ঢাকা     রোববার   ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ ||  মাঘ ২২ ১৪২৯

পাম চাষ করে হতাশ উদ্যোক্তারা, নেই প্রক্রিয়াকরণের সুযোগ

নূর আহমদ, সিলেট || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১২:৩৩, ১৪ অক্টোবর ২০২২   আপডেট: ১৬:০৫, ১৪ অক্টোবর ২০২২
পাম চাষ করে হতাশ উদ্যোক্তারা, নেই প্রক্রিয়াকরণের সুযোগ

সিলেটের খাদিম পাম বাগান

বৃষ্টিপ্রবন এলাকা সিলেট। এ জেলায় রয়েছে বিপুল পরিমাণ অনাবাদি জমি। এই জমিতে পাম চাষ করে তেল উৎপাদনের সম্ভাবনার গল্প শোনানো হয়েছিল উদ্যোক্তাদের। তখন অনেকেই এগিয়ে এসেছিলেন পাম বাগান করতে। কেউ কেউ শুরুও করেছিলেন পাম বাগান। শুধুমাত্র সঠিক ব্যবস্থাপনা ও পাম তেল প্রক্রিয়াকরণের অভাবে পাম চাষ  শিল্পে রূপ পায়নি। উল্টো হতাশ উদ্যোক্তারা।

সিলেটের সবচেয়ে বড় পাম বাগান শহরতলীর খাদিমপাড়া এলাকার খাদিম চা বাগানের অভ্যন্তরে। ৩০০ একর ভূমিতে ৪ হাজার গাছ লাগানো হয়েছে এই বাগানে। গাছগুলো বেশ উঁচু হয়েছে। দৃষ্টিকাড়া বাগানে প্রতিদিন ভিড় করছেন দর্শনার্থীরা। বড় গাছগুলো থেকে পাম সফল উৎপাদন হচ্ছে। স্বল্প দামে বিক্রিও হচ্ছে। তবে সিলেটে পাম তেল প্রক্রিয়াজাত ব্যবস্থা না থাকায় কোনো লাভ মিলছে না বাগান থেকে। খাদিম পাম বাগান কর্তৃপক্ষ পরিচর্যা ও ব্যবস্থপনার খরচ উঠলেও জৈন্তাপুরের উদ্যোক্তা মোহাম্মদ আলী মাক্কুর গল্প খুবই করুন।

মোহাম্মাদ আলী নিজের জমিতে লাগানো সাড়ে ৪ হাজার পাম গাছ কেটে ফেলেছেন। এখন তিনি তার জমিতে মাল্টার চারা রোপণ করেছেন।

জৈন্তাপুর উপজেলার উদ্যোক্তা মোহাম্মদ আলী মাক্কু বলেন, ‘২০০৮ সালে লাগিয়েছিলাম সাড়ে ৪ হাজার পাম গাছের চারা। ১০ বছর পরিচর্যা করে এক টাকাও আয় হয়নি। বরং, পরিচর্যা করতে গিয়ে আমার লাখ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। ঘরের গরু, নিজের স্ত্রীর স্বর্ণালঙ্কার বিক্রি করতে হয়েছে। হতাশ হয়ে তা্ পাম গাছ কেটে ফেলতে বাধ্য হয়েছি।’

তিনি আরও বলেন, ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে পাম চাষে লাভবান হওয়ার স্বপ্ন দেখায় কৃষি বিভাগ ও কিছু কোম্পানি। তাদের প্রলোভনে আমিসহ সিলেটের অনেকে পাম চাষে পা বাড়াই। একটি কোম্পানির কাছ থেকে ২৫০ টাকা দামে গাছ কিনি। ফল ধরেছিল, কিন্তু তেল প্রক্রিয়াজাত মেশিন না থাকায় তেল করা সম্ভব হয়নি। এক পর্যায়ে পঁচে নষ্ট হয়েছে ফলগুলো।’

জৈন্তাপুরের মোহাম্মদ আলীর হতাশাজনক বক্তব্য দিলেও খাদিম পাম বাগানের উদ্যোক্তা আফজাল রশীদ চৌধুরী এখনো শোনাচ্ছেন সম্ভাবনার গল্প। তিনি বলেন, ‘সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাব, সরকারের অসহযোগিতার জন্য এই সম্ভাবনাময় পাম চাষ শিল্পে রূপ নেয়নি। আমি যে পাম বাগান করেছি তা খাদিম টি স্টেটের অভ্যন্তরে। এটি চা বাগানের ভূমি।’

মীনা আফজাল ইন্ডাস্ট্রিজ এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক আফজাল রশীদ বলেন, ‘সিলেট অঞ্চলে প্রচুর টিলাভূমি রয়েছে। প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়। পাম চাষের উপযোগী জায়গা। আমার বাগানের বেশ কিছু জমি অনাবাদি পড়েছিলো। অনেকেই দখলের চেষ্টা করেছিলো। কয়েক বছর আগে বাগানের সীমানা এলাকার প্রায় ৩০০ একর ভূমিতে পাম চাম চাষ করি। পাম গাছ গুলোতে এখন ফল ধরছে। কিন্তু এটা প্রক্রিয়াকরণের সুযোগ না থাকায় সম্ভাবনা থাকলেও আমি পাম ফলগুলো কোনো কাজে লাগাতে পারছি না।’ 

আফজাল রশীদ চৌধুরী নামে অপর একজন বলেন, ‘বর্তমানে কিছু ফল আমরা ৬০/৭০ টাকা কেজিতে বিক্রি করছি। ফলগুলো একটি সাবান কোম্পানি নিয়ে যাচ্ছে তাদের কাজে লাগানোর উদ্দেশ্যে। যে টাকা পাওয়া যায় পরিচর্যায় নিয়োজিত তিনজন কর্মচারীর বেতন হয়। এর বাইরে কোনো লাভ আসছে না।’

তিনি আরও বলেন, ‘তেল উৎপাদনে যেতে হলে প্রক্রিয়াকরণ মেশিন দরকার। যার দাম প্রচুর। সবচেয়ে ছোট মেশিন স্থাপন করতে হলে অন্তত ৫ হাজার একর জমিতে পাম চাষ করতে হবে। সিলেটের চা বাগানগুলোতে যে পরিমাণ অনাবাদি জমি রয়েছে সেখানে ৫ হাজার পাম গাছ লাগানো সম্ভব। তবে সিলেটে সেভাবে পাম বাগান গড়ে উঠেনি। এমনকি সরকারের পক্ষ থেকে সেরকম কোনো পরিকল্পনা নেওয়া হয়নি।’

আফজাল রশীদ চৌধুরী দাবি করেন, আমার তিনটি চা বাগানের অন্তত ১ হাজার একর অনাবাদী ভূমিতে পাম চাষের সুযোগ ছিল, কিন্তু টি বোর্ড অনুমতি দেয়নি। খাদিম বাগানেও পাম চাষ সম্প্রসারিত করতে দেয়নি। ফলে অঙ্কুরেই মৃত্যু হচ্ছে পাম চাষে সম্ভাবনার। অর্থ উপার্জন না হলেও এইসব বাগানের জমি দখল ঠেকাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে পাম গাছগুলো। 

এদিকে জৈন্তাপুরের মোহাম্মদ আলী মাক্কু ছাড়াও ব্যক্তি পর্যায়ে সিলেটে অনেকে দুটি, চারটি, দশটি করে পাম গাছ কিনেছিলেন। কিন্তু, সবাই হতাশ হয়েছেন। সঠিক দিক নির্দেশনা না পেয়ে মাক্কুর মতো অধিকাংশ চাষি গাছগুলো কেটে ফেলতে বাধ্য হয়েছেন।

মোহাম্মদ আলী মাক্কু বলেন, ‘কৃষি কর্মকর্তাদের কাছে গেছি, তারা বলেছে এটি প্রক্রিয়াজাত করার কোনো মেশিন এখনও আসেনি। অন্য যারা গাছ লাগিয়েছিল তাদের কাছেও গেছি। সবার বক্তব্য— মেশিন না থাকায় বিপদে আছি।’

সিলেট চেম্বারের সাবেক সভাপতি এটিএম শোয়েব বলেন, ‘সিলেটে পাম চাষের সম্ভাবনা, প্রক্রিয়া নিয়ে গবেষণার প্রয়োজন। বিনিয়োগের আগে ব্যবসায়ীরা আদৌ লাভোবান হবেন নাকি ক্ষতির মুখে পড়বেন তা যাচাই বাছাই করতে হবে।’ 

তিনি বলেন, ‘সিলেটে পাম তেল প্রক্রিয়াজাতের জন্য কারখানা গড়ে না তুললে এই পাম কখনো শিল্পে রূপ নেবে না।’  

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সিলেটের উপ-পরিচালক মোহাম্মদ খয়ের উদ্দিন মোল্লা বলেন, ‘সিলেটে পাম হচ্ছে কি না সে ব্যাপারে আমার কোনো ধারণা নেই। তবে, কেবল সিলেট নয়, পাম প্রক্রিয়াজাত করার ভালো ইন্ডাস্ট্রি বাংলাদেশের অন্য কোথাও নেই বলে আমি জানি। বাংলাদেশে পাম চাষ নতুন একটি শিল্প। এটি স্থায়ী রূপ নিতে সময় লাগবে।’

মাসুদ

সম্পর্কিত বিষয়:

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়