ঢাকা     রোববার   ১০ মে ২০২৬ ||  বৈশাখ ২৭ ১৪৩৩ || ২২ জিলকদ ১৪৪৭ হিজরি

Risingbd Online Bangla News Portal

স্মৃতির মানসপটে মা

মোঃ আমিনুর রহমান || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১০:০২, ১০ মে ২০২৬   আপডেট: ১০:৩২, ১০ মে ২০২৬
স্মৃতির মানসপটে মা

ভোরের নিস্তব্ধতা ভেঙে হঠাৎ কান্নার শব্দে আমার ঘুম ভাঙে। আধোঘুম চোখে দেখি, বিছানার চারপাশে বাবা, ভাই-বোনেরা দাঁড়িয়ে অঝোরে কাঁদছেন। তখনও কিছুই বুঝে উঠতে পারিনি। পৃথিবীটা তখনো আমার কাছে এত জটিল হয়ে ওঠেনি। কিছুক্ষণ পর বড় ভাই আমাকে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরে কাঁপা গলায় বললেন, “মা আর নেই রে।” সেই একটি বাক্যেই যেন থেমে গিয়েছিল আমার ছোট্ট পৃথিবীটা।

আমার বয়স তখন মাত্র সাত বছর। পৃথিবীকে ভালো করে চিনে ওঠার আগেই আমি হারিয়ে ফেলেছিলাম আমার সবচেয়ে আপন মানুষটিকে। আজও এত বছর পর স্মৃতির ভেতর হঠাৎ মায়ের মুখ ভেসে উঠলে বুকের ভেতরটা হু হু করে ওঠে। মনে হয়, কোথাও একটা বিশাল শূন্যতা এখনো নীরবে রয়ে গেছে।

আরো পড়ুন:

আমার শৈশব খুব বৈচিত্র্যময় ছিল না। আমি ছিলাম চুপচাপ স্বভাবের, নিজের ভেতরেই ডুবে থাকা এক শিশু। মা-ই ছিলেন আমার একমাত্র আশ্রয়, সবচেয়ে কাছের মানুষ। দিনের ছোট-বড় সব গল্প, সব অভিমান, সব আনন্দ আমি শুধু তার সঙ্গেই ভাগ করে নিতাম। বাবাকে একটু ভয় পেতাম বলে মনের কথাগুলোও মায়ের মাধ্যমেই তাকে জানাতাম। সমবয়সীদের সঙ্গে খেলাধুলা করতাম ঠিকই, কিন্তু মায়ের জায়গাটা কখনো কাউকে দিতে পারিনি।

রাত নামলেই আমি মায়ের ছায়া হয়ে যেতাম। তার পিছু পিছু ঘুরতাম সারাক্ষণ। অন্ধকারকে ভীষণ ভয় পেতাম বলে মায়ের আঁচল আঁকড়ে ধরা ছিল আমার নিত্যদিনের অভ্যাস। ঘুমানোর সময়ও তাকে ছাড়া যেন কিছুই পূর্ণ হতো না। আমার ছোট্ট জগতের কেন্দ্রবিন্দুই ছিলেন মা।

মায়ের দীর্ঘদিনের শারীরিক সমস্যা ছিল—হাঁপানিসহ আরও নানা জটিলতা। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, তিনি কখনো নিজের কষ্টটুকু প্রকাশ করতেন না। সমস্ত যন্ত্রণা নিঃশব্দে বয়ে বেড়াতেন, যেন আমাদের কোনো কষ্ট না হয়। বাইরে থেকে বোঝার উপায়ই ছিল না, তিনি কতটা অসুস্থ।

সেটা ছিল ২০১১ সালের ফেব্রুয়ারি মাস। শহরের একটি বড় হাসপাতাল থেকে মাত্র দুদিন আগে তাকে বাড়িতে আনা হয়েছিল। বড় ভাই তখন কুমিল্লায় কর্মরত ছিলেন। সেদিন গভীর রাতে তিনি বাড়ি ফেরেন। আমি তখনও মায়ের পাশেই নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে ছিলাম।

হঠাৎ কান্নার শব্দে ঘুম ভেঙে যায়। উঠে দেখি, চারপাশে সবাই কাঁদছে। সেই কান্নার ভাষা আমি তখন পুরোপুরি বুঝিনি, কিন্তু হৃদয় বুঝে গিয়েছিল—আমার পৃথিবী বদলে গেছে। সেদিন আমি এতটাই কেঁদেছিলাম যে মনে হয়, এরপর থেকে আর ঠিকমতো কাঁদতে পারিনি। যেন কান্নার সমস্ত শক্তিই সেদিন নিঃশেষ হয়ে গিয়েছিল।

সেই দিন থেকেই শুরু হয় আমার এক অন্যরকম জীবন—মাকে ছাড়া, মায়ের শূন্যতায় ভরা এক দীর্ঘ নিঃসঙ্গ পথচলা। যাঁকে ঘিরে আমার সমস্ত অনুভব, সমস্ত নির্ভরতা ছিল, তাঁকে হারিয়ে একাকিত্ব আরও গভীরভাবে আমাকে আঁকড়ে ধরেছিল।

কীভাবে যে সেই মাতৃহীন পরিবেশে নিজেকে মানিয়ে নিয়েছি, আজও ভেবে পাই না। তখন আমি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণির ছাত্র। আর আজ আমি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থী। সময় অনেক দূর এগিয়ে গেছে, জীবনও বহু পথ পেরিয়েছে। তবুও একটি জায়গা আজও শূন্য রয়ে গেছে, যেখানে শুধুই মা ছিলেন।

আমি আজও কাউকে প্রকৃত বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করতে পারিনি। কারণ, আমার হৃদয়ের সেই জায়গাটা আমি শুধু মায়ের জন্যই রেখে দিয়েছি। জীবনের প্রতিটি ছোট-বড় ঘটনা, মনের না-বলা সব কথা আজও সবার আগে আমি মনে মনে মাকেই বলি।

হয়তো পৃথিবীর নিয়মে মানুষ একসময় সব হারানো মেনে নিতে শিখে যায়। কিন্তু মাকে হারানোর শূন্যতা কখনো পূরণ হয় না। কিছু মানুষ চলে গিয়েও থেকে যান—নিঃশব্দে, গভীরভাবে, প্রতিটি নিঃশ্বাসের ভেতর।
আমার মা ঠিক তেমনই একজন মানুষ।

লেখক: শিক্ষার্থী, বাংলা বিভাগ
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
শিক্ষাবর্ষ: ২০২৪–২৫

ঢাকা/রীতা/লিপি

সম্পর্কিত বিষয়:

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়