ঢাকা     মঙ্গলবার   ২৩ এপ্রিল ২০২৪ ||  বৈশাখ ১০ ১৪৩১

নীলাদ্রি লেকের নাম পাল্টে ‘ইত্যাদি পয়েন্ট’, সমালোচনার ঝড়

মনোয়ার চৌধুরী, সুনামগঞ্জ || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৭:১০, ১৮ জানুয়ারি ২০২৪  
নীলাদ্রি লেকের নাম পাল্টে ‘ইত্যাদি পয়েন্ট’, সমালোচনার ঝড়

‘স্বর্গীয় সৌন্দর্যে’ ভরা পর্যটন স্পটের নাম শহিদ সিরাজ লেক (নীলাদ্রি)। যার অবস্থান ভারতের মেঘালয় সীমান্তবর্তী সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার উত্তর শ্রীপুর ইউনিয়নের ট্যাকেরঘাটে। আর এই শহিদ সিরাজ লেকের সৌন্দর্য উপভোগ করতে প্রতিদিন ভিড় জমান শত শত পর্যটক। অপরূপ সৌন্দর্যে ডুব দিতে আসা পর্যটকসহ সবাই একে শহিদ সিরাজ লেক (নীলাদ্রি) নামেই চেনেন।

তবে, শহিদ সিরাজ লেক নীলাদ্রিতে কয়েক বছর আগে দেশের জনপ্রিয় ‘ইত্যাদি’ অনুষ্ঠানের আয়োজন হয়েছিল। সেই অনুষ্ঠানকে কেন্দ্রে করে সম্প্রতি শহিদ সিরাজ লেক নীলাদ্রিতে নির্মাণ করা হয়েছে ‘ইত্যাদি পয়েন্ট’ নামের ফলক। এতে সুনামগঞ্জের স্থানীয় বাসিন্দারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকসহ এলাকায় সমালোচনার ঝড় তুলেছেন। 

সুনামগঞ্জের গণমাধ্যমকর্মী এ আর জুয়েল বলেন, জায়গাটি সুনামগঞ্জের অপরূপ সৌন্দর্যের, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত হিসেবেই দেশব্যাপী পরিচিত। সবাই শহিদ সিরাজ লেক (নীলাদ্রি) হিসেবেই চেনেন। এটাকে ‘ইত্যাদি পয়েন্ট’ নাম দিয়ে কেন পরিচিত করতে হবে? জায়গাটি দেশব্যাপী পরিচিত বলেই হানিফ সংকেত স্যার এখানে এসে অনুষ্ঠানটি করেন। প্রকৃতিকে এমন ভেঙে-চুরে ইটপাথরে বাণিজ্যিক নাম দিয়ে অপরূপ সুনামগঞ্জের এ জায়গাটাকে ইত্যাদির কাছে বিক্রি করা হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, নয়নাভিরাম এ লেকটিকে ধ্বংসের এমন উপহাস করছে। এটি শহিদ সিরাজ লেক, বাইরের পর্যটকদের কাছে সৌন্দর্যের নীলাদ্রি। একে ইত্যাদি নামক বাণিজ্যিক নামকরণ দিয়ে কলুষিত করবেন না। নয়তো আমরা যারা সুনামগঞ্জকে ভালোবাসি, অপূর্ব সুনামগঞ্জকে সারা বিশ্বে আমাদের প্রকৃতিকে ছড়িয়ে দিতে কাজ করি, তারা বসে থাকব না। এর বিরুদ্ধে কঠোরভাবে রুখে দাঁড়াবো। তাই, কর্তৃপক্ষ যারাই সুনামগঞ্জের শহিদ সিরাজ লেকে এমন মনগড়া বাণিজ্যিক তামাশা করছেন, সেটি বন্ধ করতে হবে।

তাহিরপুর এলাকার বাসিন্দা রোকন উদ্দিন বলেন, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি বিজড়িত শহিদ সিরাজ লেক (নিলাদ্রি লেক) নামকরণ রেখে এখন ‘ইত্যাদি পয়েন্ট’ করা হচ্ছে। এতে কি বীর মুক্তিযোদ্ধাদের অবমাননা করা হচ্ছে না? হাওর বা সীমান্ত এলাকার নিজস্ব সংস্কৃতি রয়েছে, এটা মাথায় রাখা উচিত। অনতিবিলম্বে এটা অপসারণ করা হউক।

সুনামগঞ্জের স্থানীয় বাসিন্দা শিশির তালুকদার বলেন, ইটপাথর যখন ভালো লাগে না, তখন আমরা প্রকৃতির খোঁজে তাহিরপুরের এই লেকে যাই। এখানে পাহাড় নদী পানি দেখে মনকে জুড়িয়ে নিই। নীলাদ্রি নামের মধ্যে আমাদের আবেগ-ভালোবাসা জড়িত। ইত্যাদি করেছে ভালো কথা, কিন্তু এত বছর পর কেন এমন কাণ্ডের কথা মাথায় আসলো? আমরা আমাদের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে রক্ষা করতে সুনামগঞ্জবাসী ঐক্যবদ্ধ হয়ে প্রতিবাদ করে এটা প্রতিরোধ করবো। 

এ ব্যাপারে মুঠোফোনে ইত্যাদি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করলে ইত্যাদির সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ মামুন রাইজিংবিডিকে বলেন, ‘নীলাদ্রিতে ইত্যাদি পয়েন্ট নামে আমরা কিছুই করতে চাইনি। এটা যেটা করছে, বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড করেছে। যেন ওখানে টুরিস্টদের সংখ্যা বাড়ে। নাম পরিবর্তনের কোনও বিষয় ছিল না। শহিদ সিরাজ লেক সাইনবোর্ডও থাকত। বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড উদ্যোগ নিয়েছে, আমাদের কাছে এসেছে, তারা আমাদের বলেছিল যে, আপনারা বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গাকে পরিচিত করেছেন; সে জায়গাগুলোকে আমরা টুরিস্টদের আকর্ষণ বাড়ানোর জন্য ইত্যাদি পয়েন্ট লিখতে চাই। তাদের কথা শুনে আমরা দেখলাম জিনিসটা খারাপ না। পরে আমরা তাদের অনুমতি দিয়েছি। এরপর তারা ইত্যাদি পয়েন্ট লেখার উদ্যোগ নেয়। পরে স্থানীয় প্রশাসনের কাছে অনুমতি নিয়েই এই কাজ করেছেন’। 

তিনি আরও বলেন, ‘স্থানীয় লোকজন এ ব্যাপারে ভুল বুঝে সমালোচনা করেছেন। আসলে শহিদ সিরাজ লেক নাম পরিবর্তন না, এটা শহিদ সিরাজ লেকে ইত্যাদি পয়েন্ট নামের একটা স্থাপনা; যাতে পর্যটকরা আসতে আরও আগ্রহী হন। যেহেতু স্থানীয়রা ব্যাপারটা মানছেন না, ফলে আমরা যাদের অনুমতি দিয়েছিলাম, তাদের এখন নিষেধ করে দিয়েছি’। 
 
সুনামগঞ্জ অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মোহাম্মদ রেজাউল করিম রাইজিংবিডিকে বলেন, ‘ইত্যাদি পয়েন্ট’ নির্মাণ কাজ বন্ধ করা হয়েছে। ইতোমধ্যে নির্মিত সকল স্থাপনা অতি দ্রুতই অপসারণ করা হবে।

জানা যায়, শহিদ সিরাজ লেকে (নীলাদ্রি) ১৯৭১ সনে ৫নং সেক্টরের টেকেরঘাট সাব-সেক্টরের প্রধান কার্যালয় ছিল। এখান থেকে মুক্তিযুদ্ধের অসম সাহসী গেরিলা সংগঠন দাসপার্টি হাওরাঞ্চলে যুদ্ধ পরিচালনা করতেন। অন্যান্য নিয়মিত মুক্তিবাহিনীও এই কার্যালয় থেকে অভিযান পরিচালনা করে অনেকেই শহিদ হয়েছেন। অনেক শহিদের এনে এই স্থানে দাফন করতেন সহযোদ্ধারা। জামালগঞ্জ শত্রুমুক্ত করতে গিয়ে শহিদ হওয়া সিরাজকে এখানেই সমাহিত করেন মুক্তিযোদ্ধারা। এরপর থেকেই টেকেরঘাট চুনাপাথর খনির এই লেকটি শহিদ সিরাজ লেক হিসেবে পরিচিতি পায়।

ঢাকা/এনএইচ

আরো পড়ুন  



সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়