট তিনটির নির্ধারিত মূল‌্য ২৫৫ টাকা।  

একই অভিযোগ শোনালেন মোহাম্মাদ সালেহ নামে এক যাত্রী। পরিবার নিয়ে তিনি এক আত্মীয়ের বাড়িতে এসেছেন। ১৩ তারিখের অগ্রিম টিকিটের জন‌্য তিনি স্টেশন মাস্টারের কাছে যান। স্টেশন মাস্টার হুমায়ুন কবির তাকে আশ্বাস দেন, কিছু টাকা বাড়িয়ে দিলে টিকিটের ব্যবস্থা হয়ে যাবে।
 
স্থানীয়দের দাবি, স্টেশন মাস্টার হুমায়ুন কবিরের বিরুদ্ধে অসংখ্য অভিযোগ থাকলেও; কোনো এক অদৃশ‌্য ইশারায় তিনি বহাল তবিয়তে আছেন। 

সেজামুড়া গ্রামের বাসিন্দা সবুজ আহম্মেদ রাইজিংবিডিকে বলেন, স্টেশন মাস্টার হুমায়ুন কবিরের দুর্নীতির কারণে সাধারণরা টিকিট পাচ্ছেন না। এই মাস্টার ১০ দিন আগে বুকিং দিতে গেলেও বলেন, ‘টিকিট নেই’। আবার যারা বুকিং দিয়ে টিকিট আনতে যান, তাদের কাছ থেকে দ্বিগুণ টাকা রাখেন। তার দাবি, এই কর্মকর্তা বেশি দাম ছাড়া টিকিট দেন না। 

বিজয়নগর উপজেলা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক রাসেল খান রাইজিংবিডিকে বলেন, মুকুন্দপুর রেল স্টেশনের স্টেশন মাস্টার হুমায়ুন কবির বিভিন্ন অপকর্মের সাথে জড়িত। তিনি মাদক সেবন করেন বলেও সাধারণ মানুষের মুখে শুনেছি। মাস্টার দ্বিগুণ-তিনগুণ বেশি টাকা ছাড়া টিকিট দেয় না, অনেকেই অভিযোগ করেন। 

স্থানীয় কামালমুড়া গ্রামের রাকিবুল হাসান নামের এক ব্যক্তি ঢাকা ও সিলেটের কুলাউড়া কর্মকর্তাদের কাছে মৌখিক-লিখিত আকারে স্টেশন মাস্টারের ‘অপকর্মের’ অভিযোগও দিয়েছেন। তারা জানান, বিভিন্ন স্টেশনে কালোবাজারিরা বেশি দামে টিকিট বিক্রি করে শুনেছি। কিন্তু এই মুকুন্দপুরে স্টেশন মাস্টার নিজেই বড় কালোবাজারি। এত অভিযোগ থাকলেও কীসের ক্ষমতায় তিনি এখনও আছেন, সাধারণ জনগণ সেটা জানেন না।

অভিযোগের বিষয়ে স্টেশন মাস্টার হুমায়ুন কবির রাইজিংবিডিকে বলেন, ‘৭০০ টাকা যে টিকিটের দাম রাখা হয়েছে, এটা আমি অন্য স্টেশন থেকে এনে দিয়েছি। তাই বেশি টাকা নেওয়া হয়েছে।’ সিলেট ও ঢাকা ছাড়া মধ্যবর্তী কোনো স্টেশন থেকে টিকেট দেওয়া হয় না— আপনি নিজেই বলেছেন। তাহলে কীভাবে এনেছেন? আর টিকিটে লেখাও ছিল মুকুন্দপুর থেকে ঢাকা। তাহলে ১৭০-এর টিকিট ৭০০ টাকা কীভাবে রাখলেন; এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি ট্রেনের সিগন্যাল দেখতে হবে বলে এড়িয়ে যান। এ ছাড়া পরে ফোন দেবেন বলে কল কেটে দেন।

মাইনুদ্দীন রুবেল/এনএইচ

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়