দায়িত্ববোধের সেঞ্চুরিতে দেদীপ্যমান লিটন
ক্রীড়া প্রতিবেদক, সিলেট থেকে || রাইজিংবিডি.কম
শুরুর প্রশ্নটা বাউন্সারই ছিল।
লিটনের জবাবটাও ছিল যুৎসই। লিটন সংবাদ সম্মেলনে এসে বসা মাত্রই সংবাদ কর্মীর জানতে চাওয়া, ‘‘একটু আগে পাকিস্তানের পেসার খুররাম শাহজাদ বলে গেলেন আপনি ভাগ্যবান।’’
সেঞ্চুরি করে এই পেসারকে হতাশ করা লিটন বলতে একটু দ্বিধাও করলেন না, ‘‘ভাগ্যবান? ঠিকই আছে। ভাগ্যেরও দরকার আছে।’’ আরেক প্রশ্নের উত্তরে ছোট করে বললেন, ‘‘ক্রিকেটে আপনার ভাগ্য যেদিন পক্ষে থাকবে সেটা একটু কাজে লেগে যায়।’’
সিলেটে লিটন ভাগ্যবান ছিলেন বটেই। দ্যুতিময় ইনিংস খেলে ১২৬ রান করেছেন। তবে এই ইনিংস খেলার পথে ৫২ রানে উইকেটের পেছনে একবার ক্যাচ দিয়েছিলেন। খুররাম শাহজাদের শর্ট বল উড়াতে গিয়ে ব্যাট ছোঁয়াতে পারেননি। বল তার গ্লাভসে চুমু খেয়ে যায় উইকেটের পেছনে রিজওয়ানের হাতে। পাকিস্তান কোনো আবেদন না করায় লিটন ওই যাত্রায় বেঁচে যান। রিপ্লে দেখে পাকিস্তানের মাথায় হাত!
ওই সুযোগে লিটন তুলে নেন ক্যারিয়ারের ষষ্ঠ টেস্ট সেঞ্চুরি, পাকিস্তানের বিপক্ষে তৃতীয়। দুই বছর আগে রাওয়ালপিণ্ডিতে পাকিস্তানের বিপক্ষে পাওয়া সেঞ্চুরি ও আজকের সেঞ্চুরির অনেক মিল। আগে ব্যাটিংয়ে নেমে ২৬ রান তুলতে ৬ উইকেট হারায় বাংলাদেশ। সেখান থেকে লিটন ও মিরাজ ১৬৫ রানের জুটি গড়েন। প্রায় শেষ পর্যন্ত টিকে থেকে লিটন ওই ইনিংসে একাই করেন ১৩৮ রান।
ঠিক এমন আরেকটি ইনিংসও খেলেছেন ঘরের মাঠে। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে যখন ব্যাটিংয়ে নামেন তখন দলের স্কোর ৫ উইকেটে ২৪। মুশফিকুর নিয়ে তার জুটি ২৭২ রানের। ক্যারিয়ার সেরা ১৪১ রানের ইনিংস খেলেন ওই ম্যাচেই। আজ মিরাজ যখন ষষ্ঠ ব্যাটসম্যান হিসেবে আউট হন তখন দলের স্কোর ১১৬। লিটন ক্রিজে অপরাজিত ২ রানে। সেখান থেকে তাইজুল, তাসকিন ও শরিফুলের সঙ্গে লড়াই করে লিটন নিজেকে নিয়ে যান সেঞ্চুরির স্বর্গে।
তবে সেঞ্চুরির মধ্যে লিটন পার্থক্য খুঁজে পান, ‘‘অনেকটাই (রাওয়ালপিণ্ডির কথা মনে পড়েছে) । তবে দুটি পরিস্থিতিই ভিন্ন ছিল। আমার কাছে মনে হয়, শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে যে ইনিংসটা খেলেছিলাম, সেটার পরিস্থিতি ছিল একদম আলাদা। কারণ তখন মুশফিকুর রহিম ভাইয়ের সঙ্গে বড় একটা পার্টনারশিপ ছিল। যখন একজন স্বীকৃত ব্যাটসম্যান আপনার সঙ্গী থাকে, তখন মানসিকতাটাও পরিষ্কার থাকে। রাওয়ালপিণ্ডিতেও একই রকম ছিল, কারণ মেহেদী হাসান মিরাজ ছিল। ও একজন ব্যাটসম্যান, তাই ইনিংসটা এগিয়ে নেওয়া সহজ ছিল। আমার মনে আছে, প্রায় ৮০ রান পর্যন্ত ইনিংসটা খুব স্বাভাবিকভাবেই এগিয়েছে, শেষ ২০ রান আমাকে একটু কষ্ট করে করতে হয়েছে।’’
‘‘কিন্তু আজকের ইনিংসটা পুরোপুরি আলাদা। আমার মনে হয়, আমি তখন দুই-তিন রানে ছিলাম, যখন তাইজুল ভাই স্ট্রাইকে আসে। সেঞ্চুরি তো চাইলেই করা যায় না, আর এটা নিয়ে আমি খুব বেশি ভাবিও না যে সেঞ্চুরি করতেই হবে। আমার মূল লক্ষ্য ছিল- কীভাবে দলের জন্য রান বোর্ডে তোলা যায়।’’
‘‘যখন তাইজুল ভাই ব্যাটিংয়ে আসে, তখন আমাদের স্কোর ছিল প্রায় ১১০-এর মতো (আসলে ১১৬) । তখন আমার লক্ষ্য ছিল, যেকোনোভাবে দলকে ২০০ রানের কাছাকাছি নিয়ে যাওয়া। স্বাভাবিকভাবেই সেই দায়িত্বটা আমাকে নিতে হয়েছে, কারণ আমাদের টেইলএন্ডারদের কাছ থেকে খুব বেশি রান আশা করা যায় না। রানটা মূলত আমাকেই করতে হবে। আমি একবার ড্রেসিংরুমে বার্তা পাঠিয়েছিলাম, আমরা কি একটু আক্রমণাত্মকভাবে খেলব কিনা। ওপর থেকে শুধু বলা হয়েছিল, রানের জন্য খেলতে। এরপর আমি সেটাই করার চেষ্টা করেছি।’’
আজকের লড়াইয়ে ব্যাটসম্যান হিসেবে নিঃসঙ্গ শেরপা লিটন। বাকিরা হচ্ছেন তাইজুল, তাসকিন ও শরিফুল। যারা লিটনকে শুধু সাহসই দেননি বরং উইকেট আগলে রেখে দিয়েছেন যুদ্ধের প্রেরণা, লড়াইয়ের জেদ। তাইজুলের সঙ্গে সপ্তম উইকেটে লিটনের জুটি ৬০ রানের। দুজন মিলে বল খেলেছেন ১১৪টি। অষ্টম উইকেটে তাসকিন ও লিটন ৪২ বলে যোগ করেন ৩৮ রান। নবম উইকেটে শরিফুল ও লিটনের শেষ জুটি ৬৪ রানের। যা হয়েছে ৭৩ বলে। আশ্চর্যজনক হলেও সত্য, বাংলাদেশের ইনিংসের সবচেয়ে বড় জুটিটাই এসেছে নবম উইকেটে।
লোয়ার অর্ডার ব্যাটসম্যানদের সঙ্গে ব্যাটিং করার রসায়ন জানাতে গিয়ে লিটন বলেছেন, ‘‘টেস্ট ক্রিকেটে আমার ভূমিকা একটু ভিন্ন। অনেক সময় আমাকে মুশফিকুর রহিম ভাই ও মেহেদী হাসান মিরাজের সঙ্গে ব্যাটিং করতে হয়। তখন মানসিকতাটাও পুরো আলাদা থাকে। কারণ আপনি জানেন, স্ট্রাইক রোটেট করলে তারা সহজেই সামলে নিতে পারবে। কিন্তু আমাদের টেইলএন্ডাররা এখনও ওইভাবে শক্তিশালী নয় যে আমি প্রতি ওভারে চার-পাঁচ বল তাদের জন্য রেখে দেব। অবশ্য ভবিষ্যতে যদি আমাদের টেল আরও ভালো ব্যাটিং করে, তাহলে সুযোগ থাকবে প্রথম বলেই সিঙ্গেল নিয়ে তাদেরও খেলতে দেওয়ার। কাজটা কঠিন, কিন্তু এই ইনিংসে আমার কাছে সেঞ্চুরির চেয়েও বড় ব্যাপার ছিল- আমাদের টেইলে যারা ব্যাটিং করেছে, যেমন তাইজুল ভাই, তাসকিন আহমেদ ও শরিফুল ইসলাম-ওরা অনেকগুলো বল খেলেছে। আর টেস্ট ক্রিকেটে এটা একটা বড় ব্যাপার।স্বাভাবিকভাবেই ওদের প্রধান কাজ রান করা না। রান করার দায়িত্বটা একজন ব্যাটসম্যান হিসেবে আমারই। কিন্তু ওরা যখন উইকেটে টিকে থাকে, তখন আমার জন্য ব্যাটিংটা অনেক সহজ হয়ে যায়।’’
সিলেট/ইয়াসিন/আমিনুল
বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) পরিচালনা পর্ষদ নির্বাচন ৭ জুন