ঝিনাইদহ-৪ আসনে ত্রিমুখী লড়াইয়ের আভাস
ঝিনাইদহ প্রতিনিধি || রাইজিংবিডি.কম
(বাঁ থেকে) জামায়াত প্রার্থী আবু তালিব, স্বতন্ত্র সাইফুল ইসলাম ফিরোজ, বিএনপি প্রার্থী রাশেদ খান
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি বহুল প্রতীক্ষিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট। মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) সকাল ৭টায় শেষ হয়েছে প্রার্থীদের নির্বাচনি প্রচারণা।
প্রচরণার শেষ তিন দিন শোডাউনের শহরে পরিণত হয়েছিল ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ শহর। এর সঙ্গে ছিল পোস্টার ছেঁড়া, হামলা ও নানা অভিযোগ। ঝিনাইদহ-৪ (কালীগঞ্জ ও সদরের আংশিক) আসনে ৬ জন প্রার্থী নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এ আসনে মূলত বিএনপি-জামায়াত ও স্বতন্ত্র প্রার্থীর মধ্যে ত্রিমুখী লড়াই হবে বলে মনে করছেন ভোটাররা। তবে ভোটাররা বলছেন, সৎ, যোগ্য ও এলাকার সন্তানকে ভোট দিবেন তারা।
জানা গেছে, ঝিনাইদহ-৪ আসনটি ঝিনাইদহ সদর উপজেলার ৪টি ইউনিয়ন, কালীগঞ্জ উপজেলার ১১টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা নিয়ে গঠিত। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ১২০টি ভোটকেন্দ্রে ৩ লাখ ৩৩ হাজার ৪৬১ ভোটার ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন। এরমধ্যে পুরুষ ভোটার ১ লাখ ৬৮ হাজার ২৫৬ জন, নারী ভোটার ১ লাখ ৬৫ হাজার ২০০ ও হিজরা ভোটার রয়েছে ৫ জন। এ আসনে এবার ৬ জন প্রার্থী ভোটযুদ্ধে রয়েছেন। তারা হলেন- জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ মনোনীত দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের আবু তালিব, স্বতন্ত্র কাপ-পিরিচ প্রতীকের সাইফুল ইসলাম ফিরোজ, বিএনপি মনোনীত ধানের শীষ প্রতীকের রাশেদ খান, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ মনোনীত হাতপাখা প্রতীকের আব্দুল জলিল, জাতীয় পার্টি মনোনীত লাঙল প্রতীকের এমদাদুল ইসলাম ও গণফোরাম মনোনীত উদীয়মান সূর্য প্রতীকের খনিয়া খানম।
শোডাউনের নগরীতে পরিণত কালীগঞ্জ শহর
মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) সকাল ৭টায় শেষ হয়েছে প্রার্থীদের নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণা।। কিন্তু শেষ তিনদিন কালীগঞ্জ মিছিলের শহরে পরিণত হয়। ৭ ফেব্রুয়ারি শহরের নলডাঙ্গা ভূষণ স্কুল মাঠে নির্বাচনি জনসভার আয়োজন করে জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ। জনসভা শেষে শহরে একটি মিছিল বের করা হয়। জনসভায় নারীদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। এরপর ৮ ফেব্রুয়ারি একই স্থানে নির্বাচনি জনসভা ও গণমিছিল করে স্বতন্ত্র প্রার্থী সাইফুল ইসলাম ফিরোজ। উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন থেকে হাজার হাজার সমর্থক উপস্থিত হন। সর্বশেষ ৯ ফেব্রুয়ারি একই স্কুল মাঠে জনসভা ও গণমিছিল করে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী রাশেদ খান। জনসভা ও গণমিছিলেও বিপুল সংখ্যক নেতাকর্মী অংশ নেয়। এই তিনদিন যেন মিছিলের শহরে পরিণত হয় গোটা কালীগঞ্জ।
প্রচারণায় বাঁধা, অফিস ভাংচুর, ব্যানার ফেস্টুন-ছেড়ার অভিযোগ
স্বতন্ত্র প্রার্থী কাপ-পিরিচ প্রতীকের সাইফুল ইসলাম ফিরোজের ৪টি নির্বাচনি অফিস ও সমর্থকদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলার অভিযোগ করা হয়। শনিবার (৭ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যায় সদর উপজেলার নলডাঙ্গা বাজারে স্বতন্ত্র প্রার্থী সাইফুল ইসলাম ফিরোজের নির্বাচনি অফিস ভাঙচুর করা হয়। এ সময় অফিসে থাকা ৫ নস্বর ওয়ার্ডের সাবেক ইউপি সদস্য ও ফিরোজের কর্মী ওয়াজ্জেদ হোসেন, তার ছেলে বাদশা ও আহাদ, খড়াশুনী গ্রামের রাজ্জাকের ছেলে শামীম ও শ্রীমন্তপুর গ্রামের আয়নালের ছেলে জনিকে পিটিয়ে আহত করা হয়েছে। এর আগে গত ৫ ফেব্রুয়ারি বৃহস্পতিবার রাত ৮টার দিকে কালীগঞ্জ শহরের নিশ্চিন্তপুর নির্বাচনি অফিসে হামলা চালানো হয়। এ সময় অফিসের টেবিল, চেয়ার ও তিনটি মোটরসাইকেল ভাঙচুর করে দুর্বৃত্তরা। ঘটনাস্থল থেকে ককটেল সদৃশ বস্তু উদ্ধার করা হয়। এরপর এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। একইদিন রাতে ৮ জনের একটি সন্ত্রাসী দল পৌরসভার হেলাই গ্রামের স্বতন্ত্র প্রার্থী সাইফুল ইসলাম ফিরোজের আরেকটি নির্বাচনি অফিসে হামলা চালায়। অফিসে থাকা চেয়ারগুলো ভাঙচুর করে দ্রুত মোটরসাইকেলযোগে পালিয়ে যায়। অপরদিকে গত ৪ ফেব্রুয়ারি বুধবার রাত ৮টার দিকে কালীগঞ্জ উপজেলার পুকুরিয়া গ্রামে স্বতন্ত্র প্রার্থীর এক সমর্থকের একটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ভাঙচুর করা হয়।
এদিকে বিএনপির প্রার্থী রাশেদ খানের প্রচার মাইক ভাংচুর ও উপজেলার কয়েকটি স্থানে ব্যানার পুড়িয়ে ও ছেঁড়ার অভিযোগ করা হয়।
যা বলছেন ভোটাররা
ঝিনাইদহ-৪ আসনে এবারের নির্বাচনে ৬ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এরমধ্যে তিনজন প্রার্থীর মধ্যে লড়াই হবে বলে আশা প্রকাশ করছেন ভোটাররা। তবে এ আসনে আওয়ামী লীগের ও সনাতন ধর্মের ভোট জয়-পরাজয় নির্ধারণ করবে বলে ধারণা করছেন। এদিকে বিএনপি থেকে মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে লড়ছেন সাইফুল ইসলাম ফিরোজ। বিএনপির ভোট দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যাওয়ায় সুবিধা নিতে পারে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী। তবে এবারের নির্বাচনে এ আসনে ত্রিমুখী লড়াই হবে। এ আসনে বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশী ছিলেন তিনজন। কিন্তু কাউকে মনোনয়ন না দিয়ে গণঅধিকারের পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রাশেদ খানকে মনোনয়ন দেয় বিএনপি। তিনি ঝিনাইদহ-২ আসনের মুরারীদহ গ্রামের বাসিন্দা।
স্কুল শিক্ষক ফজলুর রহমান বলেন, ঝিনাইদহ-৪ আসনটি মূলত বিএনপির ঘাটি। বিগত তিনটি একতরফা নির্বাচন বাদে অন্য নির্বাচনে এখানে বিএনপির প্রার্থী জয়লাভ করে। কিন্তু রাশেদ খানকে মনোনয়ন দেওয়ায় বিএনপি দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে গেছে। তাছাড়াও রাশেদ খান এই আসনের বাসিন্দা না। বিগত দিনে দুর্দিনে নেতাকর্মীরা তাকে পাশে পাইনি।
শাহিনুর রহমান নামে এক ব্যক্তি বলেন, বিগত ১৭ বছরে ভোট প্রদান করেননি। এবারের নির্বাচনে তিনি ভোট প্রদান করবেন। এবারের নির্বাচনে তিনি সৎ, যোগ্য ও এলাকার উন্নয়নে যিনি কাজ করবেন তাকেই ভোট দিবেন।
মেহেদী হাসান নামে এক যুবক বলেন, বিগত ফ্যাসিস্ট আমল দেখেছি। এবারের নির্বাচনে আমরা ভালো মানুষকে ভোট দিতে চাই। আল্লাহর আইন চাই, সৎ লোকের শাসন চাই। আমরা চাঁদাবাজ-দুর্নীতিমুক্ত দেশ চাই। এমন প্রার্থীকেই আমরা ভোট দিতে চাই।
ইজিবাইকচালক প্রদীপ কুমার বলেন, অবশ্যই সৎ ও যোগ্য ব্যক্তিকে ভোট দিব। তবে এলাকার সন্তানকে ভোট দিবো।
যা বলছেন প্রার্থীরা
স্বতন্ত্র প্রার্থী সাইফুল ইসলাম ফিরোজ বলেন, এ আসনে আমরা বিএনপি থেকে মনোনয়ন প্রত্যাশী ছিলাম তিনজন। কিন্তু কাউকে মনোনয়ন দেওয়া হয়নি। যাকে বিএনপির মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে সে অন্য এলাকার বাসিন্দা। আমি দীর্ঘদিন এ আসনের মানুষের সুখে-দুঃখে পাশে রয়েছি। বিএনপির একটি বৃহৎ অংশ আমার সাথে রয়েছে। নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের দাবিতে আমি প্রার্থী হয়েছি। এ আসনের ভোটাররা এলাকার সন্তানকেই ভোট দিয়ে জয়যুক্ত করবেন। আশাকরি আমি জয়লাভ করবো ইনশাআল্লাহ।
জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ মনোনীত প্রার্থী আবু তালিব বলেন, নির্বাচন নিয়ে আমার কোনো শঙ্কা নেই। দুই-এক জায়গায় হালকা ঝামেলা আছে। এছাড়া নির্বাচনের শান্তিপূর্ণ পরিবেশ রয়েছে। ১৯৯৬ ও ২০২৬ এই দুটি নির্বাচনে আমি প্রার্থী হয়েছি। যেখানেই যাচ্ছি ভালো সাড়া পাচ্ছি। ভোটাররা এবার আমাকে জয়ী করবেন বলে আশা করছি।
বিএনপি মনোনীত প্রার্থী রাশেদ খানের মোবাইলে ফোন দিলে পিএস পরিচয়ে এক ব্যক্তি ফোন রিসিভ করেন। প্রথমে বলেন ৫ মিনিট পরে ফোন দিতে। পুনরায় আবার ফোন দিলে বলেন রাশেদ ভাই ব্যস্ত আছেন বলে ফোন কেটে দেন।
ঢাকা/সোহাগ/ফিরোজ