ঢাকা     সোমবার   ১১ মে ২০২৬ ||  বৈশাখ ২৮ ১৪৩৩ || ২৩ জিলকদ ১৪৪৭ হিজরি

Risingbd Online Bangla News Portal

ধসে পড়ছে টিলার মাটি: আতঙ্কে ত্রিপুরা পল্লীর ২৪টি পরিবার 

মো. মামুন চৌধুরী, হবিগঞ্জ  || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৩:০৯, ১১ মে ২০২৬   আপডেট: ১৩:১০, ১১ মে ২০২৬
ধসে পড়ছে টিলার মাটি: আতঙ্কে ত্রিপুরা পল্লীর ২৪টি পরিবার 

হবিগঞ্জের চুনারুঘাটের সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানের টিলার ওপর গড়ে ওঠা ত্রিপুরা পল্লীর ২৪টি ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর পরিবার এখন চরম অনিশ্চয়তা ও আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। টানা বৃষ্টি আর পাহাড়ি ছড়ার ভাঙনে ধসে পড়ছে তাদের বসবাসের টিলার মাটি। বছরের পর বছর ধরে চলা ধসে ইতোমধ্যে টিলার বড় একটি অংশ বিলীন হয়েছে। ভেঙে পড়েছে পল্লী থেকে বের হওয়ার একমাত্র ব্রিজটির এক পাশ। 

পল্লীর বাসিন্দারা জানান, বর্ষা এলেই আতঙ্ক বেড়ে যায়। ভারী বৃষ্টিপাত শুরু হলেই টিলার মাটি ধসে পড়ে। ছড়ায় পানি বাড়লে বাইরের সঙ্গে যোগাযোগ পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। তখন স্কুলগামী শিক্ষার্থী, অসুস্থ ও বয়স্ক মানুষদের চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয়। অনেক সময় জরুরি প্রয়োজনে বের হওয়ারও উপায় থাকে না।

আরো পড়ুন:

ত্রিপুরা পল্লীর হেডম্যান চিত্তরঞ্জন দেববর্মা বলেন, “এই পাহাড়ে আমাদের জন্ম, মৃত্যুও যেন এখানেই হয়। জায়গাটা আমাদের কাছে খুব প্রিয়। আমরা কখনো টিলা কাটি না, বরং টিলা রক্ষার চেষ্টা করি। কিন্তু টিলা কাটা চক্রের কাছে আমরা অসহায়। ছোটবেলায় যে ছড়াগুলো ছোট দেখেছি, এখন সেগুলো বড় হয়ে ভয়ংকর রূপ নিয়েছে। সামনের দিনে কী হবে জানি না।”

তিনি জানান, স্বাধীনতার পর সরকারি সিদ্ধান্তে বন বিভাগের অনুমতিতে তারা এ টিলায় বসবাস শুরু করেন। দীর্ঘদিন ধরে সেখানে বসবাস করলেও এখন টিলা ধসে তাদের অস্তিত্বই হুমকির মুখে পড়েছে। পল্লী থেকে বের হওয়ার একমাত্র ব্রিজটির এক পাশের মাটি সরে গিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। ফলে বিকল্প দুর্গম পথ ব্যবহার করে চলাচল করতে হচ্ছে।

চিত্তরঞ্জনের স্ত্রী সন্ধ্যা রাণী দেববর্মা বলেন, “২০১৭ সালে প্রথম বড় ধরনের টিলা ধস শুরু হয়। তখন তিনটি পরিবার নিজেদের বসতভিটা ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়। পরে আরো দুইটি পরিবার সরে গেছে। এখন পুরো টিলাটাই ঝুঁকিতে রয়েছে। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে আরো পরিবার গৃহহীন হয়ে পড়বে।”

তিনি বলেন, “এই টিলাগুলো শুধু মানুষের বসবাসের জায়গা নয়, জীববৈচিত্র্য রক্ষার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ। টিলা ধসে গেলে পরিবেশেরও ক্ষতি হবে। আমরা চাই, দ্রুত ব্রিজটি মেরামত এবং টিলা রক্ষায় কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হোক।”

পল্লীর বাসিন্দা শাহিন দেববর্মা বলেন, “বৃষ্টি হলেই টিলা ধসে পড়ে। এভাবে ধসে ধসে প্রায় অর্ধেক টিলা বিলীন হয়ে গেছে। যাতায়াতের ব্রিজটিও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। দ্রুত ব্রিজ মেরামত এবং টিলা রক্ষায় স্থায়ী প্রকল্প নেওয়া প্রয়োজন।”

তিনি বলেন, ‍“প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যে ঘেরা সাতছড়ির এই ত্রিপুরা পল্লী এখন ধীরে ধীরে হারিয়ে যাওয়ার শঙ্কায়। পাহাড়, বন আর ছড়ার সঙ্গে মিশে থাকা কয়েক প্রজন্মের স্মৃতি বাঁচাতে এখন জরুরি হয়ে পড়েছে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ। নইলে একদিন হয়তো মানচিত্র থেকেই হারিয়ে যাবে পাহাড়ঘেরা এই ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর বসতি।”

বাংলাদেশ বন বিভাগের সাতছড়ি বন্যপ্রাণী রেঞ্জের রেঞ্জ কর্মকর্তা মেহেদি হাসান বলেন, “সাতছড়ি উদ্যান ভ্রমণপিপাসুদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয়। কিন্তু টানা বৃষ্টিতে ত্রিপুরা পল্লীসহ বিভিন্ন টিলা ধসে পড়ছে। গাছপালাও ভেঙে যাচ্ছে। পল্লীর একমাত্র ব্রিজটি টিলা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় দ্রুত টিলা সংরক্ষণ ও প্রাচীর নির্মাণ জরুরি। পাশাপাশি ব্রিজটিও মেরামত করতে হবে। এজন্য বড় ধরনের বরাদ্দ প্রয়োজন।” 

তিনি জানান, পানি উন্নয়ন বোর্ড থেকে সম্ভাব্য বরাদ্দ পাওয়ার আশায় সংশ্লিষ্টরা অপেক্ষা করছেন।

চুনারুঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) গালিব চৌধুরী বলেন, “ত্রিপুরা পল্লী রক্ষায় টিলা মেরামতের জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে। বরাদ্দ পাওয়া মাত্র দ্রুত কাজ শুরু করা হবে। উপজেলা প্রশাসন সবসময় পল্লীবাসীর খোঁজখবর রাখছে এবং যে কোনো পরিস্থিতিতে তাদের পাশে থাকবে।”

ঢাকা/মাসুদ

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়