ঢাকা     বৃহস্পতিবার   ০৫ মার্চ ২০২৬ ||  ফাল্গুন ২০ ১৪৩২ || ১৬ রমজান ১৪৪৭ হিজরি

Risingbd Online Bangla News Portal

এফআরসিকে বিএসইসির চিঠি

মিথ্যা তথ্য উপস্থাপন, ফেঁসে যাচ্ছে গোল্ডেন হারভেস্টের নিরীক্ষক

নুরুজ্জামান তানিম || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৮:৫০, ৫ মার্চ ২০২৬   আপডেট: ১৮:৫৮, ৫ মার্চ ২০২৬
মিথ্যা তথ্য উপস্থাপন, ফেঁসে যাচ্ছে গোল্ডেন হারভেস্টের নিরীক্ষক

পুঁজিবাজারে খাদ্য ও আনুসঙ্গিক খাতে তালিকাভুক্ত কোম্পানি গোল্ডেন হারভেস্টের অ্যাগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের আর্থিক প্রতিবেদনে ভয়াবহ আর্থিক জালিয়াতি ও অনিয়মের চিত্র বেরিয়ে এসেছে। এ অনৈতিক কাজে সরাসরি সহযোগিতা করা ও দায়সারা নিরীক্ষা (অডিট) কার্যক্রম পরিচালনা করেছে নিরীক্ষিা প্রতিষ্ঠান (অডিট ফার্ম) ম্যাবস অ্যান্ড জে পার্টনার্স চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস।এমন পরিস্থিতিতে আর্থিক প্রতিবেদনে মিথ্যা তথ্য উপস্থান করা নিরীক্ষক প্রতিষ্ঠান ও অংশীদারদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিলকে (এফআরসি) অনুরোধ জানিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)।

সম্প্রতি বিএসইসির চিফ অ্যাকাউন্ট্যান্ট ডিভিশন থেকে এফআরসির চেয়ারম্যান বরাবর এ বিষয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

আরো পড়ুন:

সূত্র জানায়, ২০২০ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত নিরীক্ষিা প্রতিষ্ঠান কোম্পানির  আর্থিক প্রতিবেদনে বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রদান করেছে-যা কারখানা ও অফিসের নথিপত্র পরিদর্শনে প্রমাণ পেয়েছে কমিশন। ভুয়া ও বানোয়াট লেনদেনের মাধ্যমে কোম্পানির আর্থিক অবস্থাকে প্রকৃত অবস্থার চেয়ে শক্তিশালী দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে। এতে করে কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদন এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যাতে তা বিনিয়োগকারীদের কাছে ইতিবাচক ও আকর্ষণীয় মনে হয়। কিন্তু বাস্তবে এসব তথ্যের অনেকটাই ছিল বিভ্রান্তিকর, যা সাধারণ বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে প্রতারণার শামিল।

অনুসন্ধানে আরো দেখা গেছে, কোম্পানিটি তাদের আর্থিক প্রতিবেদনে সম্পদের যে চিত্র তুলে ধরেছে, তার সঙ্গে প্রকৃত অবস্থার বড় ধরনের অসঙ্গতি রয়েছে। বিনিয়োগকারীদের আস্থা ধরে রাখতে কোথাও সম্পদের মূল্য অতিরঞ্জিত করে দেখানো হয়েছে, আবার কোথাও অস্তিত্বহীন সম্পদকেও কাগজে-কলমে সক্রিয় হিসেবে উপস্থাপন করার অভিযোগ পাওয়া গেছে।

এদিকে, বিষয়টি নিরীক্ষণের দায়িত্বে থাকা অডিট ফার্মের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। গোল্ডেন হারভেস্টের ক্ষেত্রে নিরীক্ষক দল তাদের দায়িত্ব পালনে চরম অবহেলা করেছেন। ফলে কোম্পানির আর্থিক বিবরণীতে থাকা গুরুত্বপূর্ণ অসঙ্গতিগুলো যথাসময়ে চিহ্নিত হয়নি বা প্রকাশ পায়নি। এর পরিণতিতে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা কোম্পানির প্রকৃত আর্থিক অবস্থা সম্পর্কে বিভ্রান্ত হয়েছেন এবং অনেকেই অজান্তেই বড় ধরনের আর্থিক ঝুঁকির মুখে পড়েছেন।

কমিশনের মতে, এ ধরনের নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণীর বিশ্বাসযোগ্যতাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে না বরং পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারী ও অংশীজনদের আস্থাকেও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

বিগত সরকারের আমলে আইন বা বিধি-বিধান লঙ্ঘন করা কোম্পানি ও তাদের নিয়োগপ্রাপ্ত নিরীক্ষদের বিরুদ্ধে তেমন কোনো কঠোর ব্যবস্থাই নেওয়া হয়নি। তবে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর পুনর্গঠিত বিএসইসির চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদের নেতৃত্বাধীন নতুন কমিশন কোম্পানি ও নিরীক্ষদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিয়েছে।

চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন, তার নিয়ন্ত্রক ক্ষমতা প্রয়োগের অংশ হিসেবে, গোল্ডেন হারভেস্ট অ্যাগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের কারখানা ও দপ্তর প্রাঙ্গণ, হিসাবপত্র এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক নথির ওপর পরিদর্শন পরিচালনা করেছে। পরিদর্শন দল তাদের অনুসন্ধানে, গুরুতর অনিয়ম ও সম্ভাব্য আর্থিক বিকৃতির প্রমাণ পেয়েছে, যা কোম্পানির প্রকাশিত আর্থিক প্রতিবেদনগুলোর নির্ভরযোগ্যতার ওপর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।

এদিকে, চিঠিতে কোম্পানির অনুসন্ধান প্রসঙ্গে উল্লেখ করা হয়, সংশ্লিষ্ট ও অ-সংশ্লিষ্ট উভয়পক্ষের সঙ্গে মিথ্যা ও মনগড়া লেনদেন সম্পাদন, আর্থিক বিবরণীতে বিভ্রান্তিকর সম্পদ অবস্থান উপস্থাপন এবং স্বাধীন নিরীক্ষা নিশ্চয়তার দায়িত্বে নিয়োজিত থাকা সত্ত্বেও আইনগত নিরীক্ষকের এসব গুরুত্বপূর্ণ বিকৃতি তথ্য শনাক্ত এবং প্রতিবেদনে উল্লেখ করতে ব্যর্থ হয়েছে। এ ধরনের ঘাটতি কেবল নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণীর বিশ্বাসযোগ্যতাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে না, বরং পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারী ও অংশীজনদের আস্থাকেও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

চিঠিতে আরো উল্লেখ করা হয়, সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ রুলস, ২০২০-এর বিধি ১৪(৫) অনুযায়ী, গোল্ডেন হারভেস্ট অ্যাগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড সংক্রান্ত পরিদর্শন প্রতিবেদন সংযুক্ত করে প্রেরণ করা হলো। সেই সঙ্গে উক্ত রেফারেন্সের তারিখ থেকে ৬০ দিনের মধ্যে সংশ্লিষ্ট চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট ফার্ম এবং সংশ্লিষ্ট অংশীদারদের বিরুদ্ধে যথাযথ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে কমিশনকে অবহিত করার জন্য অনুরোধ করা যাচ্ছে।

উল্লিখিত বিষয়গুলোর গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে, কমিশন এফআরসিকে অনুরোধ করেছে যে, পরিদর্শন প্রতিবেদন এবং ২০২০, ২০২১ ও ২০২২ অর্থবছরের নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে যদি নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানের অবহেলা বা সংশ্লিষ্টতার জন্য দায়ী প্রমাণিত হয়, তবে প্রযোজ্য আইন ও মানদণ্ড অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট অডিট ফার্ম এবং তাদের অংশীদারদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন। এ বিষয়ে নেওয়া পদক্ষেপ সম্পর্কে কমিশনকে অবহিত করার বিষয়টি চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাউন্টিং বিভাগের অধ্যাপক আল-আমিন রাইজিংবিডি ডটকমকে বলেন, “নিরীক্ষকের প্রশ্নবিদ্ধ ভূমিকা সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়। ফলে কোম্পানিগুলোর নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদনের ওপর বিশ্বাসযোগ্যতা দিনদিন হারাচ্ছে। তাই নিরীক্ষিকের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হলে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। এ বিষয়ে এফআরসিকে আরো কঠোর হতে হবে।”

তিনি আরো বলেন, “এসব ক্ষেত্রে শুধু নিরীক্ষকের নয়, কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদের ওপর দায় বর্তায়। তাই কোম্পানির এ ধরনের অনৈতিক কর্মকাণ্ড প্রতিহত করতে স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগ দেওয়ার ক্ষেত্রে বিএসইসিকে আরো সতর্ক থাকতে হবে।”

এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিএসইসির একজন কর্মকর্তা রাইজিংবিডি ডটকমকে বলেন, “বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষা এবং বাজারে স্বচ্ছতা নিশ্চিতের জন্য এমন অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি। এ কারণে বিষয়টি এফআরসির দৃষ্টি আকর্ষণ করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।”

গোল্ডেন হারভেস্টের অ্যাগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয় ২০১৩ সালে। ‘বি’ ক্যাটাগরির এ কোম্পানির মোট পরিশোধিত মূলধন ২৭২ কোটি ৯১ লাখ ৬০ হাজার টাকা। সে হিসাবে কোম্পানির মোট শেয়ার সংখ্যা ২৭ কোটি ২৯ লাখ ১৬ হাজার ৪৮৩টি। সর্বশেষ ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত কোম্পানির উদ্যোক্তাদের হাতে ৩০.৪২ শতাংশ, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের হাতে ৩৭.১১ শতাংশ, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের হাতে ০.২২ শতাংশ এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে ৩২.২৫ শতাংশ শেয়ার রয়েছে।

ঢাকা/এনটি/এসবি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়