পীর হত্যা
বড় ভাই জেলে, স্কুলছাত্র ছোট ভাইয়ের আত্মহত্যা
কুষ্টিয়া প্রতিনিধি || রাইজিংবিডি.কম
আব্দুল্লাহ প্রামাণিক লাম।
কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে আব্দুল্লাহ প্রামাণিক লাম নামে এক স্কুলছাত্র আত্মহত্যা করেছেন। কোরআন অবমাননার অভিযোগে কথিত পীর আবদুর রহমান শামীম (৬৫) হত্যাকাণ্ডের মামলায় গ্রেপ্তার আতঙ্কে সে এমন কাণ্ড ঘটিয়ে থাকতে পারে বলে মনে করছে পরিবার।
মারা যাওয়া শিক্ষার্থী আব্দুল্লাহ দৌলতপুর উপজেলার ফিলিপনগর ইউনিয়নের রবিউল ইসলামের ছেলে। সে স্থানীয় একটি স্কুলের শিক্ষার্থী ছিল।
গত শনিবার (১৬ মে) দুপুরে ঢাকার আশুলিয়া থানা এলাকার খালার ভাড়া বাসায় গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করে আব্দুল্লাহ। রবিবার (১৭ মে) ময়নাতদন্ত শেষে রাত ১১টার দিকে ফিলিপনগরে পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত ১১ এপ্রিল উপজেলার ফিলিপনগরে পীর শামীমের আস্তানায় হামলা চালান বিক্ষুব্ধ লোকজন। সেখানে ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের পর তাকে পিটিয়ে ও কুপিয়ে হত্যা করা হয়। ওই ঘটনায় হওয়া মামলায় এখন পর্যন্ত চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। আব্দুল্লাহর বড় ভাই আলিফ ইসলাম (২৩) এই মামলায় গ্রেপ্তার হন।
পরিবারের সদস্যরা জানান, ঘটনার দিন আব্দুল্লাহ ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিল। গ্রেপ্তার এড়াতে তাকে ঢাকার আশুলিয়ায় খালার বাসায় পাঠানো হয়। শনিবার দুপুরে খালার ভাড়া বাসায় গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করে সে।
মারা যাওয়া আব্দুল্লাহর বাবা রবিউল ইসলাম বলেন, “আমার ছেলে আলিফ পীর হত্যার ঘটনায় জড়িত না, তবুও ভিডিও ফুটেজের কথা বলে তাকে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে। আব্দুল্লাহ ছোট মানুষ, ঘটনার দিন সবার সঙ্গে দেখতে গিয়েছিল। ভাই গ্রেপ্তার হওয়ার পর থেকেই সে মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে। ভয় ও দুশ্চিন্তা থেকেই হয়তো আত্মহত্যা করেছে।”
তিনি বলেন, “আমি তো এক ছেলে হারিয়েছি। আরেক ছেলেকে যদি প্রশাসন নির্দোষ বিবেচনায় ছেড়ে দিত, তাহলে কৃতজ্ঞ থাকতাম।”
রবিউল ইসলাম অভিযোগ করেন, জন্মনিবন্ধন অনুযায়ী আলিফের বয়স ১৮ বছর হলেও তাঁকে ২৩ বছর দেখানো হয়েছে। আলিফ বাজারে সবজি বিক্রি করতো।
এদিকে মামলায় গ্রেপ্তার চার আসামির মধ্যে এজাহারভুক্ত আসামি রাজীব মিস্ত্রিকে দুই দিনের এবং বিপ্লব হোসেন (২৬) ও আলিফ ইসলামকে একদিন করে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে পুলিশ। তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, রিমান্ডে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তাদের ভাষ্য, হামলার মূল উদ্দেশ্য ছিল ফিলিপনগর এলাকায় শামীমের আস্তানা উচ্ছেদ ও তার কার্যক্রম বন্ধ করা। হামলায় অংশ নেওয়া একটি পক্ষ শুধু ভাঙচুর ও উচ্ছেদে জড়িত থাকলেও, আরেকটি পক্ষ সরাসরি হত্যাকাণ্ডে অংশ নেয়। পুলিশের দাবি, ঘটনার অন্তত এক সপ্তাহ আগে থেকেই হামলার পরিকল্পনা করা হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি পুরোনো ভিডিওর অংশ ছড়িয়ে জনসাধারণকে উসকে দেওয়া হয়েছিল। এরপর উত্তেজিত জনতা শামীমের আস্তানায় হামলা চালায়। এ সময় তাকে পিটিয়ে ও কুপিয়ে হত্যা করা হয়। পাশাপাশি চলে লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ।
তদন্তের স্বার্থে অনেক তথ্য গোপন রাখা হলেও হামলায় নের্তৃত্বদানকারী ও জড়িত অন্তত ৩৫ জনের তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। তাদের গ্রেপ্তার করা গেলে ঘটনার নেপথ্যের কারণ আরো স্পষ্ট হবে বলে মনে করছেন তদন্ত সংশ্লিষ্টরা।
ভেড়ামারা সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার দেলোয়ার হোসেন বলেন, “আলিফের ছোট ভাই আব্দুল্লাহর আত্মহত্যার বিষয়টি শুনেছি। কেউ ভয় থেকে আত্মহত্যা করলে সেখানে পুলিশের কিছু করার থাকে না। তবে, হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনায় তার সংশ্লিষ্টতা ছিল। ভিডিও ফুটেজ দেখে আলিফকেও শনাক্ত করা হয়েছে। ঘটনার সঙ্গে জড়িত অন্যদেরও দ্রুত আইনের আওতায় আনা হবে।”
গত ১৩ এপ্রিল নিহত শামীমের বড় ভাই অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক ফজলুর রহমান বাদী হয়ে দৌলতপুর থানা হত্যা মামলা করেন। মামলায় জেলা ছাত্র শিবিরের সাবেক সভাপতি খাজা আহম্মেদ ও খেলাফত মজলিসের উপজেলা সভাপতি আসাদুজ্জামানসহ চারজনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতনামা আরো ১৮০ থেকে ২০০ জনকে আসামি করা হয়।
ঢাকা/কাঞ্চন/মাসুদ