ঢাকা, মঙ্গলবার, ১ শ্রাবণ ১৪২৬, ১৬ জুলাই ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

স্নানের ইতিহাস

সাঈদ আহসান খালিদ : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৯-০৭-০৮ ৮:৩৯:২৯ এএম     ||     আপডেট: ২০১৯-০৭-০৮ ১১:১৪:২৬ এএম
স্নানের ইতিহাস
দ্য সিটি অব বাথ। প্রথম খ্রিস্টাব্দে রোমান শাসক কর্তৃক ইংল্যান্ডে এই নগরীর গোড়াপত্তন। উষ্ণ জলের ঝরনায় স্নানের নগরী হিসেবে এটি বিখ্যাত। বর্তমানে এটি ইউনেস্কো ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ
Voice Control HD Smart LED

সাঈদ আহসান খালিদ : মানুষের স্নান বা গোসলের অভ্যাস প্রাগৈতিহাসিক। জল বা জলীয় পদার্থ দ্বারা দেহ পরিষ্কার করাই হলো স্নান। স্নান সাধারণত দুই ধরনের হতে পারে: ধারা স্নান (অর্থাৎ ঝরনা বা শাওয়ার) এবং অবগাহন (অর্থাৎ বাথটাব বা নদী-পুকুর প্রভৃতিতে স্নান)। জল ছাড়াও স্নান হতে পারে- সেটি সান বাথ বা সূর্যস্নান। নানা গান ও কবিতায় সূর্যস্নানের উল্লেখ পাওয়া যায়। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছেন:

‘মুছে যাক গ্লানি, ঘুচে যাক জরা/ অগ্নিস্নানে শুচি হোক ধরা’

ভারতীয় উপমহাদেশে মানুষের জীবনে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে আছে জল। জল-জঙ্গল ও উষ্ণ আবহাওয়ার দেশ হওয়ায় এখানে মানুষের স্নানের অভ্যাস ঐতিহাসিক এবং ধর্মীয়বিধি প্রভাবিত। প্রাচীন ভারতীয় পুঁথিপত্রে দিনে তিনবার স্নানের বিধান আছে। ভারতীয় হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের কাছে গঙ্গার জল অতি পবিত্র এবং গঙ্গাজলে ফি বছর লাখ লাখ পূণ্যার্থী ‘পূণ্যস্নান’ করে পবিত্রতা অর্জন করে।

মুসলিম ধর্মেও স্নান একটি ধর্মীয় কর্তব্য। স্নানের প্রতিশব্দ হিসেবে মুসলমানরা আরবি ‘গোসল’  শব্দটি ব্যবহার করে। পরিষ্কার-পরিচ্ছনতা ইসলাম ধর্মে খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি বাধ্যবাধকতা এবং ‘ঈমানের অঙ্গ’ হিসেবে গণ্য। ইসলাম ধর্মে গোসলের উদ্দেশ্য পবিত্রতা অর্জন এবং এই গোসলের নিয়মকানুন সুনির্দিষ্ট। জর্ডন নদীর জল বিশ্বের সব খ্রিস্টানদের কাছে পবিত্র। প্রত্যেক গির্জায় এই জল রাখা থাকে। জর্ডন নদীর বুকে দাঁড়িয়ে সেন্ট জন দি ব্যাপটিস্ট যীশুর মাথায় জলের ছিটে দিয়ে তাঁকে দীক্ষিত করেছিলেন। মুসলমানেরা জন্ম থেকেই মুসলিম, হিন্দুরা আজন্ম হিন্দু কিন্তু খ্রিস্টান পরিবারের শিশুদের ব্যাপ্টিজম না হলে তারা খ্রিস্টান হয় না; নবজাতকদের তাই গির্জায় নিয়ে গিয়ে মাথায় জর্ডন নদীর জলের ছিটে দিয়ে আনতে হয়।

 

রাজা কিষণ সিংহ ও তার সুইমিং পুল

 

প্রাচীন গ্রীক সভ্যতায় পাবলিক বাথ হাউস বা সাধারণ স্নানাগারের উল্লেখ আছে। রোমান সভ্যতার ধ্বংসাবশেষ খুঁজে দেখা গেছে, সে সময় স্নানাগারে প্রণালী দ্বারা জল সরবরাহের ব্যবস্থা ছিল। এই দুই সভ্যতায় দ্বিতীয় খ্রিস্টাব্দে যে স্নানের অভ্যাস ছিল তার প্রমাণ মেলে। ‘ইউরেকা’  শব্দটি বললেই মনে পড়ে যায় বাথটাবে স্নান করতে করতে বিজ্ঞানী আর্কিমিডিসের সেই বিখ্যাত এবং যুগান্তকারী আবিষ্কারের কথা। আরব্যরজনীতে তখনকার দিনের সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিদের স্নান বিলাসের বিবরণ আছে। আর যারা নিম্নবিত্তের মানুষ তাদের জন্য নগরে থাকতো সামান্য দক্ষিণার বিনিময়ে সাধারণ স্নানাগার। বৌদ্ধ ধর্মের প্রভাব পড়ার আগে জাপানে খোলা জায়গায় স্নানের রীতি ছিল। পরবর্তীকালে বৌদ্ধধর্মের প্রভাবে ঘেরা স্থানে স্নানের রীতি চালু হয়।

প্রাচীনকালে রাজা ও রানীদের স্নান বিলাসের কাহিনি আজও আমাদের বিস্মিত করে। শোনা যায়- সৌন্দর্যের কিংবদন্তি রানী ক্লিওপেট্রা নাকি ত্বকের ঔজ্জ্বল্য রক্ষার জন্য গাধার দুধ দিয়ে স্নান করতেন। এছাড়া প্রাচীন ভারতের ইতিহাসে রানী ও রাজকন্যাদের স্নানের জলে চন্দন, কেশর, গোলাপ জল ও নানা সুগন্ধিদ্রব্য ব্যবহার করার প্রচলন ছিল। স্নান-বিলাসে সবাইকে ছাড়িয়ে গিয়েছিলেন ভারতের রাজস্থানের ভরতপুরের রাজা কিষণ সিংহ। কিষণ সিংহের রাজমহলে ৪০ জন রানী থাকতেন। রাজমহলের সামনে গোলাপি মার্বেলে সুইমিং পুল বানিয়েছিলেন কিষণ সিংহ। এমনকি, সেই সুইমিং পুলে যাওয়ার রাস্তা বাঁধানো হয়েছিল চন্দন কাঠে। সুইমিং পুলে নামার জন্য চন্দন কাঠের সিঁড়িও বানানো হয়েছিল। রাতে সুইমিং পুলে নগ্ন হয়ে স্ত্রীদের সঙ্গে স্নান করতে নামতেন রাজা কিষণ সিংহ। পুলের মধ্যে ২০টি চন্দনকাঠের পাটাতন এমনভাবে রাখা হয়েছিল যে, এক একটি পাটাতনে দুজন রানী অনায়াসে দাঁড়াতে পারতেন। কিষণ সিংহের নির্দেশে প্রত্যেক রানীকেই হাতে মোমবাতি নিয়ে পুলের সিঁড়ি থেকে একদম সিঁড়ির শেষ ধাপ পর্যন্ত দাঁড়াতে হতো। রানীদের উদ্দেশে কিষণ সিংহের কঠোর নির্দেশ ছিল— মোমবাতি যেন না নিভে যায়। স্নানের শেষমুহূর্ত পর্যন্ত যে রানীর হাতের মোমবাতি জ্বলতো, তাঁকে নিয়ে নিজের খাসমহলে যেতেন রাজা। এর মানে, ওই রানী সেই রাতে রাজার সঙ্গে রাত কাটানোর সুযোগ পেতেন।

বিস্ময়ের ব্যাপার হলো- মধ্যযুগে প্রায় সহস্র বছর ধরে পশ্চিম ইউরোপীয়রা স্নানের বিষয়টি প্রায় ভুলেই গিয়েছিল। এমনকি তারা সাঁতারও ভুলে গিয়েছিল। তারা কেবল সাঁতার ভোলেনি, সাঁতারের ইচ্ছাও লোপ পেয়ে গিয়েছিল তাদের মধ্যে থেকে। ফরাসি ইতিহাসবিদ জুলেস মিসলেট ইউরোপের মধ্যযুগকে ‘স্নান ছাড়া একহাজার বছর’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। ইউরোপে কয়েক শতাব্দী ধরে স্নান ও সাঁতারের সংস্কৃতির এই অনুপস্থিতি বিশ্বের অন্যান্য অগ্রগতি থেকে তাদের ছিটকে ফেলেছিল। সপ্তদশ শতকে উন্নত দেশগুলোয় স্নানের অনুপস্থিতি ও অপরিচ্ছন্ন অভ্যাস রীতিমতো অস্বাস্থ্যকর ও দুর্গন্ধময় অবস্থার সৃষ্টি করেছিল। ইউরোপীয়দের মনে ধারণা ছিলো- স্নান করলে রোমকূপের মধ্যে দিয়ে দেহে রোগ-জীবাণু প্রবেশ করে এবং সেই কারণে তারা স্নান করতেন না। স্পেনের রানী ইসাবেল জীবনে মাত্র দুইবার স্নান করেন। যেদিন তার জন্ম হয় এবং দ্বিতীয় ও শেষবার তাঁর বিয়ের দিন। ফ্রান্সের রাজা চতুর্দশ লুইও সারা জীবনে মাত্র দুইবার স্নান করেছেন।

 

মধ্যযুগে শিল্পীর তুলিতে আঁকা ইরানের একটি স্নানাগার

 

ফ্রান্সে রাজপ্রাসাদকে বলা হয় ‘শাঁতো’। ফ্রান্সের রাজা প্রথম ফ্রাঁসোয়া ফ্রান্সজুড়ে এমন অনেক প্রাসাদ বা শাঁতো গড়েছেন। একেকটা প্রাসাদে শত শত কক্ষ। কিন্তু মজার ব্যাপার, এতো বড় প্রাসাদে কোনো বাথরুম নেই! সৌন্দর্য-চর্চা, সুগন্ধি-সৌরভ আর সাজ-পোশাকের আড়ম্বরে ফরাসিদের খ্যাতি বিশ্বজুড়ে। সুগন্ধের রাজধানী ফ্রান্সের প্যারিস- যেখানে প্রতিনিয়ত হাজারো রসায়নের সমীকরণে তৈরি হচ্ছে বিচিত্র সব সুগন্ধি- ফরাসি সৌরভ। ফ্রান্সে এই সুগন্ধি বা পারফিউম কীভাবে তৈরি হয় সেটি ফুটে উঠেছে ‘পারফিউম: দ্য স্টোরি অব অ্যা মার্ডারার’ নামের একটি বিখ্যাত চলচ্চিত্রে। অথচ আশ্চর্যের ব্যাপার- এই ফরাসিরাই কিনা বছরের পর বছর স্নান করতো না! ফরাসিদের এই স্নানজনিত বিশ্বকুখ্যাত আলসেমির কারণেই জন্ম নেয় শত শত বিশ্ববিখ্যাত ফরাসি সুগন্ধি কোম্পানি। যাতে সুগন্ধি মেখে হলেও স্নান না করে গায়ের দুর্গন্ধ ঢাকা যায়! সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘ছবির দেশে কবিতার দেশে’ শীর্ষক ভ্রমণগ্রন্থে ফরাসিদের স্নান-বিমুখতার উল্লেখ আছে।

শরীরে নোংরা নিয়ে সাফ-সুতরো সুন্দর পোশাক পরা ইউরোপীয় আর স্নান সেরে নোংরা পোশাক গায়ে চাপানো ভারতীয়দের এই সাংস্কৃতিক দূরত্বের কথা উঠে এসেছে স্বামী বিবেকানন্দের লেখা ‘প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য’ গ্রন্থেও।

বিবেকানন্দ লিখেছেন: ‘আমরা স্নান করি কেন?—অধর্মের ভয়ে; পাশ্চাত্যেরা হাত-মুখ ধোয় পরিষ্কার হবে বলে.. আমরা দিব্যি স্নান করে একখানা তেলচিটে ময়লা কাপড় পরলুম, আর ইওরোপে ময়লা গায়ে, না নেয়ে একটা ধপধপে পোষাক পরলে...হিঁদু ছেঁড়া ন্যাতা মুড়ে কোহিনুর রাখে; বিলাতী সোনার বাক্সয় মাটির ডেলা রাখে! হিঁদুর শরীর পরিষ্কার হলেই হল, কাপড় যা তা হোক! বিলাতীর কাপড় সাফ থাকলেই হল, গায়ে ময়লা রইলই বা! হিঁদুর ঘরদোর ধুয়ে মেজে সাফ, তার বাইরে নরককুণ্ড থাকুক না কেন! বিলাতীর মেজে কার্পেটে মোড়া ঝকঝকে, ময়লা সব ঢাকা থাকলেই হল!! হিঁদুর পয়োনালী রাস্তার উপর—দুর্গন্ধে বড় এসে যায় না। বিলাতীর পয়োনালী রাস্তার নিচে— টাইফয়েড ফিভারের বাসা!! হিঁদু করছেন ভেতর সাফ। বিলাতী করছেন বাইরে সাফ...।’

যাইহোক, স্নান এখন আমাদের প্রাত্যহিক জীবনযাপনে পরিচ্ছন্নতার অংশ। স্নান বিলাসিতার প্রকাশও হয়ে উঠেছে বৈকি। স্নানঘর এখন আভিজাত্যের মান নির্ধারক- হোক সেটি ঘরের বাথরুমের ‘বাথটাব’ অথবা অভিজাত হোটেলের ইনিফিনিটি সুইমিং পুল! তিনভাগ জল, একভাগ স্থলের পৃথিবীতে স্নান যে গুরুত্ব হারাবে না সেটি নিশ্চিত।

 

রাইজিংবিডি/ঢাকা/৮ জুলাই ২০১৯/তারা  

Walton AC
ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন
       

Walton AC
Marcel Fridge