জনগণের রায়ের সঙ্গে গাদ্দারি করলে কেউ টিকতে পারবে না: জামায়াত আমির
রাজশাহী প্রতিনিধি || রাইজিংবিডি.কম
শনিবার বিকেলে রাজশাহীর ঐতিহাসিক মাদ্রাসা ময়দানে সমাবেশে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও জাতীয় সংসদের বিরোধী দলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, “জনগণের দেওয়া রায়ের সঙ্গে গাদ্দারি করলে কেউ টিকে থাকতে পারবে না।” বিএনপি দলীয় কোটায় ৫২ জেলায় প্রশাসক নিয়োগ দিয়ে নিজেদের ইশতেহারের সঙ্গেই বেঈমানি করেছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
শনিবার (১৬ মে) বিকেলে রাজশাহীর ঐতিহাসিক মাদ্রাসা ময়দানে আয়োজিত বিভাগীয় সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এ অভিযোগ করেন জামায়াতের আমির।
গণরায় বাস্তবায়ন, ফারাক্কা চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশের ন্যায্য পানির হিস্যা নিশ্চিতের দাবিতে রাজশাহীতে বিভাগীয় সমাবেশ করেছে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দল। সমাবেশ থেকে সরকার, ভারত এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের প্রতি কঠোর বার্তা দিয়েছেন বিরোধী দলীয় নেতা ও জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান।
ভারতের উদ্দেশে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে তিনি বলেন, “বাংলাদেশের শান্তি নিয়ে টান দিলে কাউকে শান্তিতে থাকতে দেওয়া হবে না।” কারো রক্তচক্ষুর দিকে না তাকিয়ে তিস্তা ও পদ্মায় পানি আনার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পের প্রসঙ্গ টেনে জামায়াত আমির বলেন, “এটি যেন শুধু লোক দেখানো প্রকল্প না হয়। জনগণ এর বাস্তবায়ন দেখতে চায়।”
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, “দেশে রাজনৈতিক পরিবর্তন হঠাৎ করে আসেনি; এর পেছনে রয়েছে বহু মানুষের ত্যাগ ও রক্ত। বিশেষ করে, তরুণ প্রজন্ম ভয়কে জয় করে রাজপথে নেমেছিল বলেই ফ্যাসিবাদী শাসনের পতন সম্ভব হয়েছে। যে তরুণ-তরুণীরা বুক চিতিয়ে গুলির মুখে আন্দোলন করেছে, জনগণ তাদের ডাকে সাড়া দিয়েছিল। নারী-পুরুষ, শিশু-কিশোর, যুবক-বৃদ্ধ সবাই রাস্তায় নেমে এসেছিল বলেই আন্দোলন সফল হয়েছে।”
তিনি অভিযোগ করেন, আজ যারা ক্ষমতায় বসে আছেন, তারাই এখন আন্দোলনের সেই শক্তিকে অবমূল্যায়ন করছেন। জনগণের রায় অগ্রাহ্য করলে অতীতে যেভাবে স্বৈরশাসকদের পতন হয়েছে, বর্তমান সরকারের পরিণতিও ভিন্ন হবে না।
সরকারের সংস্কার কার্যক্রমের সমালোচনা করে জামায়াত আমির বলেন, “নির্বাচনের আগে তারা সংবিধান সংস্কার ও সুশাসনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু, ক্ষমতায় গিয়ে এখন সেই প্রতিশ্রুতির বিরুদ্ধেই অবস্থান নিচ্ছে।”
তিনি বলেন, “আপনারাই বলেছিলেন, দেশকে মেরামত করতে হবে; সংবিধানের সংস্কার করতে হবে। এখন বলছেন, সংস্কার কী জিনিস, তা বুঝেন না। তাহলে কি না বুঝেই এসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন?”
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, “স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় অনির্বাচিত প্রশাসক নিয়োগ দিয়ে সরকার নিজেদের ইশতেহারের সঙ্গেই বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতিও বাস্তবায়ন করা হয়নি।”
বিরোধী দলীয় নেতা বলেন, “গুম, খুন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের সংস্কৃতি বন্ধে স্বাধীন কমিশন গঠনের প্রয়োজন ছিল। কিন্তু, সরকার তা না করে উল্টো বিচার বিভাগ ও প্রশাসনকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে চাইছে। যে পথে অতীতে স্বৈরাচার হেঁটেছিল, আপনারাও একই পথে হাঁটছেন।”
দুর্নীতি ও চাঁদাবাজির প্রসঙ্গ টেনে জামায়াত আমির বলেন, “দেশে এখন সর্বত্র চাঁদাবাজি ও দখলবাজির মহাউৎসব চলছে। ক্ষমতাসীনদের কেউই চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিচ্ছে না। মানুষ এখন বলতে শুরু করেছে, মাথা থেকে পায়ের পাতা পর্যন্ত সবাই চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত। না হলে কেন এসব বন্ধ হচ্ছে না?”
বাংলাদেশ ব্যাংকসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে অযোগ্য ও দলীয় লোক নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও দলীয় বিবেচনায় নিয়োগ দেওয়ার সমালোচনা করে তিনি বলেন, “এর ফলে শিক্ষা ও প্রশাসন ব্যবস্থা ধ্বংসের মুখে পড়ছে। প্রশাসনে যদি দক্ষ, যোগ্য ও দেশপ্রেমিক মানুষদের সরিয়ে দলকানা লোক বসানো হয়, তাহলে এর খেসারত শুধু জাতিকেই নয়, সরকারকেও দিতে হবে।”
সমাবেশে তিস্তা ও পদ্মার পানির ন্যায্য হিস্যার বিষয়ে জোরালো বক্তব্য দেন জামায়াত আমির। তিনি বলেন, “ফারাক্কা বাঁধের কারণে পদ্মা এখন শুকনো মৌসুমে প্রায় মরুভূমিতে পরিণত হয় এবং বর্ষায় সৃষ্টি হয় ভয়াবহ দুর্ভোগ।”
তিস্তা মহাপরিকল্পনা দ্রুত বাস্তবায়নের আহ্বান জানিয়ে বলেন, “তিস্তার পানি আমাদের ন্যায্য পাওনা, পদ্মার পানিও আমাদের ন্যায্য পাওনা। দেশের ১৫৪টি অভিন্ন নদী আজ মৃতপ্রায় হয়ে গেছে।” নদীগুলোতে নাব্য ফিরিয়ে আনতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানান তিনি।
প্রতিবেশী দেশের প্রসঙ্গ টেনে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, “বাংলাদেশ শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানে বিশ্বাস করে। তবে দেশের দিকে লাল চোখ দেখানো হলে জনগণ তা মেনে নেবে না। এটা তিতুমীর ও হাজী শরীয়তুল্লাহর বাংলাদেশ। আমাদের শান্তিতে আঘাত করলে কারও শান্তি থাকবে না।”
সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বিষয়ে তিনি বলেন, “বাংলাদেশ মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টান সব ধর্মের মানুষের দেশ। এখানে সবাই সমান নাগরিক অধিকার ভোগ করবে এবং কোনো সাম্প্রদায়িক অশান্তি সৃষ্টি করতে দেওয়া হবে না।”
তিনি বলেন, “সংসদে জনগণের দাবি আদায়ের চেষ্টা করা হবে। কিন্তু, সেখানে কথা বলতে না দেওয়া হলে রাজপথেই জনগণের পার্লামেন্ট গড়ে উঠবে।”
তিনি দেশ ও জনগণের স্বার্থে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘জান দেব, কিন্তু দেশের মান দেব না, ইনশাল্লাহ।”
জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও উত্তরাঞ্চলের পরিচালক মাওলানা রফিকুল ইসলাম খানের সভাপতিত্বে সমাবেশে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন— লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল অলি আহমদ বীর বিক্রম, জামায়াতের সিনিয়র নায়েবে আমির অধ্যাপক মুজিবুর রহমান, এনসিপির মুখ্য সংগঠক (উত্তরাঞ্চল) সারজিস আলম, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব আল্লামা জালালুদ্দিন আহমদ, নেজামে ইসলাম পার্টির আমির আব্দুল কাইয়ুম সোবহানী, খেলাফত মজলিসের নায়েবে আমির অধ্যাপক সিরাজুল হক, জামায়াতের ঢাকা মহানগর দক্ষিণের আমির ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর আসনের সংসদ সদস্য নুরুল ইসলাম বুলবুল, এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, জাতীয় নারী শক্তির আহ্বায়ক ও এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক মনিরা শারমিন প্রমুখ।
ঢাকা/মাহী/রফিক
বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) পরিচালনা পর্ষদ নির্বাচন ৭ জুন