ঢাকা     বুধবার   ১৪ জানুয়ারি ২০২৬ ||  মাঘ ১ ১৪৩২

Risingbd Online Bangla News Portal

ময়মনসিংহে সওজের জায়গা দখল

গরুর হাটে এত মধু! উচ্ছেদের দায়িত্ব পেয়েও চুপ তিন ম্যাজিস্ট্রেট

মাহমুদুল হাসান মিলন, ময়মনসিংহ || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ২১:৩৪, ১৪ জানুয়ারি ২০২৬   আপডেট: ২১:৪৫, ১৪ জানুয়ারি ২০২৬
গরুর হাটে এত মধু! উচ্ছেদের দায়িত্ব পেয়েও চুপ তিন ম্যাজিস্ট্রেট

অবৈধ গরুর হাটের কোটি টাকার মধুতে মজে সবাই চুপ হয়ে যাওয়ায় দীর্ঘদিন ধরে প্রশাসনের সঙ্গে দেনদরবার করেও কিশোরগঞ্জ সড়ক ও জনপথের (সওজ) একটি বড় জায়গা যেমন উদ্ধার হয়নি, তেমন চরম ভোগান্তি থেকে রেহাই পায়নি এলাকাবাসী।

রাইজিংবিডি ডটকম যোগাযোগ করে জানতে পেরেছে, ময়মনসিংহের নান্দাইলে হাটটির জায়গা উদ্ধারে কিশোরগঞ্জ সওজ যেমন চেষ্টা করে যাচ্ছে, তেমনি ভোগান্তি থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার আশায় ভুক্তভোগী এলাকাবাসী হাইকোর্ট পর্যন্ত চলে গেছে। তবু সমাধান আসেনি। উচ্ছেদের দায়িত্ব পেয়েও নীরবতা পালন করে গেছেন তিনজন ম্যাজিস্ট্রেট।

আরো পড়ুন:

কিশোরগঞ্জ সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী শাকিল মোহাম্মদ ফয়সাল বলেন, অবৈধ গরুর হাটটির জায়গা উদ্ধারে প্রশাসনের কাছে বারবার সহায়তা চেয়েও তারা তা পাননি।

৮ জানুয়ারি অবৈধ গরুর হাটটি সরেজিমন ঘুরে জানা যায়, হাট থেকে তোলা বিপুল পরিমাণ টাকা ভাগবাটোয়ারা চলছে। ফলে হাটের মধু কেউ হাতছাড়া করতে চান না।

অভিযোগ রয়েছে, গত এক বছর ধরে প্রতি বৃহস্পতিবার স্থানীয় একটি মহল উপজেলা প্রশাসনকে ম্যানেজ করে নিয়মবহির্ভূতভাবে এই হাট পরিচালনা করে আসছে। এতে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন তারা।

দীর্ঘ সময় হাটে অবস্থান করে ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের কাছ থেকে হাট প্রতি তোলা টাকার পরিমাণ জানার চেষ্টা করা হলেও তারা কেউ মুখ খোলেননি। তবে, স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা পরিচয় গোপন রাখার শর্তে কিছু তথ্য দেন।

তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, কোনো হাটে সর্বনিম্ন ১০০টি, কোনো হাটে ২০০টি পর্যন্ত গরু বিক্রি হয়। এ হিসেবে হাট প্রতি গড়ে তিন-চার লাখ টাকা উঠে। বছরে যার পরিমাণ দাঁড়ায় দেড় থেকে দুই কোটি টাকা।

এদিকে, অবৈধ স্থাপনা নির্মাণের ফলে ইতিমধ্যে সওজের প্রায় তিন একর জমি দখল হয়ে গেছে।

ছয় মাসে সওজের তিন চিঠি এবং দায়িত্ব পেয়েও চুপ ম্যাজিস্ট্রেট

কিশোরগঞ্জ সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলীর কার্যালয় গত বছর ২৭ নভেম্বর ময়মনসিংহ জেলা প্রশাসক বরাবর আবেদন করে। এটি ছিল সওজের তৃতীয় আবেদনের চিঠি।

আবেদনে বলা হয়, ময়মনসিংহের রঘুরামপুর হয়ে কিশোরগঞ্জের বটতলী-ভৈরব বাজার সড়কের ৪৭ কিলোমিটার অংশের নান্দাইল-চৌরাস্তা অংশে সওজ অধিগ্রহণকৃত সরকারি জমিতে গড়ে উঠেছে অবৈধ গরুর হাট। হাটসহ অন্যান্য স্থাপনা অপসারণের জন্য আইনগত নির্দেশনা প্রদান ও ম্যাজিস্ট্রেরিয়াল দায়িত্ব পালনে একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট প্রয়োজন।

কিশোরগঞ্জ সড়ক বিভাগের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে নান্দাইল উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট রেবেকা সুলতানা ডলিকে দায়িত্ব দেন জেলা প্রশাসক। সেই সঙ্গে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটকে দায়িত্ব পালন শেষে জেলা প্রশাসক বরাবর প্রতিবেদন পাঠানোর জন্য নির্দেশনা দেওয়া হয়। কিন্তু, দীর্ঘদিন হয়ে গেলেও দায়িত্বপ্রাপ্ত ম্যাজিস্ট্রেট অবৈধ হাট উচ্ছেদে কোনো উদ্যোগ নেননি।

জেলা প্রশাসনকে সওজ দ্বিতীয় চিঠিটি দেয় গত বছরের ২৮ সেপ্টেম্বর। ওই চিঠি পাওয়ার পর জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. জাকারিয়াকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। তিনিও কোনো অভিযান পরিচালনা করেননি।

সওজ প্রথম চিঠিটি দেয় গত বছরের ২৬ আগস্ট। তখন ময়মনসিংহের জেলা প্রশাসক ছিলেন মুফিদুল আলম। তিনি সেসময়ের সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. ফয়জুর রহমানকে দায়িত্ব দেন। দায়িত্ব পাওয়ার পর দুই মাস পার করে বদলি হয়ে যান। তবে, ফয়জুর রহমানও কোনো অভিযান চালিয়ে যাননি।

সওজ ও প্রশাসনের বক্তব্য

কিশোরগঞ্জ সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী শাকিল মোহাম্মদ ফয়সালের সঙ্গে কথা বলে এসব চিঠির বিষয়ে জানা যায়।

তিনি বলেন, “আমাদের এই জায়গাটি অবৈধ হাট ও স্থাপনা করে দীর্ঘদিন ধরে বেদখল করে রেখেছে কিছু মানুষ। আমাদের জায়গাটি দখলমুক্ত করতে ময়মনসিংহ জেলা প্রশাসককে কয়েকবার আবেদন করেছি।”

“কিন্তু দায়িত্বপ্রাপ্ত ম্যাজিস্ট্রেট কখনো অভিযান পরিচালনা করেননি। আমরা প্রস্তুত আছি। এসিল্যান্ড যেদিন সময় দিবেন, আমরা সেদিনই অভিযান পরিচালনা করতে চাই।”- বলেন তিনি।

বর্তমানে নান্দাইলের দায়িত্বপ্রাপ্ত ম্যাজিস্ট্রেট ও নান্দাইল উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) রেবেকা সুলতানা ডলির সঙ্গে মোবাইলে যোগাযোগ করে রাইজিংবিডি ডটকম।

তিনি বলেন, ‘‘এখন নির্বাচনি কাজে ব্যস্ত আছি। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ, জেলা প্রশাসক ও রাজস্ব স্যারকে জানিয়েছি। ওনারা ব্যবস্থা নেবেন।’’

নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগে দায়িত্ব পেয়েও কেন পালন করেননি- জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘‘এ বিষয়ে অফিসে এসে কথা বলেন।’’ 

এরপরই কলটি কেটে দেন রেবেকা সুলতানা ডলি। 

এ বিষয়ে জানতে ময়মনসিংহের বর্তমান জেলা প্রশাসক মো. সাইদুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘‘বিষয়টি অবগত হয়েছি। এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’’

ভোগান্তি থেকে পরিত্রাণে হাইকোর্টে এলাকাবাসী

অবৈধ এই হাট বন্ধ ও উচ্ছেদের জন্য উচ্চ আদালতে একটি রিট পিটিশন দায়ের করেন স্থানীয় বাসিন্দা আল-আমিন খান।

তিনি বলেন, নান্দাইল চৌরাস্তা মোড়ে দীর্ঘদিন ধরে সওজের জায়গা দখল করে অবৈধভাবে গরুর হাট পরিচালনা করা হচ্ছে। হাটে আদায় করা হাসিল সরকারি কোষাগার জামা না দিয়ে স্থানীয় প্রশাসনকে সঙ্গে নিয়ে ভাগাভাগি করা হচ্ছে।

তবে, নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে কারো নাম বলতে রাজি হননি তিনি।

নান্দাইল চৌরাস্তার আরেক বাসিন্দা জামাল উদ্দিন। হাট সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, অবৈধ হাট বন্ধে বিভাগীয় কমিশনারের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছি। স্থানীয় একটি সিন্ডিকেট সড়ক ও জনপথের জায়গায় অবৈধ হাট বসিয়ে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন।

আল-আমিন খানের মতো একই কারণে জামাল উদ্দিনও কারো নাম উচ্চারণ করেননি।

ঢাকা/রাজীব/রাসেল

সম্পর্কিত বিষয়:

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়