আক্ষেপ পেরিয়ে গর্ব, জীবনদর্শনে অনুকরণীয় মুশফিকুর
ক্রীড়া প্রতিবেদক, সিলেট থেকে || রাইজিংবিডি.কম
অর্ধেক ম্যাচ খেলেই বাংলাদেশের টেস্ট ইতিহাসে অন্যতম সফল অধিনায়কদের কাতারে উঠে এসেছেন নাজমুল হোসেন শান্ত। ঢাকা টেস্টে পাকিস্তানকে হারানোর মধ্য দিয়ে অধিনায়ক হিসেবে সপ্তম টেস্ট জয়ের দেখা পেয়েছেন তিনি। এতদিন এই রেকর্ডটি ছিল শুধুই মুশফিকুর রহিমের দখলে।
২০১১ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত ৩৪ টেস্টে নেতৃত্ব দিয়ে বাংলাদেশকে ৭টি জয় এনে দিয়েছিলেন মুশফিকুর। আর ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে দায়িত্ব নেওয়ার পর মাত্র ১৭ ম্যাচেই সেই সংখ্যায় পৌঁছে গেছেন শান্ত। ফলে পরিসংখ্যান বলছে, বাংলাদেশের টেস্ট ইতিহাসে সবচেয়ে দ্রুত সফলতার ছাপ রাখা অধিনায়কদের একজন এখন শান্ত।
তবে মুশফিক ও শান্তর নেতৃত্বের সময়ের পার্থক্যই মূলত এই তুলনাকে আলাদা মাত্রা দিয়েছে। মুশফিক যখন দলকে নেতৃত্ব দিয়েছেন, তখন বাংলাদেশের টেস্ট দল ছিল অনেকটাই অগোছালো। নিয়মিত টেস্ট খেললেও ম্যাচ জয়ের মতো ভারসাম্যপূর্ণ বোলিং আক্রমণ ছিল না। স্পিনে শক্তিশালী হলেও পেস বিভাগ ছিল অনিয়মিত ও অভিজ্ঞতার ঘাটতিতে ভোগা।
টেস্ট ম্যাচ জিততে হলে ২০ উইকেট নেওয়ার বিকল্প নেই। কিন্তু অধিনায়ক মুশফিকের হাতে তখন নিয়মিত ম্যাচ জেতানোর মতো পর্যাপ্ত বোলিং শক্তি ছিল না। এখনকার বাংলাদেশ দলে সেই জায়গায় এসেছে বড় পরিবর্তন। শান্তর হাতে আছে একাধিক ম্যাচজয়ী বোলার, যারা নিয়মিত দলকে সাফল্য এনে দিচ্ছেন।
অতীত নিয়ে তাই মুশফিকুরের কণ্ঠে ছিল খানিক আক্ষেপ, আবার বর্তমান নিয়ে ছিল গর্বও।
“আগে টেস্ট ক্রিকেটে আমাদের বোলিং বিভাগে অভিজ্ঞতার কিছু ঘাটতি ছিল। আমি যখন অধিনায়কত্ব করেছি, তখন ভালো ব্যাটসম্যান ছিল, কিন্তু নিয়মিত উইকেট এনে দিতে পারে এমন চারজন বোলার ছিল না। হয়তো একজন-দুজন ছিল, তাই কাজটা কঠিন হয়ে যেত।”
বর্তমান দল নিয়ে মুশফিকের আত্মবিশ্বাস স্পষ্ট তার কথায়, “এখন পরিস্থিতি বদলেছে। আমাদের বোলিং আক্রমণে ভারসাম্য আছে, বৈচিত্র্যও অনেক বেড়েছে। স্পিন, পেস কিংবা স্পোর্টিং। যেকোনো ধরনের উইকেটেই ফল বের করে আনার মতো সামর্থ্য এখন দলের আছে। স্পিনাররা তো বরাবরই আমাদের শক্তি। এখন পেস বোলিংয়েও ভালো অপশন যোগ হওয়ায় দল আরও ভারসাম্যপূর্ণ হয়েছে। ব্যাটসম্যানরা যদি ধারাবাহিকভাবে ভালো খেলতে পারে, যেটা গত তিন-চার বছরে বেশ ভালোভাবেই হচ্ছে। তাহলে এটি দলের জন্য বড় ইতিবাচক দিক। একজন অধিনায়কের জন্যও এটা অনেক স্বস্তির।”
তবে সামর্থ্যবান ক্রিকেটারদের ‘তরুণ’ বা ‘অভিজ্ঞ’ তকমায় বিচার করতে চান না মুশফিক। তার মতে, অভিজ্ঞতা শুধু আন্তর্জাতিক ম্যাচের সংখ্যায় নির্ধারিত হয় না।
“এখন অনেকে বলে পেসাররা তরুণ, কিন্তু আমি ‘তরুণ’ শব্দটাকে সেভাবে দেখি না। শুধু টেস্ট খেললেই অভিজ্ঞতা হয় না। যেমন রানা, সে হয়তো টেস্টে নতুন, কিন্তু অনেক বছর ধরে ফার্স্ট ক্লাস ক্রিকেট, জাতীয় দল এবং বিভিন্ন পর্যায়ে খেলছে। সেই দিক থেকে বললে, বিশেষ করে টেস্ট ক্রিকেটে আমাদের বোলিং বিভাগ এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি উইকেট নেওয়ার সক্ষমতা অর্জন করেছে।”
মুশফিকের অধিনায়কত্বের সময় পেসারদের মধ্যে রবিউল ইসলাম ৭ ম্যাচে সর্বোচ্চ ২২ উইকেট নিয়েছিলেন। মোস্তাফিজুর রহমান ৮ ম্যাচে পেয়েছিলেন ২০ উইকেট। রুবেল হোসেন ১৬ ম্যাচে নিয়েছিলেন ১৭ উইকেট। এছাড়া শফিউল ইসলাম, শুভাশিষ রায়, কামরুল ইসলাম রাব্বী, তাসকিন আহমেদ, আল-আমিন হোসেন কিংবা মোহাম্মদ শহীদদের কেউই ধারাবাহিকভাবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে পারেননি। অন্যদিকে বর্তমান স্কোয়াডে তাসকিন, শরিফুল, ইবাদত, নাহিদ, হাসান ও খালেদদের মতো পেসাররা এখন দলের বড় শক্তি হয়ে উঠেছেন।
বাংলাদেশের হয়ে ১০২ টেস্ট খেলা মুশফিক বিশ্বাস করেন, দলের উন্নতি চোখে পড়ার মতো হলেও সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখন ধারাবাহিকতা ধরে রাখা, “এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, পাঁচ দিন ধরে পরিকল্পনাটা ঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা। আমার মতে, আমাদের উন্নতি এখন পর্যন্ত খুবই ভালো। তবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো ধারাবাহিকতা ধরে রাখা। দল হিসেবে যদি আগামী দুই-তিন বছর আমরা সেই ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে পারি, তাহলে টেস্ট ক্রিকেটে বাংলাদেশ আরও ভালো অবস্থানে পৌঁছাবে।”
বাংলাদেশের টেস্ট দলের এই পরিবর্তনের পেছনে শুধু নেতৃত্ব নয়, নিবেদিতপ্রাণ ক্রিকেটারদের অবদানও বড় করে দেখছেন মুশফিক। বিশেষ করে মুমিনুল হক ও তাইজুল ইসলামের কথা আলাদা করে উল্লেখ করেছেন তিনি, “দলের পরিবেশটা আমার কাছে অবশ্যই খুব ভালো মনে হয়। আর আমার ক্যারিয়ারের প্রায় শেষ দিকে এসে প্রতিটা দিনই এখন আমার জন্য আশীর্বাদের মতো। আমি সত্যিই খুব উপভোগ করছি। সবসময়ই টেস্ট ক্রিকেটকে আমি আলাদা গুরুত্ব দিয়েছি। আর বাংলাদেশ টেস্ট ক্রিকেট আজ যে জায়গায় এসেছে, তার পেছনে দুজন মানুষের অবদান আমি বিশেষভাবে দেখি, মুমিনুল হক ও তাইজুল ইসলাম।”
“গত দুই-তিন বছর ধরে আমি মূলত একটি ফরম্যাট খেলছি, তাই খুব সহজেই তাদের কষ্টটা অনুভব করতে পারি। কারণ গত ১০-১২ বছর ধরে তারা কোনো অভিযোগ ছাড়াই প্রতিদিন নিজেদের কাজ করে গেছে, একই প্রক্রিয়া অনুসরণ করেছে। কিন্তু বিষয়টা মোটেও সহজ নয়। সেই জায়গা থেকে আমি যতটুকু খেলি, তাদের দিকে তাকিয়ে আমার আরও ভালো লাগে। আমি যদি দলের জন্য কিছু অবদান রাখতে পারি, তাহলে তাদের হাসিটা বা আনন্দটা যেন আরও বেড়ে যায়।”
বর্তমান দলে ইতিবাচক পরিবেশ তৈরির পেছনে ধারাবাহিক পারফরমারদের সংখ্যাবৃদ্ধিকেও বড় কারণ হিসেবে দেখছেন তিনি। “দলে এখন খুব ইতিবাচক একটা পরিবেশ আছে। কারণ ধারাবাহিক পারফর্মারের সংখ্যাও অনেক বেড়েছে। একটা দলে যখন নিয়মিত পারফর্মার বেশি থাকে, তখন যেকোনো চ্যালেঞ্জ এলেই কেউ না কেউ দায়িত্ব নিয়ে সামনে দাঁড়ায় এবং সেটা মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত থাকে। আমার কাছে মনে হয়, গত ছয়-সাত বছরে এটাই বাংলাদেশ দলের সবচেয়ে বড় পরিবর্তন।”
সীমিত ওভারের ক্রিকেটকে বিদায় জানানো মুশফিকুরের ভরসা এখন কেবল টেস্ট ক্রিকেট। ৩৯ ছুঁইছুঁই বয়সেও তিনি একই নিবেদন নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন। মাঠের বাইরে তার শৃঙ্খলাপূর্ণ জীবন, আর মাঠের ভেতরে নিজেকে সময়ের সঙ্গে বদলে নেওয়ার ক্ষমতা এখনো তাকে আলাদা করে রাখে।
পেশাদার ক্রিকেটারদের জীবন নিয়ে তার দর্শনও পরিষ্কার, “আমার কাছে মনে হয়, খেলাটা এমন একটি পেশা যার সঙ্গে প্রতারণা করার সুযোগ নেই। এটা এমন নয় যে একদিন মন ভালো থাকলে সকাল ৬টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত কাজ করলাম, আরেকদিন মন না চাইলে সারাদিন ঘুমিয়ে কাটালাম। পেশাদার খেলাধুলা এভাবে চলে না।”
“যেমন সাংবাদিকতায় আপনাদের নিজস্ব নীতিমালা ও দায়িত্ববোধ আছে, অফিসের চাকরিতেও নিয়ম-কানুন থাকে, তেমনি একজন পেশাদার অ্যাথলিটের জীবনেও শৃঙ্খলা, নিয়ম এবং দায়িত্ববোধ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।”
“আমি মনে করি, একজন খেলোয়াড় যতদিন এই শৃঙ্খলা ধরে রাখতে পারবে, ততদিনই সে সফল হতে পারবে। কারণ যেখানে আপনি নিজের শ্রম, মেধা এবং জীবনের অনেক কিছু বিনিয়োগ করছেন, সেখান থেকে যদি সঠিক প্রতিদান পেতে চান, তাহলে এই বিষয়গুলো মেনে চলার বিকল্প নেই।”
বর্তমান প্রজন্মের ক্রিকেটারদের মধ্যেও ইতিবাচক পরিবর্তন দেখছেন মুশফিক, “আমি যখন ক্যারিয়ার শুরু করেছি, তখন আমরা বছরে হয়তো তিন-চার মাস আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলতাম, ঘরোয়া ক্রিকেটসহ মোটামুটি পাঁচ মাস ব্যস্ত থাকতাম। কিন্তু এখন আন্তর্জাতিক ও ঘরোয়া ক্রিকেট মিলিয়ে প্রায় সারা বছরই খেলোয়াড়দের ব্যস্ত থাকতে হয়।”
“এই বাস্তবতায় একজন অ্যাথলিটের জন্য শৃঙ্খলাপূর্ণ জীবনযাপন ও ফিটনেস কতটা গুরুত্বপূর্ণ, সেটা তারা এখন উপলব্ধি করছে। আর এটা দেখে আমি খুবই আনন্দিত। আমি চাই, যাওয়ার আগে এমন একটি ইতিবাচক পরিবেশ রেখে যেতে, যাতে আগামী প্রজন্মের খেলোয়াড়রা এখান থেকে আরও এগিয়ে যেতে পারে এবং বাংলাদেশ ক্রিকেটকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারে।”
ঢাকা/ইয়াসিন/আমিনুল
২৪ ঘণ্টায় হাম ও উপসর্গে ১২ জনের মৃত্যু