ঢাকা     শুক্রবার   ১৯ এপ্রিল ২০২৪ ||  বৈশাখ ৬ ১৪৩১

গাজীপুরে ভোট প্রদানে আগ্রহ বেশি গ্রামে, মিশ্র প্রতিক্রিয়া শহরে

রেজাউল করিম, গাজীপুর  || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৬:৩৮, ৬ জানুয়ারি ২০২৪  
গাজীপুরে ভোট প্রদানে আগ্রহ বেশি গ্রামে, মিশ্র প্রতিক্রিয়া শহরে

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে গাজীপুরের বিভিন্ন কেন্দ্রে পাঠানো শুরু হয়েছে ভোটের সরঞ্জাম

গতকাল শুক্রবার সকাল ৮টায় শেষ হয়েছে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রচার-প্রচারণা। শেষ দিনের প্রচারণায় প্রার্থীরা ভোটারদের দিয়েছেন নানা প্রতিশ্রুতি। প্রার্থীরা ভোট কেন্দ্রগুলোতে সন্তোষজনক ভোটার উপস্থিতির আশা ব্যক্ত করেছেন। খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, এবারের নির্বাচনে ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার ক্ষেত্রে গ্রামের ভোটারদের আগ্রহ বেশি। তবে, মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে শিল্পাঞ্চল ও শহরের ভোটারদের মধ্যে। 

গাজীপুরের মোট সংসদীয় আসন ৫টি। ভোটের মাঠে ৩৭ জন প্রার্থী থাকলেও মূলত আওয়ামী লীগের সঙ্গে দলটির স্বতন্ত্র প্রার্থীদের প্রতিদ্বন্দ্বীতা হবে বলে ধারণা করছেন ভোটাররা।

কালিয়াকৈর ও গাজীপুর সিটি করপোরেশনের ১ থেকে ১৮ নম্বর ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত গাজীপুর-১ আসন। এই আসনে আওয়ামী লীগের দলীয় প্রার্থী মুক্তিযোদ্ধ বিষয়েক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক। তার বিপক্ষে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে নির্বাচন করছেন উপজেলা আওয়ামী সধারণ সম্পাদক রেজাউল করিম রাসেল। এই আসনে মোট ভোট কেন্দ্র ১২৮টি। গাজীপুর-২ আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী  জাহিদ আহসনা রাসেল। তার বিপক্ষে লড়ছেন মহানগর আওয়ামী লীগের সাবেক সহ সভাপতি কাজী আলিম উদ্দিন। এই আসনে মোট ভোটকেন্দ্র ৪০০টি। গাজীপুর-৩ (শ্রীপুর ও গাজীপুর সদরের আংশিক) আসেনে আওয়ামী লীগের দলীয় প্রার্থী রোমানা আলী টুসি তার প্রতিদ্বন্দ্বী স্বতন্ত্র প্রার্থী জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ইকবাল হোসেন সবুজ। তিনি বর্তমানে সংসদ সদস্য। এই আসনে ভোট কেন্দ্র ১৮০টি। গাজীপুর-৪ (কাপাসিয়া) আসনের নির্বাচন করছেন সিমিনি হোসেন রিমি। তার বিপক্ষে আছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী আলম আহমেদ। এই আসনে মোট ভোটকেন্দ্র সংখ্যা ১২২টি। গাজীপুর-৫ (কালীগঞ্জ, সিটির তিনটি ওয়ার্ড ও বাড়িয়া ইউনিয়ন) আওয়ামী লীগের দলীয় প্রার্থী মেহের আফরোজ চুমকি। এখানে স্বতন্ত্র হিসাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন গাজীপুর জেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান আখতারউজ্জামান।

গাজীপুরের ৫টি সংসদীয় আসনের বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে দেখা যায়, তুলনামূলক গ্রামের মানুষের মধ্যে ভোট দেওয়ার আগ্রহ বেশি। কমবেশি সবাই ভোট ও প্রার্থীদের নিয়ে আলোচনায় মেতে রয়েছেন। তারা কাকে ভোট দেবেন সে নিয়েও চলছে আলাপ আলোচনা। তর্ক-বির্তক থাকলেও  ভোটকেন্দ্রে যাবেন বলে জানিয়েছেন গ্রামের মানুষরা। 

এদিকে, বিপরীত চিত্র শহর ও শিল্প অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে। এখানকার ভোটারদের মধ্যে কেন্দ্রে যাওয়া নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। ভোটাররা কেউ কেউ সরাসরি ভোটকেন্দ্র যাবেন না বলেও জানিয়ে দিচ্ছেন। তাদের মতে যাকেই ভোট দেন না কেন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের লোকই জয়ী হবে। 

গাজীপুর সদর উপজেলার বাড়িয়া ইউনিয়নের কেসরীতা গ্রামের বাসিন্দা শহর আলী বলেন, ‘আমাদের গ্রামের সবাই ভোট দিতে যাবে। আমিও সকাল সকাল ভোট দিতে যাবো। আমাদের গাজীপুর-৫ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী আক্তার ভাই এগিয়ে রয়েছেন।’ 

কালিয়াকৈর উপজেলার সফিপুর এলাকার বাসিন্দা সবুজ আহমেদ নামের অপর এক ভোটার বলেন, ‘আমি ও আমার পরিবারের সদস্যরা এই ডামি নির্বাচন বর্জন করেছি। ভোটকেন্দ্রে যাব না, ভোটও দেবো না। স্বতন্ত্র প্রার্থীকে ভোট দিলেও আওয়ামী লীগ আবার নৌকা তো তাদেরই। তাহলে ভোটটা দেব কাকে?’ 

গাজীপুরের পাঁচ আসনের ৫৯৫টি কেন্দ্রই ‘ঝুঁকিপূর্ণ’: দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে গাজীপুরে ৫টি সংসদীয় আসনে ভোট কেন্দ্রের সংখ্যা ৯৩৫টি। এর মধ্যে ৫৯৫টি কেন্দ্রকেই ‘ঝুকিপূর্ণ’ বা অতি গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে চিহ্নত করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। বিশেষ করে রাজধানী লাগোয়া গাজীপুর-২ আসন ও গাজীপুর-১ আসনে অর্ধেকের বেশি কেন্দ্রই ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এছাড়া, গাজীপুর-৩ (শ্রীপুর ও সদর একাংশ) ৯০ টি, গাজীপুর-৪ (কাপাসিয়া) আসনে ৭২টি এবং গাজীপুর-৫ (কালীগঞ্জ ও সদর একাংশ) আসনে ৫৪টি ভোটকেন্দ্র ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

শঙ্কায় কারখানা শ্রমিক ও নারী ভোটার: গাজীপুর শিল্প অধ্যুষিত এলাকা হওয়ায় ভোটারের বড় একটি অংশ শ্রমিক ভোটার। প্রার্থীরাও মনে করছেন শ্রমিক যেদিকে যাবে সেই প্রার্থীই জয়ী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ভোট নিয়ে শ্রমিক ভোটাররা নির্বাচনের দিনের পরিবেশ নিয়ে উদ্বিগ্ন। ভোটার ও শ্রমিক নেতারা বলছেন, নির্বাচানে ভোটারদের উপস্থিতি ও শহরে বসবাসকারী বিপুল সংখ্যক শ্রমিক পরবর্তী সংসদ সদস্য কে হবেন তা নির্ধারণের চাবিকাঠি হয়ে উঠতে পারেন। তবে, নির্বাচনের দিনে ভোটের পরিবেশের ওপর নির্ভর করে নারী ভোটাররা কেন্দ্রে যাবেন কিনা। 

কালিয়াকৈর উপজেলার সফিপুর এলাকার ভোটার শিউলি আক্তার বলেন, দুইজন আওয়ামী লীগের প্রার্থী ভোট চাইতে এসেছিলেন। একজন স্বতন্ত্র অন্যজন নৌকার। ভোট দেওয়ার প্রতি আগ্রহ খুব নেই। তারপরও ভোটের দিনের পরিবেশের উপর নির্ভর করে সিদ্ধান্ত নেবো। 

ভাসমান ভোটার নিয়ে চিন্তা: গাজীপুরে ছোটবড় প্রায় ৫ হাজার শিল্পপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। এসব কারখানায় লাখ লাখ শ্রমিক কাজ করেন। এদের মধ্যে একটি অংশ দীর্ঘদিন গাজীপুরে থাকায় এখানেই ভোটার হয়েছেন। বিশেষ করে টঙ্গী, বাসন, বোর্ডবাজার, চেরাগআলী, কাশিমপুর, কোনাবাড়ি, মৌচাক, নাওজোর, মাওনা, রাজেন্দ্রপুর এলাকায় অধিকাংশ ভোটার ভাসমান। তাদের ভোটে গড়ে দেয় জয় পরাজয়ের হিসাব-নিকাশ। তবে, নির্বাচন উপলক্ষে টানা ছুটিতে অনেক ভোটার গ্রামে চলে গেছেন। ফলে এসব অঞ্চলে তুলনামূলক ভোট কম পড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে। যারা রয়েছেন তাদেরও অনেকেই ভোট দেওয়া নিয়ে দোদুল্যমান অবস্থায় রয়েছেন। 

কোনাবাড়ি এলাকার ভোটার সাত্তার মিয়া বলেন, আমি স্টার্ন্ডাড গার্মেন্টসে কাজ করি। এখানকার অনেকেই ভোটার। কারখানা ছুটি থাকায় অধিকাংশ ভোটার গ্রামে চলে গেছেন। আমি ভোট দেবো কিনা এখনো ঠিক করিনি। মন চাইলে গিয়ে দিয়ে আসবো। 

গাজীপুরের পুলিশ সুপার এস এম কাজী সফিকুল আলম জানান, নির্বাচনের কেন্দ্রগুলোতে সার্বিক নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যক পুলিশ ও আনসার সদস্য মোতায়েন থাকবে। সার্বিক নিরাপত্তায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা সার্বক্ষণিক প্রস্তুত থাকবে। ভোটাররা নির্বিঘ্নে ভোট কেন্দ্রে যেতে পারবেন এবং ফেরত আসতে পারবেন এই দিচ্ছি। 

গাজীপুর জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসক আবুল ফাতে মোহাম্মদ সফিকুল ইসলাম বলেন, গাজীপুরে সংসদীয় ৫টি আসনে ৯৩৫টি ভোট কেন্দ্র রয়েছে। সবগুলি কেন্দ্রকে আমরা গুরুত্ব দিচ্ছি। শান্তিপূর্ণ নির্বাচন হবে, কোনো শঙ্কা নেই ভোটারদের। 

মাসুদ

ঘটনাপ্রবাহ

আরো পড়ুন  



সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়