১৮ কোটি টাকার হাসপাতাল অকেজো, চত্বরে হচ্ছে সবজি চাষ
রফিক সরকার, গাজীপুর (পূর্ব) || রাইজিংবিডি.কম
গাজীপুরের কালীগঞ্জ উপজেলার নাগরী ইউনিয়নের তালিয়া গ্রামে নির্মিত হাসপাতালটি পরিত্যাক্ত অবস্থায় রয়েছে।
আধুনিক এক স্বাস্থ্যকেন্দ্র- ঝকঝকে ভবন, সাজানো কক্ষ, ভেতরে এসি-টিভি পর্যন্ত প্রস্তুত। তবে, দরজায় তালা, করিডোরে নীরবতা, আর চারপাশে ঝোপঝাড়। মানুষের চিকিৎসার জন্য নির্মিত এই হাসপাতাল আজ যেন জীবনের নয়, নিস্তব্ধতার প্রতীক। কোটি টাকার অবকাঠামো দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু চিকিৎসাসেবা নেই। এই বৈপরীত্যই এখন তালিয়া গ্রামের বাস্তবতা।
রাজধানী ঢাকার উত্তর সিটি করপোরেশন ও পূর্বাচল নতুন শহর লাগোয়া গাজীপুরের কালীগঞ্জ উপজেলার নাগরী ইউনিয়নের তালিয়া গ্রামে নির্মিত হয়েছে ২০ শয্যাবিশিষ্ট একটি হাসপাতাল। প্রায় ১৮ কোটি টাকা ব্যয়ে ২.০৭৩ একর জমিতে নির্মিত এই স্বাস্থ্য সেবাকেন্দ্রটি কয়েক বছর ধরে অচল অবস্থায় রয়েছে। এখানে রয়েছে একটি মূল ভবন, তিনটি কোয়ার্টার, একটি জেনারটর রুম, একটি গ্যারেজ ও পাম্প হাউজ।
সরেজমিনে দেখা গেছে, হাসপাতাল ভবনটি নির্মাণ শেষ হলেও সেখানে নেই কোনো চিকিৎসাসেবা। চেয়ার-টেবিল, এসি, এলইডি টেলিভিশনসহ প্রয়োজনীয় অফিস সরঞ্জাম থাকলেও চিকিৎসক, কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং ওষুধের অভাবে পুরো প্রতিষ্ঠানটি কার্যত অকেজো। হাসপাতালের খোলা জায়গা দখল করে স্থানীয়রা গড়ে তুলেছেন ছোটখাটো কৃষিখামার। বিভিন্ন ধরনের সবজি চাষ করে তারা নিজেদের পারিবারিক চাহিদা মেটাচ্ছেন।
স্বাস্থ্য বিভাগের সূত্র জানায়, ২০১৯ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি হাসপাতালটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। ২০২০ সালের ২৭ ডিসেম্বর নির্মাণ শেষ হয়। পরবর্তীতে ২০২১ সালের ২০ জুন এটি আনুষ্ঠানিকভাবে গাজীপুর সিভিল সার্জন কার্যালয়ে হস্তান্তর করা হয়। ২০২৩ সালের ২৬ অক্টোবর হাসপাতালটির সেবা কার্যক্রম চালুর প্রশাসনিক অনুমোদন দেওয়া হয়। একই বছরের ডিসেম্বরে প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগের জন্য উদ্যোগ নেওয়া হয়। প্রথমে ২৫টি পদ সৃষ্টির প্রস্তাব থাকলেও ২০২৪ সালের মার্চে অর্থ মন্ত্রণালয় ১৬টি পদ অনুমোদন দেয়। পরবর্তীতে অক্টোবর মাসে ওই ১৬টি পদ আনুষ্ঠানিকভাবে সৃষ্টি করা হয়।
কাগজে-কলমে পদ সৃষ্টি হলেও বাস্তবে পরিস্থিতি ভিন্ন। একজন আবাসিক মেডিকেল অফিসার, একজন ফার্মাসিস্ট ও দুইজন নার্স পদায়ন করা হলেও বর্তমানে তাদের অধিকাংশ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অধীনে কর্মরত। বাকি একজনের ব্যাপারে কোনো তথ্য মেলেনি। ১২টি পদ এখনো শূন্য।
হাসপাতালের সামনে জন্মেছে ঝোপঝাড়
সবচেয়ে বড় জটিলতা তৈরি হয়েছে অর্থনৈতিক কোড না থাকায়। এই কোড না থাকায় হাসপাতালের জন্য কোনো বাজেট বরাদ্দ হয়নি। ফলে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, ওষুধ ক্রয় কিংবা প্রশাসনিক ব্যয় নির্বাহ-কোনোটিই সম্ভব হচ্ছে না।
স্থানীয় বাসিন্দা হারুন-আর-রশিদ বলেন, “প্রতিবারই শুনি হাসপাতাল চালু হবে। বছর পার হয়ে যায়, কোনো পরিবর্তন দেখি না। হাসপাতালটি চালু হলে আমাদের অনেক উপকার হতো। এটি এখন সাপ-শিয়ালের আবাসস্থলে পরিণত হয়েছে।”
স্থানীয় চিকিৎসক ডা. মো. ওমর কায়ছার বলেন, “সরকার বিপুল অর্থ ব্যয় করে হাসপাতাল নির্মাণ করেছে, কিন্তু সেটি চালু না হওয়া অত্যন্ত হতাশাজনক। দ্রুত চালু করা জরুরি।”
তালিয়া গ্রামের শিউলি বেগমের ভাষায়, “অসুস্থ হলে অনেক দূরে যেতে হয়। বিশেষ করে প্রসূতি রোগীদের নিয়ে ঢাকায় যেতে খুব কষ্ট হয়। এই হাসপাতাল চালু হলে আমাদের দুর্ভোগ কমতো।”
কালীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. রেজওয়ানা রশীদ বলেন, “এখানে দুইজন চিকিৎসক পদায়ন রয়েছে। অর্থনৈতিক কোড না থাকায় কার্যক্রম শুরু করা যাচ্ছে না। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।”
গাজীপুরের সিভিল সার্জন ডা. মো. মামুনুর রহমান বলেন, “ওষুধ, জনবল ও বাজেট-সবকিছুতেই ঘাটতি আছে। ধীরে ধীরে সমস্যার সমাধান হচ্ছে। আশা করছি, দ্রুতই হাসপাতালটি চালু করা যাবে।”
ঢাকা/মাসুদ