ঢাকা     শনিবার   ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ||  মাঘ ২৪ ১৪৩২

Risingbd Online Bangla News Portal

‘প্রতিটি মেয়ের সমর্থন থাকলেও সবাই মিছিলে যেত না’

আফরিন শাহনাজ || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৬:৩৮, ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৩  
‘প্রতিটি মেয়ের সমর্থন থাকলেও সবাই মিছিলে যেত না’

ভাষাসৈনিক সুফিয়া খানম ১৯৪৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এমএ বাংলা বিভাগের ছাত্রী ছিলেন। সেসময় তিনি ছাত্র ফেডারেশনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। আগে থেকেই রাজনীতির সঙ্গে প্রত্যক্ষ যোগাযোগ থাকায় ভাষা আন্দোলনে নিজেকে সহজেই সম্পৃক্ত করতে পেরেছিলেন। ভাষা আন্দোলনের সব কয়টি সভা-মিছিলে অংশ নিতেন। 

এক সাক্ষাৎকারে সুফিয়া খানম বলেছিলেন, ‘অন্য কোনো মেয়ে না গেলেও আমাকে যেতে হতো। আমি তখন চামেলী হাউজের মহিলা হোস্টেলে থাকতাম। আন্দোলনের প্রতি হোস্টেলের প্রতিটি মেয়ের সমর্থন থাকলেও সবাই মিছিলে যেত না। বিশেষ করে '৫২র আগে মেয়েরা খুব বেশি মিটিং-মিছিলে আসতো না। আমি এবং নাদের চৌধুরীই মিটিং মিছিলগুলোতে অংশ নিতাম। আমরা স্কুলের ছাত্রীদের মিছিলে আনার জন্য মুসলিম গার্লস স্কুল, কামরুন্নেছা স্কুল, বাংলাবাজার গার্লস স্কুল এবং ইডেন কলেজে যেতাম। এসব স্কুল কলেজের ২/৩ জন মেয়ে মিটিং মিছিলে অংশ নিতে আসতো। তবে ওদের প্রায় সবারই ভাষা আন্দোলনের প্রতি সমর্থন ছিল। ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও অনেকে আমাদের সাথে বাহিরে বের হতে পারতো না। বিশেষ করে হেড মিস্ট্রেসদের ভয়ে ওরা পিছপা হতো। প্রায় প্রতিটি স্কুলের হেড মিস্ট্রেসরা আমাদের সাথে খারাপ ব্যবহার করতেন। … একটা কথা বলা দরকার, সেটা হচ্ছে প্রতিটি স্কুল, কলেজের দারোয়ানরা আমাদের যথেষ্ট সহায়তা করতো। মুসলিম গার্লস স্কুলে ফাতেমা নামে একজন টিচার ছিলেন। তাঁর সাথে আমার বন্ধুত্ব ছিল। তিনি আমাদের কাজে সবসময় সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরাও আমাদের যথেষ্ট অনুপ্রেরণা দিতেন। এ প্রসঙ্গে ড. মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ স্যারের কথা বলতেই হয়। তিনি সবসময় আমাদের সাহায্য ও সহযোগিতা করতেন।’ 

২১ ফেব্রুয়ারি সকালের ঘটনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘সেদিন সকালে কমলাপুরে ছিলাম। সেখানে কমিউনিস্ট পার্টির মিটিং ছিল। পার্টি ১৪৪ ধারা ভাঙবে কি ভাঙবে না, মিটিংয়ে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা। মিটিংয়ে উপস্থিত নেতা-কর্মীদের এ ব্যাপারে সিদ্ধান্তে পৌঁছতে দেরি হচ্ছিল। তাই আমতলায় আসতে সেদিন আমারও কিছুটা দেরি হয়। অন্যকক্ষে পার্টি ১৪৪ ধারা প্রসঙ্গে কোনো সিদ্ধান্ত পৌঁছার আগেই আমি আমতলায় চলে আসি। আমাকে আসতে হলো ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের জরুরি বিভাগের সামনে দিয়ে। প্রথম দল ১৪৪ ধারা ভাঙার পর, আমি আমতলা পৌঁছি। ততোক্ষণে ইট-পাটকেল ছোঁড়াছুড়ি শুরু হয়ে গেছে। তাই সামনের দিকে না যেতে পারে মেডিক্যালের ভেতর দিয়ে চামেলী হাউজে চলে আসি। রওশন আরা বাচ্চুসহ আমাদের অনেক মেয়ে পুলিশের লাঠি চার্জে আহত হয়েছিল। ২১ ফেব্রুয়ারির পর আমরা অন্য মেয়েদের সাথে নিয়ে বিভিন্ন পাড়া-মহল্লায় চাঁদা তোলা শুরু করি। চাঁদা তোলার কাজে অনেক মেয়েই আমাদের সাথে যোগ দিয়েছিল।’ 

রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন সঠিক ও সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য প্রচুর অর্থের প্রয়োজন ছিলো। সে প্রয়োজনে মূলত ছাত্রীরা এগিয়ে আসে। মেয়েরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে চাঁদা তোলে। এ প্রসঙ্গে ভাষা সৈনিক মোসলেমা খাতুনের (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক ছাত্রী) স্মৃতিচারণে উঠে আসে সুফিয়া খানমের কথা, ‘শুনলাম আন্দোলনের নেতারা বলেছেন আন্দোলন পরিচালনার জন্য, আহতদের চিকিৎসার জন্য টাকার দরকার। রাতে সিনিয়র জুনিয়র সব ছাত্রীরা এক সঙ্গে বসে আলোচনা করে ঠিক করা হল ভোরে উঠে আমরা দু'জন দু'জন করে শহরের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়বো আর বাড়ি বাড়ি গিয়ে চাঁদা তুলবো। ২২ ফেব্রুয়ারিতেও গোটা শহর ছিল উত্তেজনাপূর্ণ, বিক্ষুদ্ধ। আমি আর সুফিয়া খাতুন বের হলাম একসঙ্গে। আমরা গেলাম শান্তিনগর আর মালিবাগ এলাকায়। সারাদিন বাড়ি বাড়ি গিয়ে চাঁদা তুললাম। যে বাড়িতেই গিয়েছি, সেখানেই পেয়েছি ছাত্রদের জন্য সহানুভূতি। সবাই শোক আর দুঃখ প্রকাশ করেছে। আগ্রহভরে চাঁদা দিয়েছে। অনেক বাড়িতে মহিলারা গুলিবিদ্ধ ছেলেদের কথা বলতে গিয়ে আপনজন হারানোর মত কেঁদেছে।’

সুফিয়া খানম ১৯৫৩ সালে সিলেট সরকারি বালিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষিকা হিসেবে শিক্ষকতা পেশায় যোগ দেন। সেখান থেকে বদলি হয়ে ময়মনসিংহ বিদ্যাময়ী সরকারি উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ে যোগ দেন এবং রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে সম্পৃক্ত থাকার ফলে পুলিশি রিপোর্টের ভিত্তিতে চাকরি হারান। পরবর্তীতে ১৯৫৪ সালে তিনি মুসলিম গার্লস স্কুলে প্রধান শিক্ষিকা হিসেবে যোগ দেন এবং ৩৭ বছর ওই বিদ্যালয়ে চাকরি করেন। ওই প্রতিষ্ঠান থেকেই প্রধান শিক্ষিকা হিসেবে অবসর গ্রহণ করেন। তিনি ২০১৭ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকার শান্তিবাগে বোনের বাসায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। 

লেখক: গবেষক ও গণমাধ্যমকর্মী
 

তারা//

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়