ঢাকা     শনিবার   ১৩ এপ্রিল ২০২৪ ||  চৈত্র ৩০ ১৪৩০

স্বতন্ত্র প্রার্থীতেই খুলনায় ভোটের মাঠে উত্তাপ   

মুহাম্মদ নূরুজ্জামান, খুলনা  || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৮:২৬, ২৮ ডিসেম্বর ২০২৩  
স্বতন্ত্র প্রার্থীতেই খুলনায় ভোটের মাঠে উত্তাপ   

স্বতন্ত্র প্রার্থী মোর্তজা রশিদী দারা, শেখ আকরাম হোসেন ও মাহবুবুর রহমান

খুলনায় জাতীয় নির্বাচনের উত্তাপ ছড়িয়েছে। মূলতঃ ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীর সঙ্গে স্বতন্ত্র প্রার্থী মুখোমুখি হওয়ায় শান্ত পরিবেশ উত্তপ্ত হয়ে উঠার মূল কারণ। সময় ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে খুলনার ৬টি সংসদীয় আসনের তিনটিতে উত্তাপ বাড়ছে। একে অপরের বিরুদ্ধে কথার তীর নিক্ষেপ শুরু করছেন। করছেন অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগও। 

খুলনা-৪, খুলনা-৫ এবং খুলনা-৬ সংসদীয় আসনে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন একই দলের নেতারা। ফলে দল নয়, এখন ‘চেয়ার’ দখলের প্রতিযোগিতায় রয়েছেন তারা। নির্বাচনি আচরণবিধিও লঙ্ঘন করছেন কেউ কেউ। সর্বশেষ নানা অভিযোগে খুলনা-৪ আসনে নৌকার প্রার্থী আব্দুস সালাম মুর্শেদীকে আদালতে তলব এবং খুলনা-৫ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী আকরাম হোসেনকে শোকজ করে নির্বাচন কমিশন।  

খুলনা-৪ আসন 
আব্দুস সালাম মুর্শেদী ও এসএম মোর্তজা রশিদী দারার সমর্থকরা দুই শিবিরে বিভক্ত হয়ে পড়েছেন। যার বাইরে নেই স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতা, কর্মী, সমর্থকরা। বাড়ছে উত্তেজনা। স্বয়ং প্রার্থীর বিরুদ্ধেও হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠছে। প্রতিপক্ষ প্রার্থীর বিরুদ্ধে হচ্ছে পাল্টাপাল্টি সংবাদ সম্মেলন। প্রার্থীর বিরুদ্ধে নির্বাচনি আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগও উত্থাপিত হচ্ছে। সব মিলিয়ে ৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এ আসনে নৌকা এবং কেটলি প্রতীকের কর্মী সমর্থকদের মধ্যে উত্তেজনা বাড়ার পাশাপাশি জমে উঠেছে নির্বাচনি প্রচারণা। সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনের।

আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী আব্দুস সালাম মূর্শিদীর সমর্থক ও বারাকপুর ইউপি চেয়ারম্যান গাজী সহাগীর হোসেন পাভেল ২৭ ডিসেম্বর রিটার্নিং কর্মকর্তা ও খুলনা জেলা প্রশাসক বরাবর স্বতন্ত্র প্রার্থী এস এম মোর্তজা রশিদী দারার বিরুদ্ধে নৌকার পক্ষে কাজ করায় তাকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ এবং হত্যার হুমকি দেওয়া হয়েছে বলে লিখিত অভিযোগ করেন।

লিখিত অভিযোগে তিনি উল্লেখ করেন, ‘আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আব্দুস সালাম মূর্শেদীর নৌকা প্রতীকের পক্ষে প্রচারণা চালাচ্ছি। ২৬ ডিসেম্বর বিকাল ৩ টার সময় স্বতন্ত্র প্রার্থী এস এম মোর্ত্তজা রশিদী দারা বারাকপুর ইউনিয়নে গণসংযোগকালে আমার নাম উল্লেখ করে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ এবং আমাকে হত্যার হুমকি দেন।’ 

এর আগে ২৫ ডিসেম্বর স্বতন্ত্র প্রার্থী এস এম মোর্ত্তজা রশিদী দারা তার কার্যালয়ে এক সাংবাদিক সম্মেলনে প্রতিপক্ষ নৌকার প্রার্থী, সমর্থকদের বিরুদ্ধে হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উত্থাপন করেন। লিখিত অভিযোগে তিনি দিঘলিয়াতে তার কর্মী রওশন আরাকে প্রাণনাশের হুমকি, রূপসা উপজেলার মিল্কি দেয়াড়ায় কাচারীঘাটের রুটি বিক্রেতা বয়োবৃদ্ধ ফারুককে গায়ে হাত তোলা এবং হত্যার হুমকি, সোহেল রানাকে হাত-পা গুঁড়ো করে দেওয়ার হুমকি এবং আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশী খুলনা মহানগর যুবলীগের সভাপতির বাড়ির সামনে বোমা ফাটিয়ে উল্লাস করার অভিযোগ উত্থাপন করেন নৌকার প্রার্থীর কর্মী, সমর্থকদের বিরুদ্ধে।

দিঘলিয়া উপজেলার সেনহাটী ইউপি চেয়ারম্যান জিয়া গাজী তাঁকে এবং নৌকার প্রার্থীকে জড়িয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী দারার সংবাদ সম্মেলনের প্রতিবাদে ২৬ ডিসেম্বর দিঘলিয়া প্লেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করেন। সেখানে তার এবং তার প্রার্থীর বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ মিথ্যা, ভিত্তিহীন ও বানোয়াট বলে উল্লেখ করেন। 

সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, বর্তমান সংসদ সদস্য আব্দুস সালাম মুর্শেদী অর্থের বিনিময়ে তার পক্ষে সমর্থন আদায় ও কর্মীদের ভয়-ভীতি দিচ্ছে বলে স্বতন্ত্র প্রার্থী যে অভিযোগ করেছেন তা সম্পূর্ণ মিথ্যা ও বানোয়াট। তিনি নিজের পক্ষে সমর্থন আদায়ের জন্য এ সকল অভিযোগ করছেন। তিনি ২৪ ডিসেম্বর একজন নারী ভোটার তার বিরুদ্ধে থানায় তাকে ভয় ভীতি ও জীবননাশের হুমকি দেওয়ার অভিযোগ করেছেন তাও মিথ্যা ও ভিত্তিহীন।

মঙ্গলবার (২৬ ডিসেম্বর) গাজীরহাট ইউনিয়নের মাঝিরগাতী ৫নং ওয়ার্ডের নৌকা মার্কার নির্বাচনি সভায় বুলু শেখের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে পিঠের চামড়া তুলে নেওয়ার হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।

রোববার (২৪ ডিসেম্বর) খুলনা জেলা মহিলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহ-সভাপতি ও স্বতন্ত্র প্রার্থী দারার সমর্থক রওশন আরা রিনী তাকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ এবং হত্যার হুমকি দেওয়া হয়েছে মর্মে সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা ও দিঘলিয়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার বরাবর লিখিত অভিযোগ করেন সেনহাটী ইউপি চেয়ারম্যান ও নৌকা মার্কার সমর্থক জিয়া গাজীর বিরুদ্ধে। জিয়া গাজীর বিরুদ্ধে দিঘলিয়া থানায় এ সংক্রান্ত সাধারণ ডায়েরিও করেন তিনি।

হুমকি ধামকির পাশাপাশি এই আসনে নির্বাচনি আচরণবিধি লঙ্ঘনেরও অভিযোগ উঠেছে। এ অভিযোগে নির্বাচনি আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে খুলনা-৪ (রূপসা-দিঘলিয়া-তেরখাদা) আসনের আওয়ামী লীগের প্রার্থী ও বর্তমান সংসদ সদস্য আব্দুস সালাম মুর্শেদীকে আদালতে তলব করেছে নির্বাচনি অনুসন্ধান কমিটি। বুধবার (২৭ ডিসেম্বর) খুলনা-৪ আসনের নির্বাচনি অনুসন্ধান কমিটির চেয়ারম্যান ও সিনিয়র সহকারী জজ তানিয়া সুলতানা লিপি এ আদেশ দেন।

খুলনা-৫ আসন
ডুমুরিয়া উপজেলার রুদাঘরা ইউনিয়নের মিকশিমিল বালিকা বিদ্যালয় মাঠে নির্বাচনি সভায় স্বতন্ত্র প্রার্থী শেখ আকরাম হোসেন বক্তৃতা করছিলেন। বক্তৃতার এক পর্যায়ে উত্তেজিত হয়ে তিনি ডুমুরিয়া উপজেলা চেয়ারম্যান গাজী এজাজ আহমেদ ও স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান তৌহিদুজ্জামানের দুই চাচা গাজী সালাম ও গাজী কালামকে উদ্দেশ করে বক্তব্য দেন। গাজী সালাম ও গাজী কালাম ডুমুরিয়া উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান ও খুলনা জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক গাজী আব্দুল হাদীর ভাই। তারা পারিবারিকভাবে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। তারা আওয়ামী লীগের প্রার্থী বর্তমান সংসদ সদস্য নারায়ণ চন্দ্র চন্দের নৌকা প্রতীকের পক্ষে নির্বাচন করছেন। এতে ক্ষুব্ধ হয়েছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী ও আওয়ামী লীগ নেতা শেখ আকরাম হোসেন।

এ ব্যাপারে ডুমুরিয়া উপজেলা চেয়ারম্যান ও জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য গাজী এজাজ হোসেন বলেন, ‘স্বতন্ত্র প্রার্থী আকরাম হোসেন আমাকে ও আমার ভাই ইউপি চেয়ারম্যান গাজী তৌহিদুজ্জামানকে শাসাতেই আমাদের চাচাদের নাম ধরে হুমকি দিয়েছেন। এ ঘটনার পর আমরা আতঙ্কের মধ্যে রয়েছি। স্থানীয় নেতাদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে আমরা আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করব।’

তবে হুমকি-ধামকী, উত্তেজনা, প্রার্থীর আচরণবিধি লংঘন যাই হোক এ আসনের প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন হবে বলে এলাকার সাধারণ ভোটাররা ধারণা করছেন।

খুলনা-৬ আসন
খুলনা-৬ আসনে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী মো. রশীদুজ্জানের মূল প্রতিদ্বন্দ্বী একই দলের নেতা ও স্বতন্ত্র প্রার্থী ইঞ্জিনিয়ার মাহবুবুর রহমান হলেও আসনটিতে এখনও পর্যন্ত তেমন উত্তেজনাকর পরিস্থিতির খবর পাওয়া যায়নি। তবে ভোটের দিনক্ষণ এগিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে উত্তাপ বাড়ছে মনে করছে ভোটাররা। 
 

/বকুল/

ঘটনাপ্রবাহ

আরো পড়ুন  



সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়