ঢাকা     শুক্রবার   ১৫ মে ২০২৬ ||  জ্যৈষ্ঠ ১ ১৪৩৩ || ২৮ জিলকদ ১৪৪৭ হিজরি

Risingbd Online Bangla News Portal

বাজেট নিয়ে কড়া বার্তা প্রধানমন্ত্রীর

গরিবের ওপর চাপ নয়, ধনীদের ওপর সম্পদ কর, কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগে জোর

আসাদ আল মাহমুদ || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৯:৩৯, ১৫ মে ২০২৬   আপডেট: ১৯:৩৯, ১৫ মে ২০২৬
গরিবের ওপর চাপ নয়, ধনীদের ওপর সম্পদ কর, কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগে জোর

ছবি: এআই দিয়ে তৈরি।

দীর্ঘ দুই দশক পর বড় ম্যান্ডেট নিয়ে ক্ষমতায় ফেরা বিএনপি সরকারের প্রথম বাজেট হতে যাচ্ছে সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগ স্থবিরতা, কর্মসংস্থানের চাপ, বৈদেশিক মুদ্রার সংকট আর আইএমএফের শর্তের চাপ। সব মিলিয়ে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটকে ঘিরে প্রত্যাশা যেমন বেশি, ঝুঁকিও তেমনই। এমন বাস্তবতায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান স্পষ্ট করে দিয়েছেন, নতুন বাজেট যেন কোনোভাবেই সাধারণ মানুষের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি না করে। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্তের ওপর নতুন করে কোনো করের বোঝা চাপানো যাবে না।

বৃহস্পতিবার (১৪ মে) সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে ম্যারাথন বৈঠকে তিনি এ নির্দেশনা দেন। বৈঠকে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, অর্থ সচিব ড. মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদার এবং এনবিআর চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান উপস্থিত ছিলেন।

আরো পড়ুন:

বৈঠক সূত্র জানায়, প্রধানমন্ত্রী প্রতিটি কর প্রস্তাব ধরে ধরে দেখেছেন। প্রশ্ন করেছেন, এই প্রস্তাবে চাল-ডাল-তেলের দাম বাড়বে কি না, মধ্যবিত্তের পকেটে টান পড়বে কি না। তার স্পষ্ট কথা, রাজস্ব বাড়ানো জরুরি, কিন্তু তা যেন মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে আরো কঠিন করে না তোলে।

এনবিআর চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান বৈঠক শেষে বলেন, “বাজেটের মূল ফোকাস শিল্প উদ্যোক্তাদের সুবিধা দেওয়া, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং এমন একটি কর ব্যবস্থা তৈরি করা যাতে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় নেতিবাচক প্রভাব না পড়ে।”

নীতি নির্ধারকরা মনে করছেন, নতুন সরকারের জন্য প্রথম বাজেট রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল। অতীতে কর বৃদ্ধির কারণে নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে মধ্যবিত্তের ওপর চাপ তৈরি হওয়ার অভিজ্ঞতা আছে। এবার সেই ভুল এড়াতে জনমতকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

নিত্যপণ্যে কর বাড়ানোর প্রস্তাবে না 
রাজস্ব আদায় বাড়াতে এনবিআর ধান, চাল, গম, আলু, পেঁয়াজ, ডাল, চিনি, ভোজ্যতেল, মসলা ও ফলসহ নিত্যপণ্যের স্থানীয় সরবরাহে উৎসে কর দ্বিগুণ করার প্রস্তাব দিয়েছিল। বর্তমানে স্থানীয় ঋণপত্র কমিশনের ওপর উৎসে কর ০.৫০ শতাংশ, যা ১ শতাংশ করার সুপারিশ করা হয়।

কিন্তু প্রধানমন্ত্রী আশঙ্কা প্রকাশ করেন, এতে মূল্যস্ফীতি আরো উসকে উঠতে পারে। ফলে বিষয়টি আরো পর্যালোচনার নির্দেশ দেন তিনি। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, শীর্ষ পর্যায়ের অনীহার কারণে নিত্যপণ্যে কর বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত আপাতত স্থগিত থাকছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, খাদ্য মূল্যস্ফীতির চাপে সাধারণ মানুষ এমনিতেই নাজেহাল। এ অবস্থায় নিত্যপণ্যে অতিরিক্ত কর বাজারে আগুন লাগিয়ে দিত।

মধ্যবিত্তের জন্য স্বস্তি
স্বস্তির খবর হলো, ব্যক্তিশ্রেণির করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানোর নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়েছে। বর্তমানে ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করমুক্ত। নতুন বাজেটে সেটি ৪ লাখ টাকা করার অনুমোদন দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। এর ফলে মধ্যবিত্ত চাকরিজীবী ও ক্ষুদ্র আয়ের করদাতারা কিছুটা স্বস্তি পাবেন। অন্তর্বর্তী সরকার ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা পর্যন্ত করমুক্ত রাখার প্রস্তাব দিয়েছিল। নতুন সরকার সেটি আরো বাড়িয়ে দেয়।

মোটরসাইকেল-অটোরিকশায় কম হারে কর  
একদিকে সাধারণ মানুষের ওপর চাপ না দেওয়ার কথা বলা হলেও, রাজস্ব বাড়াতে নতুন কিছু খাতকে করের আওতায় আনা হচ্ছে। এর মধ্যে আছে মোটরসাইকেল ও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা।

প্রাথমিকভাবে এনবিআর ১-১২৫ সিসি মোটরসাইকেলের জন্য ২ হাজার, ১২৬-১৬৫ সিসির জন্য ৫ হাজার এবং ১৬৫ সিসির বেশি হলে ১০ হাজার টাকা অগ্রিম আয়কর প্রস্তাব করেছিল। প্রধানমন্ত্রী হার কমানোর নির্দেশ দেন। নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী, ১ হাজার, ৩ হাজার ও ৫ হাজার টাকা ধার্যের কথা ভাবা হচ্ছে।

ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাকেও করের আওতায় আনার পরিকল্পনা আছে। সিটি করপোরেশন এলাকায় ৫ হাজার, পৌরসভায় ২ হাজার এবং ইউনিয়ন পর্যায়ে ১ হাজার টাকা কর ধার্যের আলোচনা হয়েছে। এখানেও হার কমানোর নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।

বিশ্লেষকরা বলছেন, মোটরসাইকেল ও অটোরিকশা এখন নিম্ন-মধ্যবিত্তের প্রধান বাহন ও জীবিকার উৎস। তাই হার বেশি হলে জনঅসন্তোষ তৈরি হতে পারত।

ধনীদের জন্য সম্পদ কর
বাজেটের সবচেয়ে বড় কাঠামোগত পরিবর্তন হতে যাচ্ছে ‘ওয়েলথ ট্যাক্স’ বা সম্পদ কর চালুর মাধ্যমে। বর্তমানে ৪ কোটি টাকার বেশি সম্পদে সারচার্জ আরোপ করা হয়। নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী, সরাসরি সম্পদের নিট মূল্যের ওপর কর ধার্য হবে।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, ৪-১০ কোটি টাকার সম্পদে ০.৫০ শতাংশ, ১০-২০ কোটি টাকায় ১ শতাংশ, ২০-৫০ কোটি টাকায় ১.৫০ শতাংশ এবং ৫০ কোটির বেশি সম্পদে ২ শতাংশ কর আরোপের চিন্তা করা হচ্ছে।

সরকারের ধারণা, এর মাধ্যমে উচ্চবিত্তকে করের আওতায় এনে রাজস্ব বাড়ানো সম্ভব হবে, আর নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর চাপ কম রাখা যাবে।

বিনিয়োগবান্ধব করনীতি 
বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট করে বলেছেন, এমন করনীতি করতে হবে যাতে বিনিয়োগ বাড়ে, শিল্পায়ন ত্বরান্বিত হয় এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়। তিনি প্রযুক্তিনির্ভর ও দক্ষ শ্রমভিত্তিক শিল্পকে উৎসাহ দেওয়ার কথা বলেছেন।

কর্মকর্তারা জানান, প্রধানমন্ত্রী চান না কোনো কর ছাড় কেবল নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠান বা গোষ্ঠীর সুবিধায় ব্যবহৃত হোক। পুরো খাত যাতে উপকৃত হয়, সেভাবে নীতিমালা তৈরির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। রপ্তানি বাড়াতে খাতভিত্তিক বন্ড সুবিধা সম্প্রসারণ, দীর্ঘমেয়াদি নীতি গ্রহণ এবং বিনিয়োগ বাড়াতে আলাদা কমিটি গঠনের নির্দেশনাও দিয়েছেন তিনি।

আইএমএফের চাপ ও বাস্তবতা
আইএমএফ দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশকে কর-জিডিপি অনুপাত বাড়াতে চাপ দিয়ে আসছে। কর ছাড় কমানো, করের আওতা বৃদ্ধি, ভ্যাট বাড়ানোর সুপারিশ করেছে সংস্থাটি। কিন্তু নতুন সরকার রাজনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় সেই পথ পুরোপুরি অনুসরণ করছে না।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ক্ষমতায় ফেরার পর প্রথম বাজেটে জনগণের ওপর বাড়তি চাপ দিলে সরকারের জনপ্রিয়তায় ধাক্কা লাগবে। তাই সরকার এখন ‘রাজস্ব বৃদ্ধি’ আর ‘জনস্বস্তি’র মধ্যে ভারসাম্য খুঁজছে।

এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ বলেন, “কর বাড়ানোর আগে কর ফাঁকি রোধ, এনবিআরের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং কর ব্যবস্থার দুর্বলতা দূর করাই হওয়া উচিত সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার।”

অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা আব্দুল মজিদ বলেন, “সব মিলিয়ে এবারের বাজেট প্রস্তুতিতে সরকারের রাজনৈতিক বার্তা স্পষ্ট। গরিবের ওপর বোঝা নয়, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে জোর দিচ্ছে সরকার। তবে রাজস্ব ঘাটতি, উন্নয়ন ব্যয়, বৈদেশিক ঋণের চাপ এবং আইএমএফের শর্তের মধ্যে থেকে সরকার কতটা জনবান্ধব বাজেট দিতে পারে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। আগামী জুনে বাজেট পেশ হবে। তখনই বোঝা যাবে, রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি আর অর্থনৈতিক বাস্তবতার মধ্যে কতটা সমন্বয় করতে পেরেছে নতুন সরকার।”

ঢাকা/এএএম/এসবি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়