ঢাকা     রোববার   ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ||  ফাল্গুন ৯ ১৪৩২ || ৪ রমজান ১৪৪৭ হিজরি

Risingbd Online Bangla News Portal

যে কারণে রোজা ভেঙে যায় 

মুফতি আতাউর রহমান || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৩:৩৫, ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬   আপডেট: ১৫:১৯, ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
যে কারণে রোজা ভেঙে যায় 

নির্ধারিত কিছু কাজ ও শর্ত পূরণের মাধ্যমে রোজা আদায় করতে হয়। এসব কাজ ও শর্ত পাওয়া না গেলে রোজা আদায় হয় না, ভেঙে যায়। বিশেষ কারণ ছাড়া ইচ্ছাকৃতভাবে রোজা ছেড়ে দেওয়া এবং ভেঙে ফেলা হারাম ও কবিরা গুনাহ। রোজা ভঙ্গকারী ব্যক্তির ইচ্ছা ও অনিচ্ছা, সতর্কতা ও অবহেলার ওপর ভিত্তি করে রোজা ভঙ্গের কারণগুলো দুইভাগে ভাগ করা যায়। তা হলো: 
ক. যখন কাজা ও কাফফারা উভয়টি করতে হয়
খ. যখন শুধু কাজা আদায় করলেই হয় 

প্রথম প্রকার তথা যখন কাজা (রোজার পরিবর্তে রোজা রাখা) ও কাফফারা (ক্ষতিপূরণ) উভয়টি আদায় করতে হয় এমন কারণ প্রধানত দুটি। ইচ্ছাকৃতভাবে পানাহার করা এবং স্ত্রী-সম্ভোগ করা। কোনো ব্যক্তি যদি ইচ্ছাকৃতভাবে রমজানে দিনের বেলা স্ত্রী-সম্ভোগে লিপ্ত হয়, খাবার খায় বা পান করে তবে তার রোজা ভেঙে যাবে। এমন ব্যক্তির ওপর কাজা ও কাফফারা উভয়টি আদায় করা ওয়াজিব। 

আরো পড়ুন:

রোজাদার ব্যক্তি যদি ইচ্ছাপূর্বক ওষুধ সেবন করে তবে তার ওপর কাজা ও কাফফারা উভয়টি ওয়াজিব হবে। আর অনিচ্ছায় তা গ্রহণ করলে শুধু কাজা ওয়াজিব হবে। স্ত্রী-সম্ভোগের ক্ষেত্র বীর্যপাত হওয়া শর্ত নয়। এ ব্যাপারে নারী সঙ্গীও যদি ইচ্ছুক ও অনুগত হয়, তবে তার ওপরও কাজা-কাফফারা উভয়টি ওয়াজিব হবে। আর নারী অনিচ্ছুক হলে, তার সঙ্গে জোরপূর্বক সহবাস করা হলে সে কেবল কাজা আদায় করবে, কাফফারা দেবে না। ফকিহ আলেমরা বলেন, ওষুধ ও ধূমপান পানাহারের অন্তর্ভুক্ত এবং স্বেচ্ছায় যে কোনো প্রকার বীর্যপাত স্ত্রী-সঙ্গমের অন্তর্ভুক্ত। 

দ্বিতীয় প্রকারের কারণ যা পাওয়া গেলে শুধু রোজার কাজা আদায় করতে হয়, কাফফারা দিতে হয় না তা একাধিক। আধুনিক ও প্রাচীন ফিকহের কিতাবের আলোকে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি কারণ তুলে ধরা হলো। 

১. কামভাবের সঙ্গে কোনো নারীকে চুমু খাওয়া বা স্পর্শ করার পর বীর্য নির্গত হলে রোজা ভেঙে যায় এবং পুরুষের জন্য কাজা ওয়াজিব হয়।
২. জোর করে কেউ কিছু খাইয়ে দিলে অথবা রোজার কথা স্মরণে আছে, রোজাদার ব্যক্তিও সতর্ক আছে অথচ আকস্মিকভাবে কোনো কিছু খেয়ে ফেললে।
৩. মুখে পান নিয়ে ঘুমিয়ে গেলে এবং সুবহে সাদিকের পর জাগ্রত হলে।
৪. ইচ্ছা করে বমি করলে।
৫. বমির বেশির ভাগ মুখে আসার পর তা গিলে ফেললে।
৬. মুখ দিয়ে, নাক দিয়ে বা পায়ুপথ দিয়ে ওষুধ প্রবেশ করালে। কানের ভেতর তেলের ফোঁটা ঢাললে রোজা ভেঙে যায়। কিন্তু পানির ফোঁটা ফেললে রোজা ভঙ্গ হয় না।

৭. মেয়েদের মাসিক ও সন্তান প্রসবের পর ঋতুস্রাব হলে।
৮. ইসলাম ত্যাগ করলে।
৯. গ্লুকোজ বা শক্তিবর্ধক ইনজেকশন বা সেলাইন দিলে। 
১০. কুলি করার সময় অনিচ্ছায় গলার ভেতর পানি প্রবেশ করলে।
১১. রাত অবশষ্টি আছে মনে করে সুবেহ সাদিকের পর পানাহার করলে।
১২. ইফতারের সময় হয়েছে ভেবে সূর্যাস্তের আগে ইফতার করলে। 
১৩. লোবান ইত্যাদির ধোঁয়া শুকলে এবং হুক্কা পান করলে।
১৪. ভুলবশত কোনো কিছু খেয়ে, রোজা ভেঙে গেছে ভেবে ইচ্ছা করে আরো কিছু খেলে।
১৫. বৃষ্টির পানি মুখে পড়ার পর তা খেয়ে ফেললে।
১৬. জিহ্বা দিয়ে দাঁতের ফাঁক থেকে ছোলা পরিমাণ কোনো কিছু বের করে খেয়ে ফেললে। 
১৭. রোজা স্মরণ থাকা অবস্থায় অজুতে কুলি বা নাকে পানি দেওয়ার সময় ভেতরে পানি চলে গেলে। (দৈনন্দিন জীবনে ইসলাম, ফাতাওয়ায়ে শামি ও ফাতাওয়ায়ে আলমগিরি)

রোজার কাজা হলো ভেঙে যাওয়া বা ভেঙে ফেলা রোজার প্রতিবিধান হিসেবে শুধু রোজা আদায় করা। অতিরিক্ত কিছু আদায় না করা। অন্যদিকে রোজার কাফফারা হলো প্রতিবিধান হিসেবে অতিরিক্ত ক্ষতিপূরণ আদায় করা। রোজার কাফফারা বিষয়ে আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, ‘‘আমরা আল্লাহর রাসুল (সা.)-এর কাছে বসা ছিলাম। এমন সময় এক ব্যক্তি এসে বলল, হে আল্লাহর রাসুল! আমি ধ্বংস হয়ে গেছি। 
রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, তোমার কী হয়েছে? 
সে বলল, আমি রোজা অবস্থায় আমার স্ত্রীর সঙ্গে মিলিত হয়েছি। 
রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, স্বাধীন করার মতো কোনো ক্রীতদাস তুমি মুক্ত করতে পারবে কি? 
সে বলল, না। 
তিনি বললেন, তুমি কি একাধারে দু’মাস সওম পালন করতে পারবে? 
সে বলল, না। 
এরপর তিনি বললেন, ৬০ জন মিসকিন খাওয়াতে পারবে কি? সে বলল, না। 

হাদিস বর্ণনাকারী বলেন, তখন নবী (সা.) থেমে গেলেন, আমরাও এ অবস্থায় ছিলাম। এমন সময় নবী (সা.)-এর কাছে এক আরাক পেশ করা হলো যাতে খেজুর ছিল। আরাক হলো ঝুড়ি। নবী (সা.) বললেন, প্রশ্নকারী কোথায়? 
সে বলল, আমি। 
তিনি বললেন, এগুলো নিয়ে দান করে দাও। তখন লোকটি বলল, হে আল্লাহর রাসুল! আমার চাইতেও বেশি অভাবগ্রস্তকে সদাকা করব? আল্লাহর শপথ, মদিনার উভয় প্রান্তের মধ্যে আমার পরিবারের চেয়ে অভাবগ্রস্ত কেউ নেই। 
রাসুল (সা.) হেসে উঠলেন এবং তাঁর দাঁত দেখা গেল। অতঃপর তিনি বললেন, এগুলো তোমার পরিবারকে খাওয়াও।’’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১৯৩৬)

আল্লাহ সব বিষয়ে সবচেয়ে ভালো জানেন।

ঢাকা/শাহেদ

সম্পর্কিত বিষয়:

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়