ঢাকা     বৃহস্পতিবার   ১৯ মার্চ ২০২৬ ||  চৈত্র ৬ ১৪৩২ || ২৯ রমজান ১৪৪৭ হিজরি

Risingbd Online Bangla News Portal

ঝুঁকি নিয়ে ট্রাকের ছাদে বাড়ি ফিরছেন শ্রমজীবী মানুষ

সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি  || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ০৮:৫৬, ১৯ মার্চ ২০২৬   আপডেট: ১০:৪৯, ১৯ মার্চ ২০২৬
ঝুঁকি নিয়ে ট্রাকের ছাদে বাড়ি ফিরছেন শ্রমজীবী মানুষ

পরিবহন সংকট, ভাড়া বেশির কারণে ঝুঁকি নিয়ে ট্রাকের ছাদে বাড়ি ফিরছেন শ্রবজীবী মানুষ। ছবি: রাইজিংবিডি

ঈদ সামনে রেখে প্রিয়জনের টানে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ট্রাকের ছাদে বাড়ি ফিরছেন শ্রমজীবী মানুষ। পরিবহন সংকট, টিকিটের অপ্রতুলতা ও অতিরিক্ত ভাড়ার কারণে বাধ্য হয়ে তারা বেছে নিচ্ছেন এই ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রা, যেখানে নিরাপত্তার চেয়ে প্রাধান্য পাচ্ছে ঘরে ফেরার আকুলতা।

বুধবার (১৮ মার্চ) থেকে উত্তরবঙ্গে প্রবেশদ্বার ঢাকা-যমুনা সেতু পশ্চিম মহাসড়কের সিরাজগঞ্জের কড্ডা, নলকা, ঝাঔল ওভারব্রিজ ও হাটিকমুরুল গোলচত্বরে দেখা গেছে এমনই দৃশ্য।

আরো পড়ুন:

বৃহস্পতিবার (১৯ মার্চ) সকালেও দেখা গেছে ঢাকা-যমুনা সেতু পশ্চিম মহাসড়কে পণ্যবাহী ট্রাক ও পিকআপের ছাদে গাদাগাদি করে বসে আছেন অনেকে। কেউ দাঁড়িয়ে, কেউ বসে, কেউবা একে অপরকে শক্ত করে ধরে আছেন। প্রতি বছর ঈদ এলেই এভাবেই রাজধানীসহ বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ছুটে চলে হাজারো শ্রমজীবী মানুষ।

বেশকয়েক যাত্রীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দীর্ঘক্ষণ বাসের জন্য অপেক্ষা করেও টিকিট না পাওয়া এবং ভাড়া দ্বিগুণ-তিনগুণ বেড়ে যাওয়ায় বাধ্য হয়ে এ ধরনের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তারা। বলেন, এমন ঈদযাত্রায় জীবনের ঝুঁকি আছে জানি, কিন্তু পরিবারের সঙ্গে ঈদ করতে না পারার কষ্ট তার চেয়েও বেশি।

ঢাকা থেকে বগুড়ায় রওনা দেওয়া গার্মেন্টস কর্মী রাশেদা বেগমের বলেন, “ ৫০০ টাকার ভাড়া ৮০০ টাকা। একটি বাসে অনেক যাত্রীও নেওয়া হয়। টিকিটও পাওয়া যায় না। আমার বাচ্চারা অপেক্ষা করে আছে। কষ্ট হলেও ৩০০ টাকায় ট্রাকে উঠতে পেরেছি। সন্তানদের জন্য কষ্ট ও ভয় ভুলে বাড়িতে যাচ্ছি।” 

তার পাশে বসা আরেক যাত্রী রাজমিস্ত্রী মমিন মিয়া বলেন, “ভাই, ভয় তো লাগে। কিন্তু বাড়িতে না গেলে মায়ের মুখটা দেখব কীভাবে? এই ঝুঁকি নিয়েই যাই, আল্লাহ ভরসা।” 

শুধু যাত্রীদের গল্পই নয়, এই যাত্রার নীরব সাক্ষী চালকরাও। নাটোরগামী সিমেন্টবোঝাই ট্রাকচালক শুক্কুর আলী বলেন, “আমরা জানি এটা ঠিক না। কিন্তু মানুষ এতো অনুরোধ করে যে ফিরিয়ে দিতে পারি না। কেউ কেউ বেশি ভাড়া দেয়, আবার কারও চোখের পানি দেখলেও না বলা যায় না। তবে ভয় সব সময়ই থাকে একটু ভুল হলেই বড় দুর্ঘটনা।”

শুধু যাত্রী নয়, চালকরাও রয়েছেন চাপের মুখে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক পিকআপের চালক বলেন, “সামনে ঈদ সবাই বাড়িতে যাওয়ার জন্য রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকে। কিন্তু কিছু বাসের শ্রমিকেরা বেশি লাভের আশায় ভাড়া অতিরিক্ত নেওয়ার কারণে এই মানুষগুলো ট্রাক ও পিকআপে ওঠে ঝুঁকি নিয়ে বাড়িতে যায়।”

তিনি আরো বলেন, “পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে চলতে হয়, আবার দুর্ঘটনার ভয়ও সবসময় থাকে।” 

কড্ডার মোড় এলাকায় রড-সিমেন্ট ব্যবসায়ী লিয়াকত হোসেন বলেন, “এভাবে ট্রাকের ছাদে যাত্রী বহন করা অত্যন্ত বিপজ্জনক। অতিরিক্ত ওজন, ভারসাম্যহীনতা, হঠাৎ ব্রেক যেকোনো মুহূর্তেই ঘটতে পারে প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা।”

দি বার্ড সেফটি হাউজের চেয়ারম্যান ও সমাজকর্মী মামুন বিশ্বাস বলেন, “শহরে কঠোর পরিশ্রম করে জীবন কাটানো মানুষগুলো যখন বছরে একবার ঘরে ফিরতে চায়, তখন তাদের জন্য নিরাপদ পথ তৈরি করা রাষ্ট্রের নৈতিক দায়িত্ব। তবুও প্রশ্ন থেকে যায় কেন ভালোবাসার টানে ঘরে ফেরার এই যাত্রা এতটা ঝুঁকিপূর্ণ হবে?”

হাটিকুমরুল হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ইসমাইল হোসেন বলেন, “ট্রাকের ছাদে যাত্রী পরিবহন সম্পূর্ণ বেআইনি এবং অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। আমরা প্রতিনিয়ত মহাসড়কে নজরদারি করছি এবং যাত্রীদের নিরাপদ যানে ভ্রমণের জন্য সচেতন করছি। কিন্তু যাত্রীদের অসচেতনতা ও পরিবহন সংকটের কারণে এ ধরনের ঘটনা বন্ধ করা কঠিন হয়ে পড়ছে।” 

ঢাকা/অদিত্য রাসেল/ইভা 

সম্পর্কিত বিষয়:

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়