দিনে স্কুল, রাতে মাদকের আস্তানা
নোয়াখালী প্রতিনিধি || রাইজিংবিডি.কম
নোয়াখালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একটি শ্রেণিকক্ষ।
নোয়াখালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হয় ১৯৬৭ সালে। ৫৯ বছর ধরে প্রতিষ্ঠানটি এলাকায় শিক্ষার আলো ছড়ালেও বর্তমানে নানা সংকটে জর্জরিত। শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়লেও বাড়েনি অবকাঠামোগত সুবিধা। জরাজীর্ণ ভবনে গাদাগাদি করে চলছে পাঠদান। এরই মধ্যে নতুন আতঙ্ক হয়ে দাঁড়িয়েছে মাদক সেবীদের আড্ডা। সন্ধ্যা থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে তারা আড্ডা দেয় ও মাদক সেবন করে বলে অভিযোগ এলাকাবাসীর।
তাদের ভাষ্য, মাদক সেবীরা বিদ্যালয়ের ফ্যান, লাইট, চেয়ার-টেবিল পর্যন্ত বিক্রি করে দিয়েছে মাদকের টাকা জোগাড়ের জন্য। ফলে শিক্ষার পরিবেশ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। দ্রুত বিদ্যালয়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে নতুন ভবন নির্মাণ এবং প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণ সরবরাহ করার দাবি জানিয়েছেন তারা।
নোয়াখালী পৌরসভার ৫ নম্বর ওয়ার্ডে অবস্থিত এই বিদ্যালয়ে সরেজমিনে দেখা যায়, টিনশেড ভবনের কয়েকটি কক্ষে নেই জানালা-দরজা। অনেক কক্ষে ফ্যান ও লাইট নেই। কিছু শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের বসার মতো পর্যাপ্ত চেয়ার-টেবিল নেই। ফলে চরম দুর্ভোগের মধ্যেই চলছে শিক্ষা কার্যক্রম।
নোয়াখালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী নুসরাত জাহান বলে, “গরমের সময় আমাদের ক্লাস করতে খুবই কষ্ট হয়। ফ্যান নেই, ঠিকমতো বসার বেঞ্চও নেই। অনেক সময় জায়গা না থাকায় দাঁড়িয়ে ক্লাস করতে হয়। আমাদের পড়ালেখার ক্ষতি হয়।”
স্থানীয় বাসিন্দা গোলাম হােসেন বলেন, “এটি আমাদের এলাকার পুরোনো ও ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। বহু শিক্ষার্থী এখান থেকে পড়ালেখা করে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বর্তমানে বিদ্যালয়ের অবস্থা খুবই খারাপ। সন্তানদের নিরাপদ ও সুন্দর পরিবেশে পড়াতে পারছি না, যা অভিভাবকদের জন্যও উদ্বেগের বিষয়।”
বিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী শাকিল আহমেদ বলেন, “এই স্কুলে আমার বাবা-মা শিক্ষকতা করেছেন। আমরা তিন ভাই-বোনও এখানেই পড়ালেখা করেছি। যে প্রতিষ্ঠান থেকে আমাদের শিক্ষাজীবনের শুরু, সেই স্কুলের এমন দুরবস্থা দেখে খুব কষ্ট লাগে। দ্রুত ভবন সংস্কার, প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র সরবরাহ এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি।”
কাজী শাহেদ আহমেদ নামে স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, “সন্ধ্যার পরপরই এই স্কুলে মাদক সেবীদের আনাগোনা বেড়ে যায়। তারা সেখানে বিভিন্ন ধরনের মাদক সেবন করে। মাদক সেবী হওয়ায় ভয়ে তাদের কেউ কিছু বলে না।”
জাহাঙ্গীর আলম নামে আরেকজন বলেন, “মাদক সেবীরা সন্ধ্যার পরপরই বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে জড়ো হতে থাকে। তাদের বয়সের ভিন্নতা রয়েছে, তবে মাদক সেবনের ক্ষেত্রে তারা সবাই একই। তারা সবাই এলাকায় চিহ্নিত।”
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শামীমা আফরোজ বলেন, “বিদ্যালয়ের বিভিন্ন সমস্যা সম্পর্কে আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে একাধিকবার অবহিত করেছি। ভবন সংস্কার, প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র সরবরাহ, শ্রেণিকক্ষের পরিবেশ উন্নয়ন এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদারের দাবি জানিয়েছি। আশা করছি, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।”
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ইশরাত নাসিমা হাবীব বলেন, “বিষয়গুলো অত্যন্ত দুঃখজনক ও উদ্বেগজনক। এ ক্ষেত্রে সামাজিক সচেতনতা বাড়ানো জরুরি। বিদ্যালয়ের নতুন ভবন নির্মাণের বিষয়েও উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। সামনে কোনো প্রকল্প এলে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
সুধারাম মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) তৌহিদুল ইসলাম বলেন, “এ বিষয়ে কেউ থানায় কোনো অভিযোগ করেননি। এরপরও টহল পুলিশকে স্কুলটির দিকে নজর রাখতে নির্দেশ দেব।”
ঢাকা/সুজন/মাসুদ