সত্যজিৎ রায়ের পৈতৃক ভিটায় চলছে ২০০ বছরের মেলা
রুমন চক্রবর্তী, কিশোরগঞ্জ: || রাইজিংবিডি.কম
সত্যজিৎ রায়ের পৈত্রিক ভিটায় বসেছে ঐতিহ্যবাহী মেলা।
বিশ্বনন্দিত চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায়ের পৈতৃক ভিটা কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলার মসূয়া গ্রামে চলছে প্রায় ২০০ বছরের পুরানো বৈশাখী মেলা। বৈশাখ মাসের শেষ বুধবার (১৩ মে) আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হওয়া এ মেলা চলবে মঙ্গলবার (১৯ মে) পর্যন্ত। সাতদিনের এই মেলা ঘিরে গোটা এলাকায় তৈরি হয়েছে উৎসবের আবহ।
সরেজমিনে দেখা যায়, মসূয়া গ্রামের রায় বাড়ির মাঠজুড়ে সারি সারি দোকান। দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে ব্যবসায়ীরা এখানে দোকান সাজিয়েছেন। মাটির পুতুল, খেলনা, হাড়ি-পাতিল, কাঠের তৈজসপত্র, কসমেটিকসসহ নানা পণ্যে জমে উঠেছে মেলা। শিশুদের জন্য নাগরদোলা ও চরকির আয়োজনও এবার বেশি। জায়গা সংকটের কারণে অনেকে আশপাশের জমিতেও দোকান বসিয়েছেন।
ছেলে-মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে মেলায় আসা নাজমা আক্তার বলেন, “শৈবের মেলার গন্ধটা এখনো একই রকম আছে। শুধু মানুষের ভিড় আর আনন্দ বেড়েছে। বেড়ানোর পাশাপাশি সন্তানদের ইতিহাসের খানিকটা পাঠ হয়ে যাচ্ছে। এসব দেখে তারাও বেশ আনন্দ পাচ্ছ। এটা ওটা নিয়ে নানা প্রশ্ন তাদের। যতটুকু জানি, তাদের কৌতুহল মেটানোর চেষ্টা করছি। দীর্ঘদিন পর আসতে পেরে আমারও ভালো লাগছে।”
কটিয়াদী উপজেলা সদরের বাসিন্দা রাহাত। বই পড়তে ও বাংলার ঐতিহ্যকে খুব পছন্দ করেন। তিনি বলেন, “আগে শুধু মেলা দেখতে আসতাম। এখন রায় বাড়িটাও ঘুরে দেখি। প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের সংস্কারের পর জায়গাটা অনেক সুন্দর হয়েছে। তাছাড়া এই স্থানটি আমাদের জেলার গর্ব। এ মেলা শুধু কেনাবেচার জায়গা না, এটা আমাদের
এলাকার ইতিহাস আর সংস্কৃতির অংশ।”
তিনি বলেন, “এখানে সত্যজিৎ রায়ের পরিবারের ইতিহাস আরো ভালোভাবে ফুটিয়ে তোলা উচিত। পাশাপাশি এখানে একটি পাঠাগার স্থাপন করলে সত্যজিৎ রায়ের পরিবার ও তাদের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে জানতে পারলে নতুন প্রজন্মের জন্য ভালো হবে।”
জানা যায়, জমিদার হরি কিশোর রায় চৌধুরীর সময় থেকে কাল ভৈরবী পূজা উপলক্ষে এ মেলার প্রচলন হয়। এই বাড়িতেই ১৮৬০ সালে জন্মগ্রহণ করেন প্রখ্যাত শিশু সাহিত্যিক উপেন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরী। ১৮৮৭ সালে জন্ম নেন তাঁর ছেলে, খ্যাতিমান ছড়াকার সুকুমার রায়। দেশ বিভাগের আগে তাদের পরিবার কলকাতায় চলে যান। সত্যজিৎ রায় সুকুমার রায়ের ছেলে। সম্প্রতি বাড়ির ধ্বংসপ্রাপ্ত স্থাপনা ও পুকুরঘাট সংস্কার করে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ। এতে রায় বাড়ির সৌন্দর্য অনেক বেড়েছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষজন বাড়িটিকে একনজর দেখতে এখানে ছুটে আসেন। তবে স্থানীয়দের আশা, ভবিষ্যতে এটি বড় পর্যটন কেন্দ্র হিসেবেও পরিচিতি পাবে।
মেলা আয়োজক কমিটির সদস্য আব্দুল কুদ্দুস রতন জানান, মেলার দিনগুলোতে দূর-দূরান্ত থেকে হাজারো মানুষ আসেন। তারা কেনাকাটা করেন। পাশাপাশি এ সময়টা সংস্কৃতিকর্মীদেরও মিলনমেলায় পরিণত হয়। কবিরা বসেন কবিতা পাঠের আসর নিয়ে। হয় সাহিত্য আড্ডাও। সব মিলিয়ে এ মেলা হয়ে উঠেছে কটিয়াদীর ইতিহাস ও ঐতিহ্যের একটি বিরাট অংশ।
কটিয়াদী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শামীমা আফরোজ মারলিজ বলেন, “মেলা সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য সব ধরনের প্রস্তুতি রাখা হয়েছ। দর্শনার্থীদের নিরাপত্তায় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নিয়মিত কাজ করছে। দেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্য রক্ষায় আমরা সবসময় সচেষ্ট রয়েছি।"
ঢাকা/মাসুদ