আমার নিঃশব্দ নিরাময়ের মাপনযন্ত্র
মো. ফাহাদ হোসেন ফাহিম || রাইজিংবিডি.কম
আমার মায়ের হাসির রং ঘাসফড়িঙের ডানার মতো কোমল নীল। সূর্যের আলো পড়লে সেই নীল কুমকুমের আভায় ঝরে পড়ে, দূর করে দেয় আমার সমস্ত অবসাদ। শৈশবের ছিঁচকাঁদুনে এই আমিকে মা একটু বেশিই ভালোবাসতেন। ভাত খাইয়ে দিতে দিতে তিনি আমাকে সমুদ্রের নীল সীমানা পেরিয়ে ঘুরিয়ে আনতেন নারকেলকুঞ্জের দেশে। তবুও যখন বায়না ধরতাম—আরব্য রজনীর গল্প না শুনে ভাত মুখে তুলব না, তখনও মায়ের সেই কোমল নীল থেকে কখনো কালো হয়ে উঠত না।
সেই ভোদড়, সারস, নীল শিয়াল, টুনটুনি কিংবা টিয়া পাখির গল্প আজও জেগে ওঠে আমার কল্পনাকুঞ্জে। মায়ের হাতের সেই স্বাদ, মায়ের আঁচলের সেই ঘ্রাণ যেন আমার অমৃত। খুব ছোটবেলায় আমি নাকি ঘাসফড়িং আর মধুকরের মধ্যে পার্থক্য করতে পারতাম না। একদিন আমাকে মৌমাছির হুল থেকে বাঁচাতে গিয়ে মায়ের ঠোঁট ফুলে গিয়েছিল। আমি জিজ্ঞেস করতেই মা হেসে বলেছিলেন, “খাওয়ার সময় মাছের কাঁটা বিঁধেছে।”
এটাই আমার মা—নিজের সমস্ত ব্যথা লুকিয়ে রাখা এক নিঃশব্দ নিরাময়ের মাপনযন্ত্র।
অসংখ্য নক্ষত্রভরা রাতে মা আমাকে এক সাদা ঘোড়ার গল্প শোনাতেন। সেই গল্প আমি আর কোথাও শুনিনি—না কোনো বইয়ের পাতায়, না ম্যাগাজিনের দীর্ঘ কলামে, না কোনো ধর্মগ্রন্থে। মা বলতেন, হেমন্তের সন্ধ্যায় জাফরান-রঙের এক ঘোড়া মায়েদের গর্ভে সন্তান রেখে চলে যায়। আর সেই ঘোড়া ক্ষেপে গেলে নিয়ে যায় মায়েদেরও।
আমার জন্মের সময় মা নাকি সেই ঘোড়াকে দেখেছিলেন। ঘোড়ার কাছ থেকে আমাকে ছিনিয়ে এনেছিলেন নিজের বুকের ভেতর লুকিয়ে। জন্মের প্রায় কুড়ি মিনিট পর নাকি আমার প্রথম কান্নার শব্দ শোনা গিয়েছিল। কতবার নিজের হৃদয়ের গভীরে ডাহুকের মতো নিমগ্ন হয়ে শুনেছি সেই গল্প, আর খুঁজেছি সেই জাফরান-রঙের ঘোড়াকে। কোথায় আছে সে? কোন আকাশের ওপারে ছুটে বেড়ায়?
মেঠো চাঁদের দিকে তাকিয়ে মা বলতেন, “তুই-ই আমার সবচেয়ে মিষ্টি চাঁদ।”
এক জ্যোৎস্নারাতে কাঁচের পুরোনো বৈয়ামে অনেকগুলো জোনাকিপোকা বন্দি করেছিলাম। আমি তাদের বলতাম ‘জুনি পোকা’। জুনি পোকার মৃদু আলোয় রাতের খাবার খেতে খেতে মা একদিন বলেছিলেন, “পাখিদেরও মন আছে, পোকাদেরও প্রাণ আছে।”
সেদিন প্রথম বুঝেছিলাম—প্রকৃতিও অনুভব করতে জানে। তারপর থেকে কোনো উপকারী পোকা বা প্রাণীকে আর আঘাত করার সাহস পাইনি। পরে দ্বিজেন শর্মা-র ‘গহন কোন বনের ধারে’ কিংবা ইনাম আল হক-এর ‘পাখিদেরও আছে নাকি মন’ পড়ে উপলব্ধি করেছি, প্রকৃতি ও জীবনের প্রতি আমার এই মমতা আসলে মায়ের কাছ থেকেই পাওয়া। তার প্রজ্ঞা নিঃশব্দে সংক্রমিত হয়েছে আমার হৃদয়ে।
মাকে প্রায়ই দেখতাম বৃষ্টির রূপালি জল যত্ন করে জমিয়ে রাখতে। সেই পানি দিয়ে রান্না হতো, ফুটিয়ে খাওয়ার জল হতো, চলত গৃহস্থালির কত কাজ। বাড়িতে মিষ্টি পানির টিউবওয়েল ছিল না বলে কত দূর পথ হেঁটে কলসি কাঁখে পানি বয়ে আনতেন মা।
ছোটবেলায় আমার এক বদঅভ্যাস ছিল—ঘুম থেকে উঠে মাকে কাছে না পেলে কান্নায় আকাশ-বাতাস এক করে ফেলতাম। একদিন মা পানি আনতে গিয়েছিলেন। তাকে না পেয়ে এমন কান্না জুড়ে দিলাম যে বাড়ি যেন রোদসী আর ক্রন্দসীতে ভেসে গেল। পরে শাস্তি হিসেবে টানা এক সপ্তাহ মা এক কাঁখে আমাকে, আরেক কাঁখে পানিভর্তি কলসি নিয়ে বাড়ি ফিরেছেন।
জলের আরেক নাম যেমন জীবন, তেমনি মায়েদের আরেক নামও জীবন—নিঃশব্দ নিরাময়ের জীবনযন্ত্র।
কার্তিক-অঘ্রাণের গভীর রাত্রিগুলোতে আজও হঠাৎ মায়ের মুখ মনে পড়ে। স্ক্রিনের কৃত্রিম আলো মনের শূন্যতা ভরাতে পারে না, জাগাতে পারে না সেই পবিত্র নীল। অথচ আমার সমগ্র আকাশজুড়ে আজও বিস্তৃত সেই নীল, আর তার নীলিমার ভেতর চিরঅম্লান হয়ে আছেন আমার মা। মালয় সাগরের গভীর নীলের মতোই তিনি জেগে আছেন আমার সমস্ত অনুভবে।
প্রতিটি নীলের পালক ছুঁয়ে আমি আজও শুনতে পাই মায়ের নিঃশ্বাসের শব্দ। পৃথিবী যখনই ঝিমিয়ে পড়েছে, তখনই আমাকে জাগিয়ে রেখেছে আমার মায়ের সেই নীল—এক অনন্ত, নিঃশব্দ নিরাময়ের মাপনযন্ত্র।
লেখক: স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থী, ডিপার্টমেন্ট অব এনিমেল সাইন্স
ফ্যাকাল্টি অব অ্যানিমেল হাসবেন্ড্রি
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ-২২০২
ঢাকা/রীতা/লিপি
নারায়ণগঞ্জে বিস্ফোরণে একই পরিবারের ৫ জন দগ্ধ