টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে হাওরাঞ্চলে বিপর্যস্ত জনজীবন
হবিগঞ্জ প্রতিনিধি || রাইজিংবিডি.কম
কয়েকদিনের বৃষ্টি আর উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে হবিগঞ্জের বিস্তীর্ণ হাওরাঞ্চলে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে জনজীবন। হাওরের বিস্তীর্ণ এলাকা পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় সংকটের মুখে পড়েছেন কৃষকরা। তারা জানান, বোরো ধান কাটার মৌসুমে এমন পরিস্থিতি তাদের সব স্বপ্ন শেষ করে দিচ্ছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্র জানায়, ভারী বর্ষণের কারণে ইতোমধ্যে প্রায় ৫ হাজার হেক্টর ধানি জমি পানিতে তলিয়ে গেছে।
জেলার বানিয়াচং, আজমিরীগঞ্জ ও লাখাই উপজেলার বিভিন্ন হাওরে এখন করুণ দৃশ্য। কৃষকরা কোমর এমনকি বুকসমান পানিতে নেমে চেষ্টা করছেন ধান কাটার। ছোট নৌকা ব্যবহার করে কাটা ধান নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চলছে। অনেক জায়গায় বাতাসের তীব্রতায় ধান গাছ মাটিতে লুটিয়ে পড়ায় ফসল সংগ্রহ করতে অতিরিক্ত শ্রম ও সময় লাগছে তাদের। পানিতে দীর্ঘ সময় কাজ করায় অনেক কৃষক শারীরিক সমস্যায় আক্রান্ত হচ্ছেন।
বানিয়াচং হাওর এলাকার কৃষক সমুজ মিয়া ও রিপন মিয়ার অভিযোগ, কৃষি বিভাগ থেকে যে সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছিল তা ছিল অত্যন্ত স্বল্প সময়ের। হঠাৎ পানি বেড়ে যাওয়ায় তারা ধান কাটার প্রস্তুতির সুযোগ পাননি। এছাড়া, বৃষ্টির কারণে কেটে রাখা ধান ভিজে পচে যাওয়ারও ব্যাপক সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।
কৃষি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নিচু এলাকার ধান দ্রুত কাটার জন্য কৃষকদের নিয়মিত পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। বৈরী আবহাওয়ার কারণে শ্রমিক সংকট ও ধান শুকানোর জায়গা না থাকায় কৃষকরা ফসল ঘরে তুলতে হিমশিম খাচ্ছেন। হবিগঞ্জের হাওরাঞ্চলে চলমান এই দুর্যোগ কৃষকদের আগামী দিনের খাদ্য নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক অবস্থাকে অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে।
আজমিরীগঞ্জের কৃষক সুজন মিয়া জানান, প্রতি বছরই এই সময়ে তারা প্রাকৃতিক দুর্যোগের আশঙ্কায় থাকেন। তবে, এবারের পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ। কয়েকদিনের বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে হাওরাঞ্চলের বিস্তীর্ণ বোরো ফসলি জমি পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে। পাশাপাশি বজ্রপাতের কারণেও অনেক শ্রমিক হাওরে কাজ করতে আসছেন না। এতে ধান কাটার কাজ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
অনেক কৃষক ধান কেটে খলায় জমা করে রেখেছিলেন। হঠাৎ পানি ঢুকে সেই ধানের খলাও তলিয়ে যেতে শুরু করেছে। কোথাও কোথাও ত্রিপল দিয়ে ঢেকে রাখার চেষ্টা করা হলেও জলাবদ্ধতা ও পানির চাপে তা কার্যকর হচ্ছে না বলে জানান অনেক কৃষক।
এদিকে, বুধবার (২৯ এপ্রিল) বিকেলে জেলার বানিয়াচং উপজেলার সুজাতপুরের দত্তগাঁও অংশে খোয়াই নদীর বাঁধ ভেঙে ও উপচে পানি হাওরে প্রবেশ করতে শুরু করে। মুহূর্তের মধ্যে শত শত একর ফসলি জমি প্লাবিত হয়।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানায়, এ বছর জেলার ৯ উপজেলায় ১ লাখ ২৩ হাজার ৬৪৪ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে। লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৭ লাখ ৯৪ হাজার ৪০০ মেট্রিক টন ধান, যা থেকে ৫ লাখ ২৯ হাজার ৬০০ মেট্রিক টন চাল উৎপাদন সম্ভব। যার সম্ভাব্য বাজারমূল্য প্রায় ২ হাজার ৩৮৩ কোটি ২০ লাখ টাকা।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মোহাম্মদ আনোয়ারুল হক জানান, ভারী বর্ষণের কারণে ইতোমধ্যে প্রায় ৫ হাজার হেক্টর ধানি জমি পানিতে তলিয়ে গেছে। এখনো মোট আবাদ করা ধানের ৪৯ শতাংশ কাটা বাকি। বৃষ্টি ও পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে ক্ষতি আরো বাড়তে পারে। মাঠ পর্যায়ে কর্মকর্তারা সার্বক্ষণিক কাজ করছেন।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী ছায়েদুর রহমান জানান, গেল ২৪ ঘণ্টায় হবিগঞ্জে ১১০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছে। বাঁধ পরিদর্শন করা হচ্ছে। কালনী-কুশিয়ারা নদীর পানি বিপৎসীমার ১৬০ সেন্টিমিটার নিচে রয়েছে।
ঢাকা/মামুন/মাসুদ