ঢাকা     রোববার   ১৬ জুন ২০২৪ ||  আষাঢ় ২ ১৪৩১

গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে স্বামীর মৃত্যু

‘কীভাবে ঈদে বাড়ি যাব, ঘরে ঢুকলে বুকটা ফাইটা যায়’

রেজাউল করিম, গাজীপুর  || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ২১:৩৮, ৬ এপ্রিল ২০২৪   আপডেট: ২২:১০, ৬ এপ্রিল ২০২৪
‘কীভাবে ঈদে বাড়ি যাব, ঘরে ঢুকলে বুকটা ফাইটা যায়’

স্বামী কুদ্দুস মিয়ার ছবি দেখছেন নাজমা বেগম

বেতন-বোনাস পেয়ে প্রতি ঈদে সন্তানদের জন্য নতুন পোশাক নিয়ে একসঙ্গে বাড়ি যেতেন নাজমা ও কুদ্দুস দম্পতি। এবার স্বামীকে হারিয়ে ঈদের সব পরিকল্পনা হারিয়ে গেছে তার। কখনো টিনসেড ঘরের দরজায় চুপচাপ দাঁড়িয়ে, আবার কখনো স্বামীর ছবি দেখে স্মৃতিকাতর হয়ে অঝোরে কাঁদতে শুরু করেন নাজমা।

গাজীপুর কালিয়াকৈর উপজেলার তেলিরচালা এলাকায় গ্যাস সিলেন্ডার লিকেজ থেকে লাগা আগুনে দগ্ধ হয়ে শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইন্সটিটিউটে ভর্তি ছিলেন কুদ্দুস মিয়া। ১৭ দিনের লড়াই শেষে গত ৩০ মার্চ চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন তিনি। 

কান্না জড়িত কণ্ঠে কুদ্দুসের স্ত্রী নাজমা বেগম বলেন, ‘আগুনের ঘটনার দুইদিন আগেও ঈদ নিয়ে অনেকগুলি পরিকল্পনা করছিলাম। আগুনে আমার সংসারটারে জ্বালিয়া পুড়িয়া শেষ কইরা দিছে। স্বামীকে কবর দিয়া পেটের তাগিতে চলে আসি গাজীপুরে। আমাদের সংসারে দুই সান্তান। ওরা গ্রামের বাড়িতেই থাকে। প্রতি ঈদে আমরা একসঙ্গে মার্কেটে গিয়ে সবার জন্য কেনাকাটা করতাম। কিন্তু, এবার আমাদের ঈদ নাই। আমি একা একা কিভাবে ঈদে বাড়ি যাব, ঘরে ঢুকলে বুকটা ফেটে যায়।’ 

নয় বছরের ছেলে সোলায়মানকে হারিয়ে পাগল প্রায় মা রানী আক্তার। ভাড়া বাড়ির টিনের ঘরের সামনে বাকরুদ্ধ হয়ে বসে থাকতে দেখা গেছে তাকে। ছেলের কথা জিজ্ঞেস করতেই কান্না শুরু করেন তিনি। ছেলের সঙ্গে শেষ কি কথা হয়েছিল জানতে চাইলে, সেদিনের কথা মনে করে বিলাপ করে রানী আক্তার বলেন, ‘পুতে কইছিল আম্মা ঈদের মার্কেট করতানা তুমি। আমি কইছিলাম বাবা ছুটি হোক তহন মার্কে করুম। আমার পুতে নাই এহন মার্কেট কার লাইগা করমু। তোমরা আমার পুতে ফিরিয়া আইনা দেও। ওরে কত দিন ধইরা দেহিনা।’

শুধু নাজমা বেগম আর রানী আক্তার নয় সেদিনের আগুনে দগ্ধ ৩৬ জনের মধ্যে মারা গেছেন ১৭ জন। স্বজন হারানো প্রতিটি পরিবারের ঈদের আনন্দ হারিয়ে গেছে। শুধু স্বজনহারা মানুষরাই নয়, স্তব্ধ হয়ে আছে পুরো মহল্লা। ঘটনার প্রায় ২৩ দিন হয়ে গেলেও এখনও শোকের মাতম কাটেনি তাদের। 

টিনসেড রুমের সামনে মনভার করে বসে ছিলেন শাহ আলম। পেশায় তিনি আইসক্রিম বিক্রেতা। গ্রামের বাড়ি সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর। আগুনে দগ্ধ হয়ে মারা গেছে তার সাড়ে ১১ বছর বয়সী ছেলে গোলাম রাব্বি। শাহ আলম বলেন, ‘আমাগরে কোনো ঈদ নাই। অনেকেই বাড়িত যাইবো, কিন্তু আমি বাড়িত যাইয়া কি করবো। রাব্বির বয়স যখন দেড় বছর তহন ওর মা মইরা গেছে। হেরপর থাইকা ছাওয়ালডারে আমি বড় করতাছিলাম। ছাওয়ালডার মুখখান চোহের সামনে ভাইস্যা উঠে। ছাওালডা আমার হাসপাতালে খুব কষ্ট করছে। ছাওয়াল ছাড়া আমার কোনো ঈদ নাই। এরলাইগা আমি বাড়িতও যামু না।’

শুক্রবার দুপুরে সরেজমিনে দেখা গেছে, দগ্ধদের ব্যথায় ব্যথাতুর পুরো এলাকা, কারও মুখে হাসি নেই। যে মহল্লায় ছিল হৈ-হুল্লোড় সেখানে নীরবতা জায়গা করে নিয়েছে। অনেকেই স্বজন হারিয়ে চলে গেছেন গ্রামে। কেউ কেউ জীবিকার তাগিদে রয়ে গেছেন। অনেকেই গদ্ধদের চিকিৎসার জন্য এখনো হাসপাতালে রয়েছেন। 

দগ্ধদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সিরাজগঞ্জের শাহাজাদপুরের বাসিন্দা। মারাও গেছেন বেশি ওই এলাকার মানুষ। 

মারা যাওয়া মহিদুল-নার্গিস দম্পতির ভাই হাসমত খান বলেন, ‘আমাদের হাসি ফুরিয়ে গেছে। বাসায় থাকতেই এখন কষ্ট হয়। ঈদে একসঙ্গেই গ্রামে যাইতাম। এখন আর একসঙ্গে যাওয়া হবে না। গ্রামে গেলেও ওদের কথা মনে পড়বে। আমার পাশের রুমে সোলেমানও দগ্ধ হয়ে মারা গেছে। স্বামীর লাশ নিয়ে তার স্ত্রী গ্রামে গেছে আর ফিরে আসেনি। বলে গেছে, যেখানে তার স্বামী মারা গেছে সেখানে আর ফিরে আসবে না।’

এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তেলিচালা এলাকাটি শিল্প অধ্যুষিত হওয়ায় হাজার হাজার শ্রমিক আশপাশে বাসা ভাড়া নিয়ে থাকেন। এই সুযোগে স্থানীয় লোকজনের কাছ থেকে জমি ইজারা নিয়ে কোনোরকমে টিনশেডের ঘর তৈরি করে ভাড়া দেন অনেকে। সফিকুল ইসলাম ও সুমন মিয়া নামের দুজন এখানে ঘর বানিয়ে ভাড়া দেন। একেকটি কক্ষের ভাড়া ৩ হাজার টাকা। কক্ষগুলো ছোট, আলাদাভাবে কোনো রান্নাঘর নেই। ফলে অনেকে রাস্তায়, আবার অনেকে নিজের থাকার ঘরেই রান্নার কাজ সারেন। অল্প জায়গায় প্রায় আড়াই হাজার মানুষ বসবাস করায় সেখানে তৈরি হয়েছে ঘিঞ্জি পরিবেশ।

গত ১৩ মার্চ কালিয়াকৈর উপজেলার তেলিরচালা এলাকায় সন্ধ্যায় সিলিন্ডারের ছিদ্র থেকে বের হওয়া গ্যাসে আগুন লেগে অন্তত ৩৬ জন দগ্ধ হন। তাদের মধ্যে ৩২ জনকে রাজধানীর শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে ভর্তি করা হয়। ওই হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৭ জনের মৃত্যু হয়েছে।

মাসুদ

সম্পর্কিত বিষয়:

আরো পড়ুন  



সর্বশেষ